দ্য ‘লিটন দাস ডিলেমা’

লিটন দাসকে অনেকেই প্রতিভাবান বলেন, আমি তার ব্যাটিং বিশেষ পছন্দ করি।

কেন?

লিটন দাস প্রায় সবরকম শট খেলতে জানে। পুল, হুক, ফ্লিক, সুইপ(প্যাডল, স্লগ, রিভার্স), ফ্লিক, ড্রাইভ, কাট, আপার কাট, স্কুপ, ইনসাইড আউট। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে আর কোনো ব্যাটসম্যানকে দেখিনি যার শট রেঞ্জ এতো বেশি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুশফিকুর রহিম, তবু শট রেঞ্জে মুশফিক তার চাইতে অনেকটাই পিছিয়ে।

শট রেঞ্জ বেশি হওয়াই কি সার্থকতা? শট খেলার মূল লক্ষ্য তো রান করা, সেখানেই যদি ঘাটতি থাকে, স্কোরিং শটের সংখ্যা ৫০ টা হলেই বা কী; এক বলে তো মাত্র একটা শটই খেলা যাবে, এবং সিদ্ধান্ত নিতে হবে এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে। এন্টিসিপেশন একটি মানসিক স্কিল, সেটা রপ্ত করতে হয়।

যে ব্যাটসম্যানের এতোগুলো স্কোরিং শট, এবং যার ফিল্ডিং-ফিটনেস দুটোই গড়পড়তা বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের চাইতে বেশি, তার ক্রিকেটিং স্কিলে খুব বড়ো দুর্বলতা থাকার কথা নয়।

আমরা যারা ক্রিকেটের নন-টেকনিকাল মানুষ, অর্থাৎ জীবনে কোনোদিনই কোনো লেভেলে প্রফেশনাল ক্রিকেট খেলিনি, পাড়ায় বা স্কুল-কলেজে টেপ টেনিস খেলাই আমাদের খেলোয়াড়ি জীবনের সর্বোচ্চ পর্যায় তারা সাধারণত একজন ব্যাটসম্যানকে জাজ করতে গিয়ে শুরুতেই একটা স্টেরিওটাইপ ঠিক করে নেয়- যেমন তার ডিফেন্স কীরকম, তার ব্যাটের সুইং, পা কতখানি নাড়াচ্ছে, অফস্ট্যাম্পের আনছার্টেইন করিডোরে খেলার সময় ব্যাট আর শরীরের মধ্যে কতখানি ব্যবধান থাকে – এগুলো হাইলি টেকনিকাল বিষয় যেগুলো নিয়ে ক্রিকেট কোচরা কাজ করে থাকে। তবে একটু ইনোভেটিভ চিন্তাধারার কোচরা এটাও স্বীকার করে, রান করার জন্য এগুলোর একটা শর্ত পূরণ না করলেও চলে, যে কারণে কোচরা রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাটিং দেখতে বলবে কিন্তু ব্রায়ান লারা বা স্টিভ স্মিথের ব্যাটিংকে রেকমেন্ড করবে না।

আমি ক্রিকেট পারসোনালিটি বা ক্রিকেটের স্ট্র‍্যাটেজিকাল গেমপ্ল্যান বিষয়ে বহু আর্টিকেল লিখেছি, কিন্তু কখনোই টেকনিকাল বিষয় সেখানে থাকে না। প্রথমত, আমি নিজে কোনোদিনই প্রফেশনাল ক্রিকেট খেলিনি, টেকনিকাল ব্যাপারগুলো কেবলমাত্র পর্যবেক্ষণ দিয়ে উপলব্ধি করা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, আমি ৯-১০ বছর বয়স থেকে মানুষের ইন্টারভিউ নিই; তার চিন্তাপ্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রিসার্চ করছি।

