মেয়াদ উত্তীর্ণ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে ইতোপূর্বে এক আর্টিকেল লিখেছিলাম, যেটা সম্ভবত তাকে ঘিরে অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে প্রকাশিত কনটেন্টের মধ্যে দীর্ঘতম। তবে সেটা সেই ২০১৭ এর মাঝামাঝি সময়ের গল্প, আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি ২০২০ এর দশকে। আড়াই বছর মানে ৩০ মাস, প্রায় ৯০০ দিন; এখন যা অনিবার্য ৯০০ দিন পরও তার গ্রহণযোগ্যতা একই থাকবে তা ভাবার যৌক্তিকতা নেই। আবার এখন অনিবার্যতা ফুরানো মানে ৯০০ দিন বা তা তারও পূর্বের পারফরম্যান্সকে অগ্রাহ্য করা – এমন বাইনারি নয় ব্যাপারগুলো।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচাইতে ভাগ্যবান ক্রিকেটার কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে বহু যাচাই-বাছাই করে ২ জনের নামই চূড়ান্ত তালিকায় রাখবো আমি। প্রথমত, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, দ্বিতীয়ত ইমরুল কায়েস।

মাহমুদউল্লাহ যে ক্যালিবার এবং বৈশিষ্ট্যের প্লেয়ার, তাতে তার ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান হতে পারতো ১২ টেস্ট, ৭০ ওয়ানডে আর ২৫টি-টোয়েন্টি বড়জোর। অথচ সে টেস্ট খেলেছে প্রায় ৫০টি, ওয়ানডে ১৮৫টি, এবং টি-টোয়েন্টি ৮০+।

ইমরুল কায়েস ব্যতীত আর কোনো খেলোয়াড় নেই যে তার যোগ্যতার তুলনায় এত বেশি ম্যাচ খেলতে পেরেছে। সেই দিক থেকে তারা দুজনই ভাগ্যবান। তবে সম্পূরক প্রশ্ন আসতেই পারে, এত প্লেয়ারের মধ্যে এই দুজনই ভাগ্যবান কেন হলো; অন্যরা সেই ভাগ্য নিয়ে জন্মালো না কেন?

২০১৫ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহ ছিল ‘বিট অব পিস’ প্লেয়ার, যে কিছু ব্যাটিং, কিছু বোলিং দিয়ে একাদশে থাকবে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট একটি বিভাগ ধরলে স্কোয়াডেই জায়গা পাবে না।এদের বলা যায় ভাঙতি প্লেয়ার। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ভাঙতি প্লেয়ারের এক সুদীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে। খালেদ মাহমুদ সুজন আর নাঈমুর রহমান দুর্জয়কে বলা যেতে পারে ভাঙতি প্লেয়ারের পুরোধা।

সেই ধারাতেই দলে এসেছে সোহরাওয়ার্দি শুভ, নাঈম ইসলাম, নাসির হোসেন। বর্তমানের কনটেক্সটেও কয়েকজনকে ভাঙতি প্লেয়ার হিসেবে চেষ্টা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য মোসাদ্দেক হোসেন; আরেক উঠতি ক্রিকেটার আফিফকে নিয়েও একই এক্সপেরিমেন্ট চেষ্টা করা হচ্ছে, এবং ৫ বছর সময় নিয়েও ব্যাটিংয়ে আহামরি পরিবর্তন আনতে না পেরে টিকে থাকবার প্রয়োজনে নিজ উদ্যোগেই ভাঙতি প্লেয়ার হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সৌম্য সরকার।

বাংলাদেশের ভাঙতি প্লেয়ারদের সুদীর্ঘ সংস্কৃতিতে উজ্জ্বলতম নাম মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ভাঙতি প্লেয়াররা মাঝেমাঝে বেশ ইফেক্টিভ হয়। ব্যাটিংয়ে ২৫-৩০ রান করার পাশাপাশি বোলিংয়ে কয়েক ওভার সাপোর্ট দিবে, পার্টনারশিপ ভাঙতে কাজে আসবে। টেস্টে ভাঙতি প্লেয়াররা সবসময়ই অচল, তবু বাংলাদেশের টেস্ট স্কোয়াডে বরাবরই ১-২ জন ভাঙতি প্লেয়ার জায়গা পায়।

