রজার ফেদেরার: শৈশব থেকে কৈশোর, অত:পর যৌবনের সহযাত্রী!

পেশাদার সার্কিটে ফেদেরারের অভিষেকের বছর, আর সেবার ছিলো বাবার হাত ছেড়ে আমার একা একা স্কুলে যাওয়া শেখা- সেটা ছিলো ১৯৯৮ সাল।

২০০৩ এ উইম্বলডনের সবুজ ঘাসে ঝাঁকড়া চুলের ফেড যখন মার্ক ফিলপুসিস কে হারিয়ে প্রথম গ্র‍্যান্ড স্ল্যাম জিতলেন, তখন আমি হাইস্কুলের মাঠে আর ক্লাসে দৌড়াচ্ছি, ক্রিকেটের প্রেমে পড়ার দিনগুলো হচ্ছিলো শুরু। টেনিস কোর্টে ফেদেরারের খেলা আর গ্যালারীতে মিরকা বারবিনেচের কিউট চেহারা, চোখে মায়া লেগে থাকা। তখনও ক্রিকেটের ভালোবাসায় কেউ ভাগ বসাতে পারেনি!

তখনকার সময়ে মারাত সাফিন, লেটন হিউয়েট কিংবা এন্ডি রডিক, এরা ছিলো টেনিসের জলজলে তারা,আর আন্দ্রে আগাসি ছিলো জীবন্ত কিংবদন্তী। ২০০৪ এ ইউএস ওপেন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতলেন, আর এন্ডি রডিককে উইম্বলডনে হারিয়ে ঘাসের কোর্টকে বানালেন মিরকা’র ঈর্ষার জিনিস, মিরকার পরে ঘাসের কোর্টকেই বেশী ভালোবেসেছেন কিনা!! ক্রিকেটের সাথে তুমুল কৈশোর প্রেম, কিংবা রানিয়েরির হাত থেকে চেলসির দায়িত্ব পাওয়া মরিনহোকে ভালোবাসার উত্তাল সময়গুলোতে টেনিসটাও শিখতে শুরু করলাম, ফেড এর ঝাঁকড়া চুল আর গ্যালারিতে বসা মিরকা’র মায়াভরা মুখ এর আকর্ষণে।

২০০৫, ততদিনে উদীয়মান ফেডকে সবাই ভাবলো ভবিষ্যতের কাণ্ডারী, সুইজারল্যান্ডের কিংবদন্তী হওয়ার পথে। প্রতিটা টুর্নামেন্টে ফেভারিট হয়ে নামছেন কিন্তু হারছেন, হচ্ছেনা, হচ্ছেনা তো হচ্ছেইনা, অবশেষে হলো, বছর শেষের ইউএস ওপেনের হার্ডকোর্টে ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর গ্র্যান্ডস্ল্যাম, ভুপাতিত করলেন কিংবদন্তী আন্দ্রে আগাসিকে। সেবার বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে টেস্ট সিরিজে হারালো প্রথমবারের মত, মরিনহোর অধীনে প্রথম বার্কলেস প্রিমিয়ার লীগ জিতলো চেলসি আর প্রথম স্কুলের বড় কোনো আপুকে ভালোলেগে গেলো, এখনকার জমানায় মনে হয় যেটাকে ক্রাশ বলে, সেই ২০০৫ এই, কখনো যাবেনা ভোলা।

সেই আপুকে না কিন্তু, সেই ২০০৫ সালটাকে!

বিটিভির চারকোণা বাকসোর সেই যুগে এসব খেলা সরাসরি দেখা হতোনা সবসময়, প্রথম আলোর খেলার পাতার কোনো এক কোণায় টেনিসের খবর থেকেই ফেদেরারকে ভালোবাসা, আর বিটিভির রাত আটটার খবরের শেষে খেলার সংবাদের শেষে ২/১ টা ভিডিও ক্লিপস। আশরাফুল, হাবিবুল, মাশরাফী ক্রিকেটের প্রেমে মজালো আর ফেড এক্সপ্রেস ফেললো টেনিসের প্রেমে, আর গ্যালারীর ওই মিরকা!

২০০৬সাল। ফেদেরারের রাজত্ব তখন সকাল দশ ঘটিকায়, আসলো রাফায়েল নাদাল নামক এই র‍্যাকেট উইজার্ড, টেনিসে এত জোরে কেউ সার্ভ করতে পারে, সেটা এর আগে এতটা বাস্তব ছিলোনা। সেই পেশীবহুল নাদালকে উইম্বলডনের ঘাসে ফ্রেঞ্চ ওপেন জেতার স্বপ্ন থেকে বাস্তবে নামিয়ে আনলেন। এরপর আরো আটটি গ্র্যান্ডস্ল্যাম ফাইনালে নাদালের মুখোমুখি হয়েছিলেন আজ অব্দি, আর জন্ম দিয়েছেন টেনিসের সবচেয়ে আকাংক্ষিত রূপকথার দ্বৈরথের, ‘ফেদেরার বনাম নাদাল’!