যে কারণে ক্রিকেটের সাইকোলজিকাল দিকগুলোকেই প্রাধান্য দিই বরাবর।

এতো সব স্কোরিং শট যে লিটন দাসের, তার ট্রেডমার্ক শট কোনটা? মানে কোন শট দেখলেই মনে পড়বে এটা লিটন স্পেশাল? মুশফিকের যেমন স্লগ সুইপ, তামিমের কভারের উপর দিয়ে ইনসাইড আউট। লিটনের ক্ষেত্রে ফ্লিক বলা যেতে পারে, তবু নিরংকুশভাবে নয়। ফ্লিক শটের দুটো প্রধান ঝুঁকি- এটা থেকে প্রায়ই লিডিং এজড হয়, এবং লাইন মিস করলে লেগবিফোর হবার সম্ভাবনা বাড়ে।

তাছাড়া ফ্লিক খেলার জন্য যে লেন্থের বল আদর্শ, ভালো মানের বোলার খুব কম ক্ষেত্রেই সেই লেন্থ এ বল দিবে, হয়তোবা দুই ওভারে একটা। ইনসাইড আউটকেও ট্রেড মার্ক বলা যেতে পারে, তবে এটাও ফিফটি-ফিফটি শট; মুহূর্তের মধ্যে জায়গা বের করে যথেষ্ট পাওয়ার দিয়ে খেলতে হয়, বোলার বুদ্ধিমান হলে লেন্থ চেঞ্জ করে দিবে, খুব পারফেকশনিস্ট না হলে ব্যাটসম্যান বোল্ড/কট বিহাইন্ড অথবা মিস টাইমড এ ৩০ গজের আশপাশে ক্যাচ আউট হবে।

তার মানে লিটন প্রচুর শট খেলতে পারলেও বিশেষ দক্ষতা আছে এমন কোনো শট নেই তার, এবং যেগুলো তার ট্রেডমার্ক প্রতিটিই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়াতে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে তাকে দ্বিধায় ভুগতে হয়।

মুশফিকের স্লগ সুইপও ঝুঁকিপূর্ণ, একারণে সে বিকল্প হিসেবে ড্রাইভ খেলে কনফিডেন্স বাড়ায়। লিটনের কনফিডেন্সের জন্য লাগে বাউন্ডারি; শুরুতে ১-২টা বাউন্ডারি পেয়ে গেলে তার জন্য ব্যাটিং করাটা সহজ হয়ে যায়, বাউন্ডারি না পেলে দোটানা তৈরি হয়; আজ কি তবে আমার দিন নয়?- এই ভগ্নাংশ সেকেন্ডের অনিশ্চয়তা থেকেই সে ব্যাট আর বলের নির্ভুল সংযোগে বিভ্রান্ত হয়।

লিটনকে তবে প্রতিভাবান বলার কারণ কী?

প্রতিভা তো পুরোপুরিই পারফর্মিং স্কিল। একজন গায়ককে তখনই প্রতিভাবান বলা হয় যখন তার গান শুনে ভালো লাগে; সে কত বছর ধরে কোন কোন দেশে কার তত্ত্বাবধানে গান শিখেছে তা বিবেচ্য নয়। একজন লেখককে তখনই প্রতিভাবান বলা হয় যখন তার লেখা পড়ে কারো মধ্যে উদ্দীপনা তৈরি হয়; সে কয় হাজার বই পড়েছে, কতদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে এগুলো সাপোর্টিভ রেফারেন্স ডেটা হিসেবে কাজ করে। ভালো লাগানোর শর্ত সর্বপ্রথমে বিবেচনায় নেয়া হয়।

আশ্চর্যজনকভাবে খেলাধুলাতেই প্রতিভার এন্টারপ্রেটেশন গেছে বদলে। এখানে একজন ব্যাটসম্যান ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করতে পারছে কিনা তার চাইতে সে কতরকম শট খেলতে পারে, সেটা হয়েছে প্রতিভার মানদণ্ড।

তবে কি লিটন দাস প্রতিভাবান নয়?