এর মূল কারণ, টেস্টে তারা প্রায় নিয়মিতই ইনিংস ব্যবধানে হারতো, সেটা ঠেকানোর জন্য ৮ নম্বর পর্যন্ত ব্যাটসম্যান রাখতো একাদশে। যেহেতু জেনুইন বোলার আর ভাঙতি প্লেয়ারের বোলিংমানে খুব বড়ো পার্থক্য হয় না টেস্টে, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা অনায়াসেই তাদের দৌড়ের উপর রাখে, তাই ভাঙতি প্লেয়াররা ২৫-৩০ রানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাদশে ঢুকে পড়েছে। অন্যদিকে মূল ব্যাটসম্যানরাও ২৫-৩০ করতে গিয়ে খাবি খায়। সামগ্রীকভাবে এতোটাই নিম্নমানের ব্যাটিং-বোলিং প্রদর্শনী ছিল যে, যত বেশি সম্ভব ভাঙতি প্লেয়ার নেয়া যায় দলের জন্য তত ভালো, এটাই সম্ভবত দাওয়াই ছিল।

ভাঙতি প্লেয়ারদের গড় আয়ু ৩ থেকে ৪ সিরিজ, এরপর সেখানে আসে নতুন ভাঙতি প্লেয়ার; এরপর তারা পর্যায়ক্রমে দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে। মুশফিক ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে বাদ পড়েছিল, ভাঙতি প্লেয়ার হয়েও মাহমুদউল্লাহ স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে বাদ পড়েছে কিনা মনে করতে পারছি না।

ভাঙতি প্লেয়ার থেকে মাহমুদউল্লাহ’র ব্যাটসম্যান হয়ে উঠা কোচ হাথুরুসিংহের মাধ্যমে। হাথুরু তাকে সেই সুযোগ কেন দিয়েছিল এর কারণ খুঁজতে গিয়ে শ্রীলংকান ক্রিকেট সংস্কৃতির দিকে দৃষ্টি চলে যায়।

ওয়ানডে ক্রিকেটের ব্যাকরণ বদলানো ওপেনার হওয়ার পূর্বে জয়াসুরিয়ার পরিচয় ছিল একজন ভাঙতি প্লেয়ার। তিলকারত্নে দিলশান, থিলান সামারাবিরা প্রমুখেরাও পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হওয়ার পূর্বে ভাঙতি ক্রিকেটার হিসেবেই একাদশে সুযোগ পেত। নিজের দেশের ক্রিকেটের কেইস স্টাডিগুলো হাথুরুকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। যে কারণে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে মাহমুদউল্লাহকে সে ৪ নম্বরে তুলে আনে, পরপর ২ ম্যাচে সেঞ্চুরি করে মাহমুদুল্লাহ ব্যাটসম্যান হয়ে উঠে। ভাঙতি প্লেয়ার পরিচয় মুছতে এরপর সে বোলিং প্রায় বন্ধই করে দেয়।

তবে চার নম্বরে নিজের জায়গা সে বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি, পরের বছর থেকেই তাকে ৬ নম্বরে দেখা যায়। ২০১৬ এর টি২০ বিশ্বকাপ উপলক্ষে সে বছর ওয়ানডের তুলনায় টি২০ই বেশি খেলা হয়। কয়েকটা ম্যাচে স্ট্রাইকরেট তুলনামূলক বেশি রেখে কিছু রান করায় এবং ২০১৭ এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে সেঞ্চুরি করে ম্যাচ জেতানোয় ভাঙতি প্লেয়ারের নতুন ট্যাগ জুটে সাইলেন্ট কিলার বা ফিনিশার, যদিও টি-টোয়েন্টিতে মাত্র ১২০-২২ স্ট্রাইক রেট এর একজন ব্যাটসম্যান কীভাবে ফিনিশার হয়ে যায় সেই রহস্যের মীমাংসা হয়নি।

ফিনিশার পারসেপশন কীভাবে গড়ে উঠেছিল বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।

