‘সন্ন্যাসী রাজা’র ইতিহাস বিকৃতি ও খ্যাতনামা ভাওয়াল মামলা

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

‘সন্ন্যাসী রাজা’ সিরিয়ালটি উদ্ভট আজগুবি চিত্রনাট্যের। ঐতিহাসিক ঘটনা বিকৃত করছিল রোজ। ফলাফল, দর্শক সিরিয়ালটিকে ছুড়ে ফেলে। কমতে থাকে টিআরপি। কিন্তু ব্যাপার হল, বহু দর্শক আছেন যাদের বিশ্বাস আজকালকার সিরিয়ালে প্রদর্শিত ঘটনা গুলোই সত্যি।

ভাওয়াল রাজবাড়ী বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুরে। একটু ফিরে দেখা যাক প্রকৃত ইতিহাস। ভাওয়াল রাজবাড়ী বর্তমানে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।

ভাওয়াল রাজ্যের জমিদারি ছিল পূর্ববঙ্গের মধ্যে সবচাইতে বৃহৎ ও প্রাচীন। সতেরো শতকের শেষ দিকে এই রাজ্যে জমিদারি প্রথা শুরু হয়। ১৮৭৮ সালের দিকে এখানকার রাজপরিবার ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে রায় ও রাজা উপাধি লাভ করে।

মেজোকুমার বা রাজা রমেন্দ্রনারায়ন

সেসময় ভাওয়ালের রাজা ছিলেন কালীনারায়ণ। তার পরে জমিদারির দায়িত্ব পান তার একমাত্র পুত্র রাজেন্দ্রনারায়ণ। তিনিও খুব বেশিদিন জমিদারি ভোগ করতে পারেননি। তার মৃত্যুর পর তিন পুত্রকে জমিদারির বিভিন্ন অংশের দায়িত্ব বুঝিতে দেওয়া হয়। এই তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়জন, অর্থাৎ রমেন্দ্রনারায়ণকেই মূলত ভাওয়াল রাজা বলা হয়।

রাজা হিসেবে রমেন্দ্রনারায়ণ মন্দ ছিলেন না। প্রজাবৎসল ছিলেন। তবে, মদ আর নারীর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন তিনি। স্ত্রী বিভাবতী দেবী তাঁকে কাছে পেতেন না বললেই চলে। রাজার আবার শিকারের নেশা ছিল। জনশ্রুতি আছে, তাঁর নিশানা এতই ভাল ছিল যে এক গুলিতেই কুপোকাত হত বাঘ।

তবে, বাজে নেশার কারণে রাজার শরীরে বাজে রোগ বাসা বাধে। তিনি সিফিলিস রোগে আক্রান্ত হন। রাজ্যে সোরগোল পড়ে যায়। রাজা এই রোগের কারণে সন্তান দানে অক্ষম হয়ে পড়েন। পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন আশুতোষ দাসগুপ্ত। তার ওপরই চিকিৎসার দায়িত্ব পড়ে।

উত্তম কুমারের ‘সন্ন্যাসী রাজা’ও পুরোপুরি সঠিক গল্প নয়। কিন্তু লীনা দেবীর সিরিয়াল তার চেয়েও আজগুবি বিকৃত। রাজা রানী তে বিশাল প্রেম কিছু ছিলনা। রানী বিভাবতীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে আশু ডাক্তারের। রাজবাড়ির পাশেই এখনও আছে একটি বড় দিঘী সেখানে স্নান করতে যেতেন রানী বিভাবতী। আর ঠিক দিঘী পেরোলেই আশু ডাক্তারের ঘর। রানীও পরকীয়ায় জড়ান। আশুতোষের বাড়িটা এখন এক প্রোমোটার লিজে নিয়ে ভেঙে দিয়েছে ইতিহাস পাঁচিল তুলে দখল করেছে।

১৮ এপ্রিল, ১৯০৯ সালে ডাক্তারের পরামর্শে রাজাকে সস্ত্রীক দার্জিলিংয়ে পাঠানো হয়। সাথে অবশ্য চিকিৎসক, রাজার শ্যালক সত্যেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও রাজার আরও কিছু কাছের লোকও যান। কিন্তু রানী শ্যালক ও ডাক্তার ওষুধের নাম করে মেজোকুমারকে বিষ খাইয়ে দেন। মৃত বলে ঘোষনা করা হয় রাজাকে এবং রাজাকে শশ্মানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেদিন ছিল বর্ষণমূখর রাত। ডোমরা রাজাকে না দাহ করেই ফিরে আসে এত ঝড়বৃষ্টি হয়।

কথিত আছে, বৃষ্টির জলে রাজার বিষ ধুয়ে যায়। প্রাণ ফিরে পান। যদিও তিনি তা সুস্থ হওয়ার পরে জেনেছিলেন। সেই রাতে কিছু নাগসাধু শ্মশানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে একটি লোককে পড়ে থাকতে দেখে তাঁর গায়ে হাত দিয়ে তাঁরা দেখেন যে, লোকটি বেঁচে আছেন। তখন সাধুরা লোকটিকে সাথে করে নিয়ে যান তাদের আস্তানায়। সন্ন্যাসীদের সেবা শুশ্রূষায় রাজা সুস্থ হয়ে ওঠেন আর সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষা নেন।