আরো আলোচনা করি, তারপর দেখা যাক।

  • লিটন দাসের আমলনামা

লিটন দাস জাতীয় দলে আসে ২০১৫ সালে, তবে ২০১৮-এর নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২১৫ চেইজ করে জেতা ম্যাচের আগপর্যন্ত মধ্যবর্তী ৩ বছরে সে আসা যাওয়ার মধ্যে ছিল। তাকে আমরা গ্রাহ্য করেছি টি-টোয়েন্টি দিয়েই, কারণ এরপরই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ৩ ওয়ানডের কোনো ম্যাচেই সে সুযোগ পায়নি। অথচ টি-টোয়েন্টিতে ৬১ করে সে ম্যাচ উইনার হয়।

ওয়ানডেতে সে প্রথম সিরিয়াসলি বিবেচিত হয় এশিয়া কাপে। প্রথম ম্যাচে শূন্য, পরের দুই ম্যাচে ব্যর্থ, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৪১, পরের ম্যাচে ব্যর্থ, এবং ফাইনালে অপ্রত্যাশিতভাবে ১২১ রানের সেই ইনিংস, যা তাকে ওয়ানডে ফরম্যাটে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্ল্যাটফরম দেয়। পরের জিম্বাবুয়ে সিরিজে একটাতে ৮৩, বাকি দুটোয় ব্যর্থ।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে একটাতে ৪২, একটাতে ২৩, অন্যটায় ইনজুরিতে হাসপাতালে যেতে হয়। তিন টি-টোয়েন্টির একটাতে ৬২, একটায় ৪২। নিউজিল্যান্ড সিরিজে তিন ওয়ানডেতেই এক করে, তারপর সৌম্যের কাছে জায়গা হারায়। আয়ারল্যান্ড সিরিজে ১টামাত্র ম্যাচে সুযোগ পেয়ে ৭৬; বিশ্বকাপের প্রথম তিন ম্যাচে স্টার্টিং ১১ এর বাইরে থেকে ৪র্থ ম্যাচে প্রথমবার সুযোগ পেয়েই ৯৪; এরপরে ২০, ১৬, ২২, ৩২। এরপর আর ওয়ানডে খেলা হয়নি। টি-টোয়েন্টি খেলেছে চারটা- ১৯,০, ৩৮, ৪!

২০১৮ এর সেই টি-টোয়েন্টির আগে লিটন টেস্টে তিনটা ফিফটি করেছিল, এরপর মধ্যবর্তী দেড়বছরে ফিফটি মাত্র একটা; অবাক লাগে না?

এবার লিটনের পরিসংখ্যান কী বলে দেখা যাক!

ওয়ানডেতে ৩৩ ম্যাচে ফিফটি তিনটা, সেঞ্চুরি একটা। ৪০+ ইনিংস দুইটা, গড় – ২৪.৭৭, স্ট্রাইকরেট – ৮৮.১৭। অর্থাৎ ৩৩ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৬ টাতে তার পারফরম্যান্স ভদ্রস্থ, বাকি ২৭টিতেই শোচনীয়। এশিয়া কাপ পূর্ব সময়টাকে যদি তার স্ট্রাগলিং পিরিয়ড ধরি তবে ২২টা ম্যাচ পাওয়া যায়। সেই ২২ ইনিংসের ছয়টাতে সে ভদ্রস্থ, ১৬ টাতে হ-য-ব-র-ল।

টি-টোয়েন্টিতে ২২ ম্যাচে গড় – ২০.৫৪, স্ট্রাইকরেট ১৩৮.২২, ফিফটি দু’টি, ৩০+ ইনিংস সম্ভবত চারটা (কম-বেশি হতে পারে)৷ তবে বাংলাদেশের কোনো ওপেনারই (তামিম, সৌম্য, বিজয়, ইমরুল) যেহেতু টি-টোয়েন্টিতে আগ্রাসী ব্যাটিং করতে পারে না, নাঈম শেখ-জাকির হাসান জাতীয় ব্যাটসম্যানরা পারফরম করার আগ পর্যন্ত মন্দের ভালো হিসেবে লিটন চলতে পারে।

টেস্টে ২৮ ইনিংসে ৪ ফিফটি, গড় ২৩.৭১। এবং মনে রাখা দরকার, লিটন লাইমলাইটে আগে টেস্টে তিনটি ফিফটি করেছিল। শ্রীলংকার বিপক্ষে ৯৪, সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭০, এবং ভারতের মাটিতে ফিফটি।

সেই লিটন টেস্টে এমন বিবর্ণ হয়ে গেলো কেন? ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি উপযোগী হতে গিয়েই কি টেস্ট মেজাজ হারিয়ে বসলো?