১৮৫ ওয়ানডের ক্যারিয়ারে ৪২ বার এবং ৮৩ টি-টোয়েন্টির মধ্যে ১৬ বার নট আউট ছিল মাহমুদউল্লাহ, যা ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলা যে কোনো বাংলাদেশী ক্রিকেটারের চাইতে সম্ভবত বেশি। তার মানে পাঁচটা ইনিংস খেললে একটাতে সে নট আউট থাকবে। নট আউট থাকার প্রভাব পড়ে ব্যাটিং গড়ে। বাংলাদেশ হারুক বা জিতুক, মাহমুদউল্লাহ যেহেতু নট আউট থাকছে, সেখান থেকেই ফিনিশার পারসেপশনটা আসতে পারে। কিন্তু নট আউট থাকার জন্য ইনিংসের শেষের দিকের সেলফিশ রানিংগুলো দর্শকের মাথায় থাকে না, দর্শকের মাথায় ঘোরে নিদহাস ট্রফিতে ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতানোর অনুভূতি।

খেলোয়াড় হিসেবে মাহমুদুল্লাহ এর এপিটাফ লেখা হয়ে গেছে ২০১৮ এর এশিয়া কাপ থেকেই; বলা যায় এরপর থেকে সে এলপিআর এ গিয়ে আগেকার মতোই দায়িত্ব পালন করে গেছে, কিংবা একই সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে। তবে সে শেষ হয়ে গিয়েছিল আরও আগেই; যে হাথুরু তাকে ভাঙতি প্লেয়ার থেকে ব্যাটসম্যানে উন্নীত করেছিল সে-ই অনুভব করেছিল তার ফুরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা। যে কারণে শততম টেস্টে তাকে একাদশ থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল, এবং দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু মাশরাফির বলা ‘রিয়াদ না খেললে আমি শ্রীলংকায় যাবো না’ কথাটা এত বেশি মার্কেট পেয়ে যায় তাকে আর বাদ দেয়া সম্ভব হয়নি।

উত্তেজিত দর্শক লিটন- সৌম্য-সাব্বির কিংবা ইমরুল-মিঠুনকে নিয়ে অনেক বেশি ট্রল করায়, কিংবা তামিম ইকবালকে নিয়ে প্রবল সমালোচনা করায় মাহমুদুল্লাহ বারবারই বেঁচে যায়। ২০১৫ বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ‘ভায়রা ভাই’ বিশেষণে তাকে নিয়ে কিছুটা খোঁচাখুচি হলেও সেটা কখনোই ইমরুল পর্যায়ের ছিল না।

আমাদের দর্শক, সাংবাদিকদের প্রত্যাশার স্ট্যান্ডার্ড কেমন তা বোঝা গেছে নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপকে হারানো ম্যাচের শিরোনামগুলো পড়লে। টি২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে কোয়ালিফাইং রাউন্ডে খেলতে হবে। নামিবিয়া, স্কটল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডের সঙ্গে খেলে তবেই মূল পর্বে সুযোগ পেতে হবে।দর্শক বা খেলোয়াড়দের সঙ্গে যদি কথা বলা হয়, আমার ধারণা নেদারল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে যে বাংলাদেশ জিতবেই এটা তারা জোর দিয়ে বলতে পারছে না। ফলে কোনোভাবে মূল পর্বে উঠতে পারলেই প্রত্যাশার ৬০% পূরণ হয়ে যাবে। মূল পর্বে ১টা, ২টা ম্যাচ জিতলেই বোনাস। মিরপুর আর চট্টগ্রামের উইকেটে খেলে খেলে অস্ট্রেলিয়ায় খেলার জন্য প্রস্তুতি নিবে। যে কারণে ফিটনেস জর্জরিত মাহমুদুল্লাহ ই এই দলের কাণ্ডারি।সাকিব নিষিদ্ধ হয়ে মাহমুদুল্লাহ এর ভাগ্য আবারো বদলে দিয়েছে।

বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর প্রধান কাজ হওয়ার কথা ওপেনার, ওপেনিং বোলার আর বাজে ফিটনেসের খেলোয়াড়দের অব্যাহতি দিয়ে সেখানে নতুন প্লেয়ার নিয়ে আসা। সেই হিসাবে তামিম, মাশরাফি আর মাহমুদউল্লাহ বিনা প্রশ্নে বাদ পড়ার কথা।অথচ মাশরাফি আর তামিমকে নিয়ে যত কথা হয়েছে মাহমুদুল্লাহকে নিয়ে তার কিছুই হয়নি; শুধুমাত্র ক্রিকবাজ এ একটা নিউজ এসেছিল সাকিবের সাথে তার কলহ বিষয়ে।