আস্তে আস্তে আমরা বিশ্বাস করা শুরু করলাম এই জিনিস তো এই গ্রহের না, অন্য গ্রহের, এভাবেও টেনিস খেলা যায় নাকি, যাহ!

সেবছরই ফাইনালে গিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হতে পারলোনা জিনেদিন জিদান, মাতেরাজ্জিকে ঢুশ মেরে পেলেন লাল কার্ড; সেবারই বাসায় ডিশ লাইন আসলো, ইএসপিএন, স্টার ক্রিকেট আর টেন স্পোর্টস পেয়ে স্কুলের পাঠ্যবই আর সমরেশ-মাসুদ রানা দুটোকেই ভুলে যাওয়া, ওদিকে চেলসিতে দ্রগবা নামের এক দৈত্যের আবির্ভাব হয়েছে নাকি সেটাও দেখতে শুরু করলাম।

এদিকে নাদালের মত আমাদের একজনও লম্বা চুল নিয়ে ক্রিকেট খেলতে নেমে গেলো, ওয়ার্নকে পিটিয়ে টেস্টে অজিদের বিপক্ষে করে বসলো সেঞ্চুরি – শাহরিয়ার নাফিস আহমেদ আবীর!

২০০৭ এও ফেদেরার করলেন ২০০৬ এর পুনরাবৃত্তি, প্রমাণ করে দিলেন টেনিসে তার মত কেউ আসবেনা। একটায় হারালেন নাদালকে, একটায় জোকারকে আর ফার্নান্দো গঞ্জালেস তার কাছে ফাইনালে হেরে টেনিস থেকেই হারিয়ে গেলো, শুধু গেরোটা খুললোনা নাদালের ফ্রেঞ্চ ওপেনের মাটির দূর্গে। সেবার আমি এসএসসির প্রিপারেশন নিচ্ছি, পড়ার চাপ প্রচুর, ওদিকে ভারতের বিপক্ষে তামিম ইকবাল নামে আমাদের এক তারার আবির্ভাব, জহির খানকে ডাউন দ্যা উইকেটে এসে বাউন্ডারি পার করা, একই সাথে সাকিব-মুশফিক নামক ভবিষ্যতের তারাগুলোর আকাশে স্থান পাওয়া। আমাদের মানজারুল রানাও পৃথিবী থেকে সেবারই বিদায় নেয় – ক্রিকেটটা তখন মনপ্রান ঘেরা বস্তু আর আত্মার শান্তি হলো টেনিস কিংবা এক কথায় ফেদেরার।

কয়েকটা বছর ধরে এমন হচ্ছিলো যে, ফ্রেঞ্চ ওপেনে নাদাল চ্যাম্পিয়ন আর উইম্বলডনে ফেদেরার। এটা অলিখিত নিয়ম হয়ে যাচ্ছিলো প্রায়।

তবে সেই ধারা ভেঙে গেলো ২০০৯ এ এসে, নাদাল পারলেন না ফাইনালে উঠতে, নাদালকে হারানো রবিন সোডারলিং কে হারিয়ে প্রথমবার লাল মাটির প্যারিস জয় করলেন কিং ফেদেরার! অনেকটা শাপমোচনের মত! তখন এইচএসসির ক্যালকুলাস আর ফিজিক্সে দুর্বল, তাই সেগুলোর উপর জোর দিয়ে ফাইনাল এক্সামের প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম, পরীক্ষার পর ঢাকা যাবো কোচিং করতে। টেনিস তখন বিচ্ছেদের বিরহে ঢেকে ছিলো পরীক্ষার কারণে! ওই কারণেই কিনা বছর শেষে ইউএস ওপেনে আর্জেন্টাইন ডেল পোত্রোর কাছে ইউএস ওপেনের শিরোপা খোয়ালেও গায়ে লাগেনি।

সেই ২০০৯ এই মিরকা বারবিনেচ হয়ে গেলেন মিরকা ফেদেরার, জমজ কন্যা আসলো কিং এর ঘরে, ভালোবাসা হয়ে গেলো কয়েক ভাগ, পিচ্চিগুলোও একেকটা কিউটের ডিব্বা!

এরই মাঝে আবির্ভাব নোভাক জোকোভিচ আর এন্ডি মারে, দের। ২০১০, ফেদেরার শেষ দেখে ফেলার একটা শুরু সেবার, শুধু অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালেই উঠলেন এবং মারেকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন। বাকী তিনটা টুর্নামেন্টের ফাইনালেই উঠতে পারলেন না, বয়স হয়ে গেছে অনেক, চলবেনা, কানাঘুঁষার শুরু। সেবারই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে চার গোল খেয়ে বিদায় নিলো, পেকারম্যানকে গালাগালি করলাম সবাই, কেন রিকয়েলমে কে উঠিয়ে নিলো আর মেসিকে শেষে নামালো, কি একটা অবস্থা, পুরাই ম্যসাকার। ম্যারাডোনা হলেন আর্জেন্টিনার কোচ আর আমার ভার্সিটি লাইফের শুরু সেবার!