তার ফার্স্ট ক্লাস পরিসংখ্যান কী বলছে?

১০৫ ইনিংসে গড় ৪৭.৭৩, ফিফটি-২২, সেঞ্চুরি-১৩; অর্থাৎ প্রতি তিন ইনিংসে সে একটি ৫০+ ইনিংস খেলে ‘অভ্যস্ত’।

অভ্যস্ত শব্দটাকে কমাবদ্ধ করলাম। ওয়ানডেতেও ২২ ইনিংসে সে ছয় টা ৪০+ ইনিংস খেলেছে, এখানে চার ইনিংসে (আদতে ৩.৬৬) একটা ভদ্রস্থ স্কোর।

সূত্র বলে, লিটন সবচাইতে কনসিসটেন্ট হবে টেস্টে, তারপর ওয়ানডেতে, টি-টোয়েন্টিতে চলনসই। কিন্তু যেহেতু তার স্কোরিং শট অনেক বেশি, টি-টোয়েন্টিতে রান পাবে, তবে স্ট্রাইকরেট হয়তোবা টি-টোয়েন্টি সুলভ হবে না।

অথচ, অন্তত ২০ টা টি-টোয়েন্টি খেলেছে এমন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার স্ট্রাইকরেটই সর্বোচ্চ।

ব্যাপারটা ভীষণ উদ্ভট এবং কন্ট্রাডিক্টরি লাগছে না? আরেকটু নিরীক্ষণ করা যাক।

লিটনের পারসোনালিটি ম্যাপিংঃ

লিটনের পারসোনালিটি ট্রেইট INFP (গুগলে INFP লিখে সার্চ দিলে জানা যাবে বিস্তারিত)। এই ট্রেইটের মানুষ সাধারণত আর্ট-কালচারে বেশি ঝুঁকে থাকে, তাদের মধ্যে এক ধরনের শিল্পীসত্তা বসবাস করে।

তবে এই ট্রেইটের মানুষের দুর্বলতা হলো, এরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘procrastination’ বা দীর্ঘসূত্রীতা রোগে আক্রান্ত, যে কারণে তারা কিছুটা অলস প্রকৃতির হয়ে থাকে।

অন্যদিকে এপ্রিসিয়েশন আর রিকগনিশনের মোহ তাদের তুলনামূলক বেশি থাকে।

কেউ কি বলতে পারবেন জাতীয় দলে লিটন দাসের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা এমন কোনো ক্রিকেটার কেউ আছে কিনা। যেমন আশরাফুল আর মাশরাফি একসময় ঘনিষ্ঠ ছিল, মাশরাফির সাথে রাজ্জাক, রানা, সৈয়দ রাসেলের ঘনিষ্ঠতার খবরও জানা যায়। সাকিব আর তামিম নাকি একসময় একই ফ্ল্যাটে থাকতো, মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ ঘনিষ্ঠতার পরম্পরায় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সৌম্য, মোসাদ্দেক, মিরাজ, সাইফুদ্দিন, মমিনুল, আফিফ – প্রত্যেকেরই কেউ না কেউ ঘনিষ্ঠ সতীর্থ আছে। কিন্তু আমার অনুমান, লিটনের সেরকম কেউ নেই; তার সাথে সবারই ভালো সম্পর্ক, আবার কারো সাথেই বিশেষ বন্ডিং নেই।