যে কোনো খেলার প্রধান শর্ত ফিটনেস। বিশ্বকাপের আগে থেকেই মাহমুদউল্লাহ ইনজুরি ক্যারি করছে, বোলিং করতে পারেনি টুর্নামেন্টে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটা মিস করেছে। ভারত সফরে আবারো হ্যামস্ট্রিং, এরপর বিপিএল এ আবারো। মানে ৫ মাসের ব্যবধানে ৩ বার একই ইনজুরিতে পড়লো সে।

এগুলো তার ফিটনেসহীনতার লক্ষণ। মাঠে গিয়ে যারা বাংলাদেশের খেলা দেখেন, অন ফিল্ড সবচাইতে বাজে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কার সেই প্রশ্নে মুস্তাফিজ, ইমরুল আর মাহমুদুল্লাহ এর বাইরে অন্য কারো নাম আসা কঠিন। মাহমুদউল্লাহকে কখনো দুর্দান্ত ডাইভে বাউন্ডারি বাঁচাতে বা কঠিন কোনো ক্যাচ নিতে দেখেছেন কয়বার? পক্ষান্তরে মিস ফিল্ডিং বা ক্যাচ ড্রপ করার ঘটনা কতবার? সে কখনোই এথলেট ফিল্ডার ছিল না। সে বলের পেছনে দৌড়াবে, নাগালের মধ্যে পেলে আটকাবে, কিংবা লং ক্যাচ ধরবে, শার্প ক্যাচ মিস করবে – এগুলোই ফিল্ডার হিসেবে তার ট্রেডমার্ক।

ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টিতে কেবলমাত্র ফিল্ডিং দিয়েই ২০-৩০ রান সেভ করা যায় প্রতি ম্যাচে, কিংবা দুর্দান্ত কোনো ক্যাচ বা রান আউট দিয়ে ম্যাচের ফলাফল পাল্টে দেয়া যায়। দলের অধিনায়ক যদি হয় ফিটনেসবিহীন এবং দুর্বল ফিল্ডিংয়ের, তার পক্ষে সতীর্থদের ফিল্ডিং, ফিটনেস নিয়ে কথা বলাটা বিব্রতকর হয়ে উঠে। রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে সমগ্র ক্যারিয়ারেই সে শোচনীয় পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।

২০১৯ বিশ্বকাপে মাশরাফিকে অধিনায়ক রেখে বিসিবি যে ভুল করেছিল, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাহমুদুল্লাহকে অধিনায়ক মনোনীত করে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে যাচ্ছে।

অনেকেই বলেন ৬ নম্বরে মাহমুদউল্লাহ’র নাকি বিকল্প নেই। আপনার বিকল্প যদি ঘুরেফিরে ইমরুল আর সাব্বির হয়, এমনটাই মনে হবে। বরং একদম নতুন কাউকে টানা ৫ টা সিরিজ খেলিয়ে দেখেন, তারপর মন্তব্য করাটা অর্থবহ হতে পারে। সাব্বির, ইমরুল এদের আর নতুন করে দেখার কি বাকি আছে কিছু?

ধরা যাক, পাকিস্তান সফরের ঠিক আগে মাহমুদউল্লাহ আবারো চোটে পড়লো, এবং সফর মিস করলো।তার জায়গায় কেউ না কেউ তো খেলবেই, তাই না? কিংবা ভারত সফরে যে একযোগে নাঈম, বিপ্লব, আফিফরা খেললো, তাতে কি ফলাফল খুব খারাপ হয়েছে; তামিম আর সাকিব খেলেনি একবারও কি মনে হয়েছে?

