চলে গেলে ডাকবে না তো কেউ পিছু…

‘ভুল সবই ভুল’ গান আজও মন কেমন করায়। সুপার ডুপার হিট গান। কিন্তু যে নায়িকা ও গায়িকা এই গানটিতে প্রাণসঞ্চার করেন তাঁরা কালের অতলে তলিয়ে গেছেন। কেউ আর খোঁজ রাখেনি তাঁদের। তারাও চাননি। এই গানটি গেয়েছিলেন এক স্বল্পশ্রত গায়িকা সুজাতা চক্রবর্তী, কিন্তু যার ‘ভুল সবই ভুল’ গানটি বহুশ্রুত এবং গানে নায়িকা ছিলেন তন্দ্রা বর্মন। এই একটা গান তাদের সারাজীবন বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীত ইতিহাসে চিরভাস্বর করে রাখল।

সেই তন্দ্রা বর্মন গত ১৯ শে ফেব্রুয়ারী চলে গেলেন নীরবেই। এত পরেই খবরটা প্রকাশ্যে এসেছে তাই। ওরাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং যবনিকা পতন।

২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ সালে তাঁর জন্ম হুগলীর সিঙ্গুরে। চলে আসেন তারপর কলকাতা। চেতলা গার্লস হাইস্কুলে পড়াশুনো করেন। যদিও পরে পারিবারিক কারণে পড়াশোনা বেশিদূর এগোতে পারেননি। চলে আসেন ফিল্ম জগতে।

প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন তন্দ্রার বাবার বন্ধু। সেইসূত্রে প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘দুই তীর’ ছবিতে প্রথম ব্রেক পান তন্দ্রা। যদিও ছবিটির শ্যুটিং মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাদের বর্মন পরিবারের পরিচিত প্রযোজকের ছবি ‘ভিজে বেড়াল’ এ সুযোগ পেলেও সে ছবিও বন্ধ হয়ে যায়। এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে নায়ক ছিলেন অনুপ কুমার।

সেকাল-একাল

তন্দ্রাকে ব্রেক দেন অভিনেতা পরিচালক বিকাশ রায় তাঁর ছবি ‘কেরি সাহেবের মুন্সী’ তে। এই ছবি দিয়েই তন্দ্রার জনপ্রিয়তা শুরু। যদিও তন্দ্রা বিশাল জনপ্রিয়তা পেলেন অজয় করের ‘অতল জলের আহবান’ ছবিটি করে। তাঁর বিপরীতে নায়ক ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

এই ছবিতে তন্দ্রার ঠেঁটে সেই অবিস্মরণীয় গান ‘ভুল সবই ভুল’ শোনা যায়, গেয়েছিলেন সুজাতা চক্রবর্তী। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় অনেকেই ভাবেন তা নয় কিন্তু। তবে এই গানটা পাড়ায় পাড়ায় জলসায় তখন বনশ্রী সেনগুপ্ত গেয়ে খুব বিখ্যাত হন। সুজাতা চক্রবর্তীকে আর আমরা পেলাম না পরবর্তী কালে।

অতল জলের আহবান সিনেমাতেই ছিল সেই বিখ্যাত গান ‘ভুল সবই ভুল’।

তন্দ্রার ক্যারিয়ারের শুরু সত্যজিত রায়ের ছবিতেই হত। সত্যজিৎ রায়ের অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় ছবি ‘অপরাজিত’-তে অপুর বান্ধবী মিলির চরিত্রে তন্দ্রা পুরো শ্যুটিং করেন। সত্যজিৎ বাবু তাকে পছন্দ করে তাঁর বাড়ি গিয়ে কাস্ট করেন। তার আগে সবে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ‘অপরাজিত’র এডিটিংয়ের সময় সত্যজিত অপুর সঙ্গে কোনো নারী চরিত্র রাখবেননা বলে মিলি চরিত্রটি বাদ দিয়ে দেন ছবি থেকে আর তন্দ্রারও বিশাল পরিবর্তন হয়ে যায় ফিল্মোগ্রাফিতে।

উত্তম কুমারের সঙ্গে একটি অভিনয় করেছেন তন্দ্রা। ‘মঞ্জরী অপেরা’-তে উত্তম কুমারের সন্দেহবাতিক খিটখিটে মেজাজের স্ত্রীর ভূমিকায়। খুবই ছোটো রোল। তবু চেনা যায় এই সেই ‘অতল জলের আহবান’ ছবির অভিনেত্রী। সাবিত্রী ছিলেন নায়িকা ‘মঞ্জরী অপেরা’য়। যাকে নিয়ে তন্দ্রা উত্তমকে সন্দেহ করতেন ছবিতে।