সৌম্য, মুস্তাফিজ, সাকিব, মুশফিক এরা প্রত্যেকেই ইন্ট্রোভার্ট। লিটনের ইন্ট্রোভার্টনেস তাই বিশেষ্যতার দাবিদার হতে পারে না। তবু এ বিষয়ে লিখতে হচ্ছে, কারণ সে নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করে, সবার কথাই শোনে কিন্তু কারো কথাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না। তার হয়তোবা অন্য সার্কেলে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছে, যারা ক্রিকেট খেলে না, বা খেললেও টপ লেভেলে খেলার যোগ্য নয়। ফলে নিজের চাইতে কম যোগ্যতার বা ভিন্ন ট্র‍্যাকের মানুষের সাথে সে কমফোর্ট বোধ করে।

সে বিয়ে করেছে নিজের পছন্দে, বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফিরেছে দেরিতে বিয়ের উপলক্ষ্যেই। তার মধ্যে রোমান্টিকতায় ঘাটতি নেই। কিংবা বাংলাদেশে সম্ভবত সে-ই একমাত্র ক্রিকেটার যার হাতে উল্কি দেখা যায় মাঝেমধ্যে।

এগুলো চিরায়ত ইন্ট্রোভার্টদের বৈশিষ্ট্য নয়। সে মূলত সেলফ-অবসেসড মানুষ। তার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার নিলে জানা যেত, ঠিক কী কারণে সে লিটন দাসকে পছন্দ করেছিল। কেবলমাত্র অল্প বয়সে প্রচুর উপার্জনই নিশ্চয়ই নিয়ামক নয়, এর সঙ্গে লিটনের ব্যক্তিত্বের কোনো আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য প্রভাব রাখার কথা।

সেলফ-অবসেসড মানুষের প্রধান সমস্যা তাদের দেখার এবং ভাবনার জগত খুব বেশি প্রসারিত হয় না, তারা কিছুটায় কূপমণ্ডুকতায় আচ্ছন্ন থাকে৷

লিটন যখন থেকে ক্রিকেট শুরু করেছে, আমার ধারণা তখন থেকেই কোচরা তাকে বলেছে গিফটেড ব্যাটসম্যান, এটা তার মধ্যে ফ্যান্টাসি তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সে হয়তো গ্রাহ্যই করে না, এমনকি বিশ্বক্রিকেটের বড়ো ব্যাটসম্যানদের প্রতিও সে করুণা বোধ করেছে।

এরপর যখন ঢাকায় খেলতে এলো, যেহেতু সে অনেক রকম শট খেলতে পারে, তুলনামূলক সহজ বোলিং পেয়ে তার মধ্যে ফেইক কনফিডেন্স তৈরি হয়ে থাকতে পারে। যেভাবে চেয়েছে সেভাবেই শট খেলেছে। এতে সমসাময়িক দেশি ক্রিকেটারদের অনেকেই যেমন তার ভক্ত হয়েছে, অনুরূপভাবে অনেকে তাকে ঈর্ষাও করতে শুরু করেছে। এটা তার মধ্যে ইউনিকনেস ইলিউশন তৈরি করে থাকতে পারে। সে ভেবেছে আমি ইউনিক ব্যাটসম্যান, আমার মতো বাংলাদেশে কেউ নেই। দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া এপ্রিসিয়েশন তাকে এমনই এক ঘোরের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যে কোনো কোচ দেখলেই তার ব্যাটিং পছন্দ করবে এটা সে ধরে নিয়েছে।

ফলে খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার চাইতে ইমপ্রেস করাটাই তার অবচেতন মনের টার্গেট হয়ে উঠেছে। ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটেও সে এরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল হয়তো। ইন্টারন্যাশনালে তার প্রথম স্কোরিং শটই ছিল মিড উইকেট দিয়ে হাঁকানো চার অথবা ছক্কা।

কিন্তু, ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে তো সহজ বোলিং পাওয়া যাবে না। এটা তার ইগোকে আহত করেছে। বোলারের অনুসারে নিজেকে বদলাবো কেন, তাহলে তো আমি এভারেজ ব্যাটসম্যান হয়ে গেলাম, বরং আমার জন্য বোলার কৌশল বদলাতে বাধ্য হবে— মানসিকভাবে এই ঔদ্ধত্য দেখানোর জন্য নিজের যতটা ফ্লেক্সিবল হওয়া দরকার সেটা না হয়ে বোলারকে লীগের বোলারের কায়দায় খেলতে চায়। সঙ্গত কারণেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পারে না, এবং না পারার পর যখন দল থেকে বাদ পড়ার শংকা তৈরি হয় সেই চাপে সে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