গতকাল ডেইলি স্টার নেট এ কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর ইন্টারভিউ পড়ে যা বুঝলাম, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্কোয়াড অনেকটাই তৈরি, ১-২টা পজিশনে হয়তো সামান্য সংশয় আছে।এই এন্টারপ্রেটেশনে একটা বিরাট সমস্যা আছে। আপনার দল তৈরি মানে হয় আপনার দল খুব ভালো পারফর্ম করছে, অথবা আপনার সংগ্রহে এর চাইতে ভালো মানের প্লেয়ার নেই; যা-ই পারফর্ম করুক এই দলকেই খেলাতে হবে। বিসিবির সিলেকশন প্রসেস ২য় স্বীকার্য অনুসরণ করে চলছে। সেক্ষেত্রে যদি প্রশ্ন হয় এই দলের খেলোয়াড়দের বয়স বেড়ে গেলে কি ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দেবেন? তখন অবশ্য উত্তর মিলবে না।

বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে আফগানিস্তানেরও পরে, তার মানে কতটা বাজে খেলে এই ফরম্যাটে। সেই ফরম্যাটের বিশ্বকাপ দল এত আগেই তৈরি হয়ে যায় কোন যুক্তিতে? ভারত সফরের মাত্র ৩ টি টি-টোয়েন্টি, আর জিম্বাবুইয়ে-আফগানিস্তানকে নিয়ে হওয়া টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো দিয়েই বিশ্বকাপের দল হয়ে গেল? বরং ২০ জনের একটা পুল গঠন করে এশিয়া কাপ পর্যন্ত সেই খেলোয়াড়দের ট্রাই করা হোক, প্রয়োজনে আরেকটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হোক।

ডোমিঙ্গো বলেছে আগে অধিনায়কত্ব করেনি এমন কাউকে অধিনায়ক করার সময় এটা নয়, মাহমুদুল্লাহ যদি বিশ্বকাপের অধিনায়ক না থাকে খুবই অবাক হবো।

এগুলো চাকরি রক্ষা নীতি কথা। বাংলাদেশের কালচার সে এ কয়দিনেই বুঝে নিয়েছে। নইলে যে সাউথ আফ্রিকা গ্রায়েম স্মিথের মতো আনকোড়া এক ক্রিকেটারকে, ২০০৩ বিশ্বকাপে দল বাজে পারফর্ম করার পর, অধিনায়ক নির্বাচন করে, সেই সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা কোচ মাহমুদুল্লাহকে অধিনায়কত্বে না দেখলে অবাক হবে, এটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

মাহমুদুল্লাহ দলে থাকার ৩ টি সুস্পষ্ট ক্ষতি রয়েছে, যা ভক্তকুল উপলব্ধি করতে পারছে না।

প্রথমত – ফিটনেস নয়, লিয়াজো এবং সিনিয়রিটিই দলে থাকার একমাত্র প্যারামিটার এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, যে খেলোয়াড়গুলোকে গ্রুম করা দরকার তারা নজরে পড়ছে না। ফলে একজন খেলোয়াড় যদি ৩ বছর পর্যবেক্ষণে থাকার কথা থাকতো, মাহমুদুল্লাহরা সেই সময়টা নিয়ে নেয়াতে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় কমে গিয়ে ৩ বছরের পরিবর্তে দেড় বা দুই বছর হয়ে যাবে। এতে পরবর্তী ব্যাচগুলোর রিক্রুটমেন্ট এবং নারচারিংয়ে বড়ো ত্রুটি রয়েই যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, ক্যারিয়ার নিরুপদ্রব করতে রাজনীতি আর ষড়যন্ত্র চলবে। যেমন, ভারতের বিপক্ষে ৩য় টি২০ তে মিঠুনের ৪ নম্বরে নামা। সিরিজে সেটাই মিঠুনের প্রথম ম্যাচ। যদি গেমপ্ল্যান থাকে ম্যাচ শেষের দিকে যাবে বিধায় মুশফিক রিজার্ভে থাকবে সেক্ষেত্রে আগের ২ ম্যাচে খেলা আফিফ ৪ নম্বরে আসার কথা; কিন্তু তাকে পাঠানো হলো ৭ নম্বরে; এর কারণ কী হতে পারে? আফিফকে ভাঙতি প্লেয়ার বানানোর চেষ্টা চলছে, সে যদি উপরে খেলে রান পেয়ে বসে, সাথে তার বোলিং সামর্থ্য মিলিয়ে মাহমুদুল্লাহ এর খুব একটা প্রয়োজন থাকে না দলে। একই কারণে মোসাদ্দেককেও উপরে খেলানো হবে না। অথচ ক্রিকেট মনোযোগ দিয়ে দেখা যে কেউই বুঝবে টি২০ তে আফিফের উচিত প্রথম ৩ এর মধ্যে ব্যাটিং করা।সে যদি ২৫-৩০ রানও করে ব্যাটিং এপ্রোচের কারণে সেটা দলের জন্য মোমেন্টাম সেট করে দেবে।

