কমল ‘শক্তিমান’ হাসান

১২ আগস্ট ১৯৬০। মুক্তি পেল তামিল সিনেমা ‘কালাথুর কান্নাম্মা’। বক্স অফিসে সারা পাওয়ার সাথে সাথে সমালোচকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করলো সিনেমাটি। বাজিমাৎ করলেন ‘সেলভাম’ চরিত্রে অভিনয় করা মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সী এক শিশু শিল্পী।

ছবিতে সেই শিশু শিল্পী নাকি আজো দর্শকদের চোখের অশ্রু ঝরান। তিনি কে জানেন? বলিউড ও ভারতের দক্ষিণী সিনেমার সুপার স্টার কমল হাসান। তাঁর আসল নাম অবশ্য পার্থসারথী। সেই আধো আধো বোলের বয়সে থাকতেই নিজের অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। আর আজ তিনি ভারতীয় সিনেমার একজন মহিরূহ।

প্রথম ছবিতেই পান রাষ্ট্রপতির সোনার মেডেল। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হল না। ৫৮ বছরের ক্যারিয়ারে পাঁচটি জাতীয় পুরষ্কার, ১৯ টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, পদ্মভূষণ, অস্কারে ঠাঁই পাওয়া সাতটি সিনেমার শিল্পী – এত অর্জন যার তাকে নিয়ে তো নতুন করে আর কিছু বলার নেই। কিংবদন্তিতুল্য এই তারকার জন্ম ১৯৫৪ সালের সাত নভেম্বর।

মানে, মাত্র ছয় বছর বয়সেই বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক। ছবিটির শ্যুটিং যখন শুরু হয়, কমলের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। ওই বয়সেই কি চমৎকার অভিনয়টাই না করেছিলেন। শিশুশিল্পী হিসেবে তিনি করেন মোট পাঁচটা ছবি। সেখান থেকে শুরু করে তামিল আর হিন্দি তো বটেই, কমল অভিনয় করেছেন তেলেগু, মালায়ালাম, কান্নাড়া এমনকি বাংলা ছবিতেও।

মাদ্রাজের অভিজাত এক তামিল পরিবারে জন্ম কমলের। বাবা ডি. শ্রীনিবাসন ছিলেন আইনজীবী। বাড়ির ছোট ছেলে কমল। বড় দুই ভাই চারু হাসান ও চন্দ্র হাসানও বাবার মত আইনজীবী ছিলেন। তবে, অভিনয়-নাচ-গানে পরিবারের ঝোঁক ছিল।

চারু হাসান আশির দশকে তামিল সিনেমায় অভিনয় করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পান। বোন নলিনী ক্লাসিকাল নৃত্যশিল্পী ছিলেন। আর কমল সিনেমায় আসেন মূলত বাবার আগ্রহে। বাকিটা ইতিহাস!

হলিউড নির্মাতা ক্রিস্টোফর নোলানের সাথে

১৯৬৫ সাল অবধি শিশু শিল্পীর চরিত্রে দেখা যেত কমল হাসানকে। এরপর বিরতি দেন একটু। ১৯৭০ সাল থেকে শুরু করেন পুরোদমে। তবে, এই পথটা সহজ ছিল না।

প্রথমে ব্যাক গ্রাউন্ড ড্যান্সার, ছোটো খাটো চরিত্রে তার দেখা মিলতো। ১৯৭৪ সালে ‘কন্যাকুমারি’ সিনেমায় প্রথমবারের মত প্রধান চরিত্রে দেখা যায় তাকে। দক্ষিণী সিনেমায় নায়কের ভূমিকায় সেটাই তার শুরু। বলিউডে শুরু করেন আশির দশকে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় কমল হাসান অভিনিত প্রথম হিন্দি সিনেমা ‘এক দুজে কে লিয়ে’।

সর্বমোট ২০০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা অভিনেতা তিনি। আসলে শুধু অভিনয় নয়, অনেক কিছুই এক জীবনে করেছেন তিনি। স্ক্রিপ্ট লেখা, পরিচালনা কিংবা প্লে-ব্যাক – কোনো কিছুই তিনি বাদ দেননি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ‘উনারচিগাল’ নামের তামিল ছবির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন, যেটা ১৯৭৬ সালে মুক্তি পায়।

কমল হাসান দুই সন্তানের জনক। দুই মেয়ে – শ্রুতি হাসান ও অক্ষরা হাসান। শ্রুতি দক্ষিণী ইন্ড্রাস্ট্রির বড় নায়ক। চুটিয়ে কাজ করছেন বলিউডেও। অক্ষরার বলিউডে অভিষেক হয়ে গেছে ধানুশ ও অমিতাভ বচ্চনের সিনেমা ‘শামিতাভ’-এর মধ্য দিয়ে। তবে, চলচ্চিত্র পরিচালনাতেই তার বেশি আগ্রহ!

কমল হাসানের স্টারডম বোঝাতে একটা তথ্যই যথেষ্ট – তিনি হলেন প্রথম ভারতীয় অভিনেতা যিনি ছবিপ্রতি এক কোটি রুপি করে পারিশ্রমিক নিতেন। তার আগে ভারতীয় অভিনেতাদের মধ্যে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নিতেন রাজেশ খান্না কিংবা অমিতাভ বচ্চনরা।

তবে, কমল হাসানের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় চমক উপহার দিয়েছিলেন হলিউড পরিচালক কুয়েন্টিন টারান্টিনো। তিনি দাবী করেছিলেন তাঁর নির্মিত ‘কিল বিল’ ছবির অ্যানিমেশন দৃশ্যগুলো কমল হাসানের ‘অভয়’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানানো হয়েছে। ‘অভয়’ হল তামিল ছবি ‘আলাভান্ধান’-এর রিমেক। এখানেই শেষ নয়, এখন পর্যন্ত কমল হাসানের আটটা ছবি অস্কারের বিদেশি ভাষার সেরা ছবির ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে কমল হাসান জ্যাকি চ্যানের বিরাট ভক্ত। একবার একটা ছবিতে জ্যাকি চ্যানের ঝুঁকিপূর্ণ একটা স্টান্ট করতে গিয়েছিলেন। তাতে, ৩২  টি ফ্র্যাকচার নিয়ে কমলের ঠাঁই হয়েছিল হাসপাতালে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।