আফগানিস্তানের মুজিবুর রহমানের বলে সে নিয়মিত আউট হয়। তবু সে তার ব্যাপারে সতর্ক না হয়ে তাকে চার্জ করতে যাবেই; মুজিবের মতো বোলারকে যদি চার বা ছক্কা মারতে না পারি কিসের লিটন দাস আমি— কিন্তু আউট হওয়ার রেকর্ডের কারণে নার্ভাসনেস কাজ করে।

যেহেতু টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডের ইনিংসগুলোই তাঁর কিছু ভক্ত জুটিয়েছে বা সে অ্যাপ্রিসিয়েশন পায়, তুলনায় টেস্টের ইনিংসগুলো নিয়ে সেভাবে কথা হয়নি, নিজের ফার্স্ট ক্লাস টেম্পারমেন্ট ভুলে সে টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডে ফরম্যাটকেই আপন ভেবে থাকতে পারে। যে কারণে তিন ফরম্যাটের মধ্যে টেস্টে তুলনামূলক ভালো শুরুর পরও সর্বশেষ দেড় বছরে টেস্টে সে বিবর্ণ এবং বোর্ড সভাপতি যখন বলেন – ‘লিটন দাস টেস্টের প্লেয়ার নয়’, সেকথাকে কাউন্টার দেয়ার শক্তি স্বয়ং লিটনেরও থাকে না, সে প্রয়োজনও বোধ করে না।

  • অ্যাপ্রিসিয়েশনের আগুন

যে কোনো মানুষেরই অ্যপ্রিসিয়েশন আর রিকগনিশন দরকার, নইলে তার মেন্টাল গ্রোথ স্থবির হয়ে পড়ে। কিন্তু এপ্রিসিয়েশন ম্যানেজমেন্ট স্কিল কার কীরকম তার ভিত্তিতেই কেউ সমুদ্র আর কেউ কুয়া হয়ে থাকে। আমি যখন প্রতিনিয়ত এপ্রিসিয়েশন প্রত্যাশা করবো, তখন প্রশিক্ষণের চাইতে পারফর্ম করাকেই গুরুত্ব বেশি দিবো, আমার ভিত্তি থাকবে নড়বড়ে। আমি যদি প্রতিনিয়ত নিজেকে নিয়ে রিসার্চ করি আমার প্রশিক্ষণ উন্নত হবে, পারফরম্যান্স কার্ভে বদল আসবে, এবং কিছুটা দেরিতে হলেও এপ্রিসিয়েশন, রিকগনিশন আসবে।

‘অমুক ব্যাটসম্যান লিটনের চাইতেও ট্যালেন্টেড’ – এরকম কথা হয়তো লিটন খুব বেশি শোনেনি। সৌম্য, মোসাদ্দেকরাও ট্যালেন্টেড তকমা পেয়েছে, কিন্তু কোনো কোচ হয়তো কখনো বলেনি লিটনের চাইতে সৌম্য অনেক বেশি ট্যালেন্টেড।

এতে যেটা হয়েছে লিটনের মধ্যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়নি। কিংবা উইকেটে থাকা অবস্থায় আরেক ব্যাটসম্যান তার চাইতে বেশি স্ট্রোক খেলছে, এর সাথে সে কিছুটা কম অভ্যস্ত। ফলে কোচ আর টিমমেটদের কাছ থেকে পাওয়া স্পেশাল ট্যালেন্ট ট্যাগ পেয়ে দলে থাকাটাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছে। ভিরাট কোহলি বা জস বাটলার কত বড়ো ব্যাটসম্যান সেটা নিয়ে সে হয়তো ভাবারই ফুসরত পায় না, কারণ তারা তো কেউ বাংলাদেশ দলে খেলতে আসবে না।