প্রশ্নটা এখানে নয়, ক্রিকেটারের আর কতটুকুই বা ক্ষমতা, নির্বাচকরা বাদ দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়; নাজমুল হাসান পাপন কেন এখনো এদের উপরই ভরসা রাখে– এটাই প্রশ্ন। এর প্রধান কারণ একেবারে তারুণ্যনির্ভর দল গঠন না করে কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার দলে রাখা। প্রত্যেক দলের ‘কোর ক্রিকেটার’ থাকে কয়েকজন, সেই কোরকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা। এক্ষেত্রে দুটো কনসেপচুয়াল ভুল রয়েছে।

প্রথমত, অভিজ্ঞতা আর বয়স্ক দুটো সবসময় সমার্থক নয়। কেউ দীর্ঘদিন খেললে তার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। অভিজ্ঞতার সাথে সাথে উপলব্ধি তৈরি হতে হয়। উপলব্ধি আসে কৌতূহল আর আত্মসমালোচনা থেকে। বাংলাদেশের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বয়স্ক মানুষ আছে প্রচুর, কিন্তু উপলব্ধিসম্পন্ন অভিজ্ঞ মানুষ খুবই কম। একারণে এদেশের অভিজ্ঞতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইমরুল কায়েসের অভিজ্ঞতার মতো মূল্যহীন। বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কয়েক বছর খেলেছে এমন বয়স্ক ক্রিকেটারই যথেষ্ট। সেদিক থেকে, জাতীয় দলে কমপক্ষে ৩ বছর ধরে খেলছে এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু ‘সিনিয়র’ বিশেষণটি অর্পিত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার ঠিকাদারি ৪-৫ জন ক্রিকেটারের কাছেই কুক্ষিগত থাকে।

দ্বিতীয়ত, কোনো ‘কোর সদস্য’ দের ব্যাপ্তিই এক নাগাড়ে ৭-৮ বছরের বেশি হয় না সাধারণত। এর মধ্যে কোর সদস্যদের কেউ কেউ বাদ পড়ে, নতুন সদস্য কোরে যুক্ত হয়; কোর তৈরি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ এই জায়গাতেও পিছিয়ে পড়েছে। কোর সদস্যরা প্রায় ৮-৯ বছর ধরে একই ভূমিকা পালন করছে। ফলে কোরটাই রিভিউ করার সময় পেরিয়ে গেছে।

পাইপলাইনে ভালো প্লেয়ার নেই এটা যে ডাহা মিথ্যা কথা এবারের বিপিএল এ দেশি বোলারদের দেখলেই ভুল ভাঙবে। কিন্তু সেই ভুলটাকে আকড়ে ধরেই ক্রিকেট চলছে, এই বাজে ব্যাপারটাকে কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।

মাশরাফির অবসর নিয়ে বিসিবি যেভাবে প্রকাশ্যে নিজেদের অবস্থান নিয়েছে, একই অবস্থান মাহমুদুল্লাহ এর ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা উচিত। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ফিটনেস তার আর অবশিষ্ট নেই। তুষার ইমরান, রকিবুল বা নাঈম ইসলামরা যদি বয়স আর ফিটনেসের কারণে বিবেচনার বাইরে চলে যায়, মাহমুদুল্লাহকেও সেই দলে কেন টানা হবে না কেউ বলতে পারেন?

ভারতের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাহমুদউল্লাহ’র ব্যাটিং এবং বোলিং বর্জন করবো। ইমরুলের ব্যাটিং যেমন ২০১৭ থেকে বর্জন করে চলেছি, ২০২০ এর শুরুই হবে মাহমুদুল্লাহকে পর্যবেক্ষণের তালিকা থেকে অব্যাহতি দেয়ার মাধ্যমে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।