‘কালচক্র’ সিনেমায় তন্দ্রা বর্মন। ১৯৬১ সালের ‘নবকল্লোল’-এর শারদীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ছবিটি।

এছাড়া গুরু দত্তের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেন ‘একটুকু ছোঁয়া’ ছবিতে। বেশিরভাগ বন্ধ্যা ছবি তাঁর ভাগ্যে পরেছে তাই এই ছবিটিও মুক্তি পায়নি। যেগুলি তাঁর জীবনে খুব গুরত্বপূর্ণ ছবি হতে পারতো।

এছাড়া মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘দুই বাড়ী’, ‘তানসেন’, ‘রতন লাল বাঙালী’ প্রভৃতি। বিশ্বজিতের সঙ্গে ‘এক টুকরো আগুন’ জনপ্রিয়তা পায়। ‘ন্যায়দণ্ড’ নামেও একটি ছবি করেন।

এখানে ‘রতন লাল বাঙালী’ সিনেমাটার ব্যাপারে আলাদা করে বলা দরকার। অজিত ব্যানার্জী পরিচালিত এই সিনেমাটিতেই প্র্রথমবারের মত রুপালি পর্দায় কাজ করেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়ক রাজ রাজ্জাক। তখনও তিনি কলকাতাতেই থাকতেন, নবীন এক স্ট্রাগরাল। সেটা ১৯৬১-৬২ সালের কথা। ছোট একটি ভাঁড়ের চরিত্রে ছিলেন তিনি।

যদিও, নানা রকম জটিলতায় সিনেমাটি মুক্তি পায়নি। ১৯৭৯ সালে রাজ্জাক যখন খ্যাতির চূড়ায় উঠে গেছেন তখন ‘আমি রতন’ নামে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল কলকাতায়। লক্ষ্মীনারায়ণের পরিবেশনায় সিনেমাটি মুক্তি পায় সে বছরের ১৬ জুলাই। শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায়।

অভিজিৎ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গীতায়োজনে গান লিখেছিলেন পবিত্র বন্দোপাধ্যায়, ভাস্কর চক্রবর্তী, আনন্দ মুখোপাধ্যায়। কন্ঠ দিয়েছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উৎপল সেন, তরুন বন্দোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্ররা। রাজ্জাক ও তন্দ্রা ছাড়া অভিনয় করেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী, আশীষ কুমার, নৃপতি, গীতা সিং ও কৌতুক অভিনেতা জহর রায়।

রাজ্জাকের শুরুটা হয়েছিল এই তন্দ্রার সাথেই। তন্দ্রা বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন তন্দ্রা দিজেন্দ্র কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে। একটি ছেলে আছে তাঁদের। সংসারী হবেন বলেই নিজ ইচ্ছায় ছবির জগত ছেড়ে দেন। ছেড়ে দিয়েছেন ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’র নায়িকার রোল। অনেক বছর পর ‘চেনামুখ’ নামে একটি ছবি করেন মায়ের চরিত্রে। এটাই ছিল তাঁর শেষ ছবি।

‘চেনামুখ’ ছবিতে রঞ্জিত মল্লিকের সাথে

তাঁর পছন্দের নায়িকা ছিলেন সুচিত্রা সেন। যার সঙ্গে অভিনয় করতে না পারার আফসোস ছিল আজীবনের।

চেতলার পাট চুকিয়ে হিন্দ সিনেমার পাশের ফ্ল্যাটে বহুদিন ছিলেন তাপর বাড়ি কেনেন রাসবিহারীর প্রতাপাদিত্য রোডে।

তন্দ্রা বর্মণের চলে যাবার খবর মিডিয়া সেভাবে প্রকাশ করল না। হয়তো ছবির জগত থেকে সরে গেলে মিডিয়াও তাদের ভুলে যায়। এ প্রজন্ম তো চিনতেই পারলো না তাকে। তবু একটা গান দিয়ে তন্দ্রা চিরদিন রয়ে যাবেন।

ছেলের সাথে তন্দ্রা

তন্দ্রা বর্মন (২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪০ – ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)

‘চলে গেলে ডাকবে না তো কেউ পিছু,

স্মৃতি আমার থাকবে না তো আর কিছু।

যদি ভাবি এই আমি আর

নই একা, সে ভুল।

ভুল সবই ভুল

এই জীবনের পাতায় পাতায়

যা লেখা, সে ভুল।’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।