নাঈম শেখ বা অন্য কোনো ওপেনার যদি টানা দুটো ভালো ইনিংস খেলে লিটনকে একাদশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়, অথবা কোচ বলে নাঈমের ফ্লিক তো লিটনের চাইতেও সুন্দর – সেক্ষেত্রে লিটন হয়তো নিজের ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে আসবে।

লিটনকে ২-১ এই ফরমেশনে খেলানো উচিত৷ অর্থাৎ সিরিজের প্রথম ম্যাচ বাইরে থাকবে, পরের ২টায় সুযোগ পাবে। অথবা প্রথম দুই ম্যাচ খেলবে, তৃতীয়টায় বাইরে। লিটনকে আগামী তিন বছর কখনোই একটানা তিন ম্যাচের বেশি খেলানো উচিত হবে না। একমাত্র সেক্ষেত্রেই হয়তোবা একজন ম্যাচ উইনার লিটন দাসকে তৈরি করা যাবে।

যিদিও এটা রিয়েলিস্টিক এপ্রোচ নয়, কোচ বলবে বেশি বেশি নেট করলেই পারফরম্যান্স কনসিসটেন্ট হবে, আদতে সেল্ফ-অবসেসন থেকে বের না হওয়া অবধি লিটন এভাবেই খেলতে থাকবে।

১৫ বছরের মধ্যে মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে, সেখানে ২৭-২৮ বছরের পরিণত একজন এথলেটের ব্যক্তিত্ব বদলের কোনো সুযোগই আসলে নেই। বাদ দেয়া সমাধান নয়, বরং নারচারিংয়ের ক্ষেত্রে স্ট্র‍্যাটেজিক হলে লিটনের থেকে বিসিবি রেজাল্ট পাবে হয়তো।

  • উৎস

লিটন সম্ভবত অনেক বেশি ঘুমকাতর। প্র‍্যাকটিস না থাকলে সে আদৌ ১০ টার আগে ঘুম থেকে উঠে কিনা সন্দিহান আমি। সেলফ-অবসেশন কাটানোর জন্য লিটন প্রতিদিন ভোর ৫ টার আগে ঘুম থেকে উঠে দেড়ঘণ্টা রানিং করতে পারে, এবং রিকি পন্টিং অথবা সাঙ্গাকারার কাছ থেকে পেইড মেন্টরিং সার্ভিস নিতে পারে। মূলত ২ ঘণ্টার সেশন থাকবে; ক্রিকেটারের ব্রেইন কীভাবে কাজ করে এবং বিভিন্ন ম্যাচের অভিজ্ঞতা শুনবে। লিটনের যে পারসোনালিটি ট্রেইট, তাতে এই সার্ভিস নেয়ার চিন্তা তার মাথাতেই আসবে না, নিজেকে মনে হবে স্কুলক্রিকেটার; এটা তার ইগোকে আরো বেশি আহত করবে।

সুতরাং, লিটন দাস কি আদতেই প্রতিভাবান ক্রিকেটার?

আমার অনুসিদ্ধান্ত হলো, সে একজন কূপমন্ডুক ক্রিকেটার, প্রতিভার কিছু লক্ষণ তার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু লক্ষণের প্রেমেই এমন বিভোর হয়ে পড়েছিল যে ব্যাঙাচি থেকে আর কোলা ব্যাঙ হওয়া হলো না।

তবুও লিটন মাঝেসাঝে রান করবে, দুর্দান্ত কিছু শট খেলবে, এবং অফ ফর্মের অভিযোগে দল থেকে বাদ পড়ে আবার ফেরত আসবে।

আজ থেকে ১০ বছর পরে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের সময় একটা চ্যাপ্টার বিশেষভাবে পড়ানো হবে। ২০১৯ এ বসেই দেখতে চেষ্টা করছি ঝকঝকে অক্ষরে টাইপ করা সেই কোর্সের নাম – ‘লিটন দাস সিনড্রম’!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।