কল-রেডি: লাল সবুজের সাথে মিশে থাকা একটি নাম

ভারতবর্ষ ভাগ হবার এক বছরের মাথায় ১৯৪৮ সালে বিক্রমপুর নিবাসী স্বর্গীয় দয়াল ঘোষ ও স্বর্গীয় হরিপদ ঘোষ পুরনো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাইক ব্যবসা শুরু করেন। তখন পল্টন ময়দানে নিয়মিত সভা সমাবেশ হবার কারণে মাইকের চাহিদা ছিল অত্যন্ত বেশি।

হরিপদ ঘোষ ভেবে সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি মাইকের ব্যবসা করবেন। ছোট ভাইকে সে কথা জানালেন। এরপর দুই ভাই নয়টি মাইক, একটি গ্রামোফোন কিনে ব্যবসা শুরু করলেন। নামের ক্ষেত্রে দু’ভাইয়ের পরিচিত সেলিম চাচা পরামর্শ দিলেন, ‘আই অ্যাম অলওয়েজ রেডি অন কল অ্যাট ইওর সার্ভিস’ এই হলো ব্যবসার মূলমন্ত্র।

বাক্যটি সংক্ষিপ্ত করে তিনি ‘আরজা ইলেক্ট্রনিক্স’ নাম রাখার প্রস্তাব দিলেন। আরেকটু সহজ করলে শব্দটি দাঁড়ায় ‘আরজু’। এ নামেই যাত্রা শুরু করল প্রতিষ্ঠান। পরে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্রের পরামর্শে নাম পরিবর্তন করা হয়। নতুন নাম রাখা হয় ‘কল-রেডি’। অর্থাৎ যে কেউ যে কোন সময় ডাকলে তাদের প্রতিষ্ঠান মাইক নিয়ে প্রস্তুত থাকবে।

‘কল-রেডি’ জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত প্রতিটি আন্দোলনে। ৪৮’এর প্রথম ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শরীফ শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ‘৬৬’র ছয় দফা এবং ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থান হয়ে একাত্তরের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে আছে ‘কল-রেডি’ মাইক প্রতিষ্ঠানের নাম।

বাঙালির অধিকার অর্জনের লড়াইয়ে ‘কল-রেডি’ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা উজ্জ্বল ইতিহাস। কল-রেডি মাইক কোম্পানি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক নয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে বাকিতেও সেবা দিয়েছে। একাত্তরের ২৫ মার্চের পূর্বে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কল-রেডি বিনে পয়সায় সেবা দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে অংশীদার হয়েছে।

তবে ইতিহাসের পাতায় ‘কল-রেডি’ তাঁদের স্থায়ী আসন নিশ্চিত করেছে ৭ মার্চ ১৯৭১’এ। রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিতে মাইক্রোফোন ও মাইক সাউন্ড সিস্টেম প্রদান করে। কল-রেডির প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় দয়াল ঘোষের ভাই, স্বর্গীয় কানাই ঘোষ জানতেন এই সমাবেশে মাইক ভাড়া দেবার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে এবং ঢাকার অন্যান্য মাইক সরবরাহকারীরা বিভিন্ন হুমকির কারণে মাইক ভাড়া দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু, তরুণ কানাই ঘোষ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সকল হুমকি উপেক্ষা করে বাঙালি জাতির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সমাবেশে মাইক সরবরাহ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, সেদিন মঞ্চে নিজের হাতে মাইক্রোফোন স্থাপন করেছিলেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর নিঃশ্বাস স্পর্শ করেছিল যে মাইক্রোফোন, তাঁর হাত স্পর্শ করেছিল যে স্ট্যান্ড তা অতি যত্নে সংরক্ষন করে রেখেছিলেন স্বর্গীয় কানাই ঘোষ। জীবদ্দশায় তাঁর একটিই চাওয়া ছিল এসবকিছুই ঐতিহাসিক বস্তু হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে সংরক্ষন করা হবে। সেদিন যেসব অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল তার মধ্যে ৭টি অ্যামপ্লিফায়ার ও চারটি মাইক্রোফোন আমৃত্যু তিনি আগলে রেখেছিলেন যা আজও আছে।

পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসন ও বিএনপি-জামাত জোটের সকল অবহেলা সরিয়ে এখন প্রতি বছর ৭ মার্চ উদযাপিত হয় ব্যাপক উদ্দীপনার মাঝে। অপেক্ষায় থাকতেন কানাই ঘোষ, রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কোন সংস্থা বা ব্যক্তি হয়তো যোগাযোগ করবেন। তাঁর থেকে সংগ্রহ করে নেবে বুকের মাঝে আগলে রাখা জাতির জনকের স্পর্শধন্য মাইক্রোফোন, অ্যামপ্লিফায়ার ও মাইক্রোফোন স্ট্যান্ড। কিন্তু না, কেউ আসেনি, তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।

৩৬, ঋষিকেশ দাস লেন লক্ষ্মীবাজারের একই ঠিকানায় শুরু থেকে আজ অবধি প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান। ‘কল-রেডি’র নাম শোনেনি এমন কোন সচেতন মানুষ এ ভূখণ্ডে নেই বলেই বিশ্বাস করি আমরা। মূল প্রতিষ্ঠাতা ভাইদের একজন হরিপদ ঘোষ দেহত্যাগ করেছেন ২০০৪ সালে এবং কিছুদিন পূর্বে স্বর্গলাভ করেছেন ৭ মার্চের ভাষণের মাইক্রোফোন ও সাউন্ড ব্যবস্থাপক কানাই ঘোষ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেছেন ঘোষ পরিবারের সন্তান সাগর ঘোষ সাথে আছেন অপর ত্রিনাথ ঘোষ, বিশ্বনাথ ঘোষ ও শিব নাথ ঘোষ।

আমরা ইতিহাস সচেতন নই। আমাদের জাতিস্বত্বার সব গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা, দলিল, তথ্য-উপাত্ত স্বেচ্ছায় নষ্ট করে ফেলি এবং ধ্বংস হতে দেই। আগামী ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত বাঙালি জাতির মুক্তির ঘোষণা হিসেবে স্বীকৃত ভাষণের ৪৭ তম বার্ষিকী। গত হয়ে যাওয়া (প্রায়) পাঁচ দশকে আমাদের জাতীয় জাদুঘর, সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় অথবা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সহ সকল ‘সম্মানিত’ ও ‘মহা মাননীয়’দের কারও ভেতর ঐতিহাসিক ভাষণের সাথে যুক্ত সবকিছু সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ জেগে ওঠেনি।

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আজ এই প্রশ্ন করাটি হয়তো অমূলক নয়, ‘এহেন হাতি পুষিয়া আমরা কি করিবো?’

কৃতজ্ঞতা: গেরিলা ৭১

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।