কী এক অদ্ভুত ‘ভাগ্যবান’ জেনারেশন আমরা!

কী এক অদ্ভুত ভাগ্যবান জেনারেশন আমরা! ভাবলে বারবার বিস্মিত হতে হয়। কতটা ভাগ্য নিয়ে আমরা এই সময়টাতে পৃথিবীতে এসেছি। আমাদের সময়ে অভিনয় করছে ইন্টারন্যাশনালি ফেমাস হিরো আলম। তার ডান্স আর ডায়ালগে মাতোয়ারা হচ্ছে দুনিয়া।

একের পর এক গানের জাদুতে আমাদের মুগ্ধ করছেন স্যার মাহফুজুর রহমান। তার সাথে আছে ইভা রহমান, আছে রিদ্য রঙ্গন। আমরা ভেসে যাচ্ছি সুরের মূর্ছনায়। আমাদের সময়েই তো রান্না করছেন কেকা ফেরদৌসী। ফুড রিভিউ দিচ্ছে মিজান আর ময়না। বই লিখে পাঠকদের মনে সাহিত্যের মায়াজাল বিস্তার করছে সোলাইমান সুখন আর রাবা খান। সবই তো আমাদের সময়েই।

আমরা দেখেছি সাধারণ ছেলে থেকে সেলিব্রেটি বনে যাওয়া কান হেলালকে। শিখিয়েছে মিতিলার মতো মেয়েরা ছেড়ে গেলেও কিভাবে একটা ছেলে প্রকৃত প্রেমিক হতে পারে। আমরা দেখেছি বন্ধুত্ব আর প্রেমকে জাস্টফ্রেন্ড নামের মধ্যে এক হয়ে যেতে। সালমান মুক্তাদির আর জেসিয়া আমাদের শিখিয়েছে অন্যরকম এক খাওয়াদাওয়া। যে খাওয়া নিস্পাপ, যে খাওয়াতে বন্ধুত্ব থাকে, প্রেম না।

আমাদের আইডল সেফাত উল্লাহ ওরফে সেফুদা। আমরা শিখছি কিভাবে মদ খেয়ে শব্দবোমা ছাড়তে হয়৷ আমাদের ক্রাশ সানাই মাহবুব। শুধু তার চেহারা নয়, আমরা ক্রাশ খাচ্ছি তার হৃদয়ের ওপরেও৷ সানাই ই আমাদের জানিয়েছে একজন মেয়ের হৃদয়ও বিশাল বড় হতে পারে। সিনেমাজগতের কথা শুরু করলে তো শেষ হবে না। আলেকজান্ডার – ময়ুরীর যুগ দেখেছি।

মেহেদীর নাচ দেখে সেই তো হলের মধ্যে আমাদের একটু একটু করে বড় হয়ে যাওয়া৷ তারপর এসেছে বাপ্পি চৌধুরী, ডিপজল, কাজী মারুফ। ‘কুত্তার বাচ্চা, এই কুত্তার বাচ্চা…’ থেকে শুরু করে ‘আহো! ভাতিজা আহো’ আর ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ ডায়ালগ। আমরা মাতোয়ারা হয়েছি কালো বন্দুকের কালো জাদুতে। আমাদেরকে সততা আর গরীবের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছে আহসান হাবিব পিয়ার আর ইফ্রিত জেরিন কুঞ্জ৷

আমরা শিখেছি ঘুমের মধ্যে হিসাব না থাকলে কতকিছু এডিট হয়ে যায়৷ আমরা ফেসবুক সেলিব্রেটিদের যুগের ছেলেমেয়ে। বহু বিষয়ে বিশেষজ্ঞ একেকজন সেলেব দেখছি৷ যাদের সবার কাছে কোমরের বাত থেকে শুরু করে মহাকাশে গণ্ডগোলের সমাধান পেয়েছি। আমরা দেখছি ফেসবুকে কিছু লিখলেও গালি না লিখলেও গালি খাওয়ার যুগ। আমাদের সময়ে ক্রিকেটার থেকে লিজেন্ডে পরিনত হয়েছে স্যার শুভাগত হোম। সৌম্য সরকার আর লিটন দাসের কি ভীষণ প্রতিযোগিতা। কে আগে আউট হতে পারে, আমরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছি।

