দ্য ম্যাজিশিয়ান জিদান

মনে পড়ে সেসব দিনের কথা। লা লিগায় বার্সেলোনা আধিপত্য দেখিয়েই চলেছে। চ্যাম্পিয়নস লিগে বারবার সেমিফাইনালে বাদ পড়তে হচ্ছিল। এল ক্লাসিকোগুলোতে হারছিলাম লজ্জাজনকভাবে। সমালোচকেরা সমালোচনা করত নিকৃষ্টভাবে। লিওনেল মেসির টানা চারবার ফিফা বর্ষসেরা হবার পর কয়জন ভেবেছিল রিয়াল মাদ্রিদ আজকের অবস্থানে আসবে?

বারবার খারাপ করছিলাম চ্যাম্পিয়নস লিগে। অবশেষে সেমিতে উঠলাম রোনালদো আসার পর। ২০১০-১১ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে সেমিফাইনালে বার্সেলোনার কাছে হার। ২০১১-১২ মৌসুমে আবার কেঁদেছিল মাদ্রিদ ফ্যানরা। ২০১২-১৩ মৌসুমে লেভানডস্কির চার গোল বুকে চারটা বুলেট হয়ে বিঁধেছিল। ২০১৩-১৪ মৌসুমে উঠলাম ফাইনালে।

ফাইনালের ৯২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডে রামোসের সেই ঐতিহাসিক গোল কি ভোলা যায়!১২ বছর পর জিতলাম চ্যাম্পিয়নস লিগ। ২০১৪-১৫ মৌসুমে আবার সেই সেমিফাইনাল। এবার হারলাম জুভেন্টাসের কাছে। ট্রফিলেস থাকার পর আসলেন নতুন কোচ বেনিতেজ। কয়েক মাস পর বিদায় নিলেন তিনিও। দলের দায়িত্ব নিলেন ফ্রান্সের সাবেক তারকা ফুটবলার জিনেদিন জিদান।

সাবেক এই বিশ্বসেরা ফুটবলার যে কোচ হিসেবে বিশ্বসেরা হবে তা কয়জন অনুমান করেছিল? বারবার, শেষ মুহূর্তে গোল দিয়ে ফিরে আসাকে হয়ত তারা ভাগ্য বলেই আখ্যা দিবে। কিন্তু, এটা কয়জন করতে পারে? কতবার আপনি একে ভাগ্য বলে অবজ্ঞা করবেন? এটাই জিদানের ট্যাকটিক্স। দিনশেষে ঠিকই শেষ হাসি হাসে জিদান। যে দল নিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন মরিনহো, আনচেলত্তি, বেনিতেজের মত বড় বড় নামেরা, সেই দলকেই হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন তিনি মাত্র আড়াই বছরে।

জিদানের ছিল না তাদের মত অভিজ্ঞতা। জিদানের আছে তার নিজের দল,যার সাথে মেলানো যাবে না দুনিয়ার কোন টাকা পয়সার সম্পর্ককে। আড়াই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে লস ব্ল্যাঙ্কোসদের হয়ে নবম শিরোপা জেতার অবিস্মরণীয় কীর্তি গড়েন জিদান। একই সাথে তিনি টানা তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা একমাত্র কোচ।

চ্যাম্পিয়নস লিগে প্রতি মৌসুমে দশটির বেশি গোল দেওয়া আর প্রতি মৌসুমে পঞ্চাশটা গোল দেওয়াকে সহজ কাজ বানিয়ে ফেলেছেন রোনালদো। মানুন আর নাই মানুন, ২০১৩ সালেও রিয়াল মাদ্রিদ আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এখনকার মত ফ্যানবেজ ছিল না বাংলাদেশে। এখন তার ও তার ক্লাবের ফ্যান এদেশে অনেক। প্রিয় খেলোয়াড় ও দলের সুসময়ে ও দুঃসময়ে পাশে ছিলাম, আছি, থাকব।

সফল খেলোয়াড় ও সফল কোচ – এই দুই ভূমিকায় একই ব্যক্তির আবির্ভাব ফুটবলের ইতিহাসে হয়েছে হাতে গোনা কয়েকবার। আর এই হাতে গোনা কয়েকজনের মধ্যে নি:সন্দেহে এখন সবার ওপরের দিকেই উচ্চারিত হবে জিনেদিন জিদানের নাম।

এর আগে কেবল দু’জন জিতেছেন তিনটি করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। তারা হলেন বব পেইসলি ও কার্লো অ্যানচেলত্তি। অ্যানচেলত্তি ২০০৩ ও ২০০৭ সালে এসি মিলান এবং ২০১৪ সালে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছিলেন। অপরদিকে পেইসলি লিভারপুলের হয়ে ১৯৭৭, ১৯৭৮ ও ১৯৮১ সালে এ সাফল্য দেখান। জিদান এই দু’জনের চেয়ে এগিয়ে থাকবেন, কারণ বাকিদের কেউই টানা তিনবার এই কীর্তি গড়তে পারেননি।

জিদানের এটা চতুর্থ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা। এর মধ্যে প্রথমটি তিনি জিতেছিলেন ২০০২ সালে, খেলোয়াড় হিসেবে। জিনেদিন জিদানের ঠিক বিপরীত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন লিভারপুলের কোচ। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মত কোনো ইউরোপিয়ান ট্রফির ফাইনাল হারলেন তিনি। জুভেন্টাসে থাকতে, দু’বার খেলোয়াড় হিসেবে দলকে ফাইনালে নিয়েছিলেন, কখনোই জিততে পারেননি। রিয়ালে এসেই জিজুর সেই আক্ষেপ ঘুচে। তাই, রিয়ালের জন্য জিদান যেমন সৌভাগ্যের প্রতীক, জিদানের জন্য রিয়ালও তাই। তারা এক সাথে হওয়া মানেই তো ম্যাজিক!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।