রানী বিভাবতী দেবী

এদিকে রাজার স্মৃতিও লোপ পায়। ফলে রাজ্যের কথা বেমালুম ভুলে বসেন রাজা। এভাবে অনেক বছর কাটার পর যখন সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন রাজার ধীরে ধীরে মনে পড়তে থাকে হারানো অতীতের কথা; তার রাজ্যের কথা, প্রজাদের কথা। আর দেরি না করে তিনি ছুটে আসেন।

রাজার মৃত্যুর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে, তখন রাজ্যের দায়িত্ব পালন করছেন রাণী বিভাবতী দেবী। এর মধ্যে আশু ডাক্তার ও রানী বিভাবতী বিয়েও করেন। ১৯২০-২১ সালের দিকে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধের কাছে গেরুয়া পোশাক পরিহিত অত্যন্ত সুদর্শন এক জটাধারী সন্ন্যাসীর আগমন ঘটে। প্রজাদের সাহায্যে সন্ন্যাসী ভাওয়ালে এসে উপস্থিত হন।যদিও রানী বিভাবতী মেনে নেননা সন্ন্যাসীকে রাজা রূপে।

খবর শুনে রমেন্দ্রনারায়ণের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী সন্ন্যাসীকে নিজের প্রাসাদে আনতে লোক পাঠালেন। জ্যোতির্ময়ী দেবী খুব ভালোভাবে সন্ন্যাসীকে পরীক্ষা করলেন এবং ছোটবেলার অনেক ঘটনা জিজ্ঞেস করলেন। সন্ন্যাসীর উত্তরে জ্যোতির্ময়ী দেবী খুব অবাক হয়ে যান। কেননা তিনি এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, যা ছিল দুই ভাই-বোনের নিজেদের ছোটবেলার স্মৃতি সম্পর্কিত।

সন্নাসী রাজা

তবে সকলের মনে সন্ন্যাসীকে রাজা হিসেবে মেনে নেওয়ার পেছনে আরেকটা কারণ অবশ্য ছিল। রাজা যখন মারা যান, তখন তাকে পোড়ানোর জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ধ্যুম বৃষ্টি নামার ফলে ডোমরা শ্মশানে রাজাকে ফেলে রেখে চলে যায়। বৃষ্টি কমে এলে ডোমেরা শ্মশানে গিয়ে নাকি দেখে, সেখানে কোনো মৃতদেহ নেই। রাজার সাথে যারা দার্জিলিং গিয়েছিলেন, তাদের মুখেই এই ঘটনা সকলের শোনা ছিল। আর তখন থেকেই অনেকের মনে আশা ছিল যে, রাজা নিশ্চয় একদিন ফিরে আসবেন।

কিন্তু মেজোরানী কিছুতেই স্বীকার করেননা উনি তাঁর স্বামী। সম্পত্তিলোভী জাল সন্ন্যাসী আখ্যা দেন। এরপর রাজা প্রজাদের সাহায্যে রানীর বিরুদ্ধেই কেস করেন। এটাই ইতিহাসের বিখ্যাত ‘ভাওয়াল মামলা’ কিংবা ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা। সিরিয়ালে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। নামে পরিচিত।

সন্ন্যাসীকে বলা হয় এমন কিছু বলতে যা প্রমাণ তাঁকে রাজা বলে মানা যায়। সন্ন্যাসী বলেন ‘রানীর একবার বিশাল ফোঁড়া হওয়ায় উরুতে অপরাশেন করতে হয় সেই দাগ রানীর উরুতে আছে’ এবং তা সত্যি হয়। তবু রানী মানেন না সন্ন্যাসীকে। সব মামলার পর মামলায় রাজাই যেতেন। তবু উচ্চ আদালতে রানী মামলা করেন রাজার নামে।

 

একালের ভাওয়াল রাজবাড়ি

এখন কলকাতায় যা রিপন স্ট্রিট পুলিশ জাদুঘর সেটি ছিল ভাওয়াল রাজার সম্পত্তি অবিভক্ত বাংলায়। এই বাড়িতে বসেই রাজা মামলা শুরু করেন রানীর বিরুদ্ধে। পাঁচশো বত্রিশ পাতার রায়ে শেষমেষ রাজাই জেতেন সম্পত্তি ফিরে পান কিন্তু ততদিনে অত বছর পর রাজার মন উঠে যায় তিনি আবার সন্ন্যাসে ফিরে যান। কলকাতায় মেজোকুমারের মৃত্যু হয়।

১৯৯০ থেকে ২০০৮-০৯ অবধি সিরিয়াল যুগ ঠিকঠাক ছিল। এখন রদ্দি যুগ তাই এই অবস্থা। প্রতিটি ঐতিহাসিক সিরিয়াল মানুষকে ভুল বার্তা দিচ্ছে। ভালো তথ্য নির্ভর সিরিয়ালকে স্বাগত জানাই। আগে তো শিক্ষিত লোক এত ছিল না। সবাই নাটক সিনেমা দেখেই সাহিত্য ইতিহাস জানত। কিন্তু এখন মানুষ সচেতন। এই উদ্ভট ইতিহাস বিকৃত গল্পের সিরিয়ালকে যেন কেউ বিশ্বাস করে না বসে তাঁর এই সচেতনাটাই খুব জরুরী।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।