ক্রিকেটার হয়ে ক্রিকেটের বাইরেও যে কতকিছু করা যায় শিখিয়েছে নাসির আর সাব্বির। আমরা মজা যেভাবে পেয়েছি, সেভাবে মজা দিয়েছিও। আমাদের সময়েই তো ফুটবল বিশ্ব কাপিয়েছে গঞ্জালো হিগুয়েইন, করিম বেনজেমারা। একের পর এক গোল মিস হতে দেখেছি দুই চোখ ভরে।

আমরা দশ টাকায় চা সিঙ্গারা সমুচা খাওয়া জেনারেশন। ভিসি আমাদের শিখিয়েছে কিভাবে তেলের ব্যবহার করতে হয়, বিটিভি তেলের সাথে সাথে জানিয়েছে বাতাবি লেবুর খবর। আমরা বিস্ময় নিয়ে দেখেছি দেশ তোলপাড়ের সময়েও কিভাবে শান্তিতে থাকা যায়।

আমাদের সময়ে রাজনীতি করছে একজন বড় একা হয়ে যাওয়া মানুষ। আমরা তাকে ভালোবেসে প্রেমিক হয়েছি, শিখেছি সকাল বিকাল পল্টি নেয়ার নানা রুপ।  আরেকজন আমাদের হাতে ধরে শিখিয়েছেন বাবাকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। বাবাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়া ছেলেমেয়ে আমরা।

আমরাই তো বিখ্যাত সহমত ভাই জেনারেশন। আমরা দেখেছি আমাদের দেশের একজন কিভাবে ফেসবুক তৈরি করেছে৷ শিখেছি নাম না বলে চলা। কারণ, আমাদের সময়েই তো নাম বললে চাকরী থাকেনা। আমরা মিরপুর নামে একটা আস্ত নদী পেয়েছি ঢাকা শহরের মধ্যেই। ভাবলে সানাইয়ের মত গর্বে বুক ফুল ওঠে। আমাদের আগের জেনারেশন পর্যন্তও সরাসরি গালি লিখতে অস্বস্তি বোধ করতো। আমরাই তো বের করেছি সোদেনা, দোচেনা, আর কোদেনা৷ গালির নানা রুপ আর ভার্সন।

আমরা নতুন ভাষা আবিস্কার হতে দেখেছি চোখের সামনে। মুরাদ টাকলা ভাষা। বিসিএস ক্যাডার এসে প্রেমিকা নিয়ে গেলেও আমরা চোখ মুছে ফেসবুকে ট্রল করেছি। হাজার হাজার ইস্যু এসেছে, আমরা ট্রল করেই গেছি৷ অন্যকে পচাতে গিয়ে আমরাই তো ভুলে গেছি কখন আমাদের গা থেকেই দুর্গন্ধ বের হওয়া শুরু করেছে। আমরা জনি ভাই আর খলিফা আপার সময়ের ছেলেমেয়ে।

আট মিনিট সতেরো সেকেন্ড বলতে আমরা কতকিছু বুঝি। আমাদের ছেলেমেয়েরা যেগুলো কল্পনাও করতে পারবে না। প্রভা, রাজিব, সালমান, মাহি, জেসিয়া, কতজনের ভিডিও বের হলো৷ আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছি দেখছি। বাবু খাইছো আমাদের কাছে কোনো সাধারণ জিজ্ঞাসা না, একটা ইমোশনের নাম। ভাবতে বসলে গায়ে কাটা দেয়, চোখে জল আসে।

এভাবেই শতশত স্মৃতি নিয়ে আমরা একদিন বুড়ো হয়ে যাবো। কোনো এক ক্লান্ত বিকালে ব্যালকনির আলো আধারিতে বসে এসব ভাবতে ভাবতে নস্টালজিক হবো। কেউ তখন যদি জিজ্ঞেস করে, ‘জীবনটা কেমন ছিলো?’

আমরা মুচকি হেসে বলবো, ‘হুমমম, খুব ট্যাশ!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।