টেনিস সার্কিটে তখন জোকোভিচ আর মারে’র উত্থান। নাদালও পড়তি ফর্মে, ফেদেরারকে তো খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিলোনা। ২০১৩ টা ভুলে থাকতে চাইবেন ফেড, চাইবো আমরা, যেমনটা মনে রাখবো ২০০৫ কে!

একটা টুর্নামেন্টের ফাইনালেও উঠতে পারলেন না ২০১৩ তে। আহ ফেড এক্সপ্রেস বন্ধ হয়ে যাবেকি?

২০১৪ তে আবারো যমজ সন্তান, এবার ছেলে। কিন্তু তারাও বাবার কোর্টের ভাগ্য বদলাতে পারলোনা! প্রিয় উইম্বলডনের ফাইনালে উঠেও তাই জোকারের কাছে হেরে গেলেন। আমার ভার্সিটি লাইফ শেষ, জয়েন করলাম ইন্টার্নীতে, টেনিসের স্মৃতি মাঝে মাঝে ধুসর হয়ে যেতো তখন।

২০১৩/১৪ কিংবা ১৫ তে কিছুই জিতলেন না, এদিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলো ইংলিশদেরকে হারিয়ে। পড়াশোনার পাঠ চুকালাম, চাকরীজীবনের স্বাদ নেয়া শুরু হলো। মাঝে আটজন কোচ চেঞ্জ করে চেলসি আবার কোচ হিসেবে ফিরিয়ে আনলো মরিনহোকে, কাজের কাজ কিছুই হলোনা, ফেদেরার এর রেজাল্টের খাতাও শূণ্য ওদিকে!

২০১৬ তে তো আবারো ফাইনাল ছাড়া বছর, কবে অবসর নেবেন, নিচ্ছেন না কেন, ইউরোপের ক্রীড়া ম্যাগাজিন গুলোর প্রায় হেডলাইনই এমন হচ্ছিলো! আর আমার জীবন পার হচ্ছিলো ক্রিকেট আর নয়টা-পাচটার চাকরি দিয়ে। ফেড-মিরকার সংসারে তখন নতুন ট্রফি নেই, দুইজোড় জমজ সন্তান দিয়ে ঘরসংসারী ফেদেরার।

এরপর ২০১৭, ফিনিক্স পানির মত ফিরে আসলেন দুই বন্ধু, ইতিহাসের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দ্বৈরথ যাদের, সেই ফেদেরার-নাদাল, সেই নাদাল, ২০১১ র পর যার আর কোনো গ্র্যান্ডস্ল্যামেরই ফাইনালে ওঠা হয়নি, জোকোভিচ যুগের মধ্যগগনে আবারো সেই ফেদেরার-নাদাল ফাইনাল। সেই ম্যাচ ছিলো টেনিস ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী টেলিভিশন দর্শক হওয়া ম্যাচের একটি। সেই ম্যাচ দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন কিংবদন্তী টেনিস গ্রেট বিলি জিন কিং, এলেক্স মরগান, মেসুত ওজিল, শচীন টেন্ডুলকার, ইয়ান থর্পের মত মহাতারকারা।

এবং সেই শিরোপা জিতলেন ফেড এক্সপ্রেস, সবচেয়ে প্রিয় এবং শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, আরেক কিংবদন্তী রাফায়েল নাদালকে হারিয়ে ফিরে আসলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা কামব্যাক এর উদাহরণ বানিয়ে, নিজের ১৮ (!) তম গ্র্যান্ডস্ল্যাম শিরোপা জিতে নিলেন। আর তার কদিন পরেই প্রিয় উইম্বলডন জিতে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া ম্যাগাজিনগুলোর হেডলাইন পালটে নিলেন!

এই লেখাটি যখন লিখছি, তার একদিন পর, নিজের ৩১ তম গ্র‍্যান্ডস্ল্যাম ফাইনাল খেলতে নামবেন, গতকালই হারালেন নিজের বন্ধু নাদালকে সেমিফাইনালে। ফাইনালে অপেক্ষা করছে তার হাত থেকে প্রজন্মের ব্যাটন নেয়া সেই নোভাক জোকোভিচ দ্যা জোকার

সেই ১৯৯৮ থেকে শুরু, এখন ২০১৯ ; এরমাঝে কত কিংবদন্তী এলো গেলো, কত প্রতিভা ফুল হয়ে ফুটতে পারলোনা, কত রথী এসে মহারথী হয়ে চলে গেলো, কিন্তু ফেদেরার এখনো আছেন সেই ফেড-এক্সপ্রেস হয়ে, আর এখনো গ্যালারীতে মিরকা’কে দেখা যায়, একটুকরো বয়সের ছাপ, কিন্তু কমেনি সেই মোহনতা।

কিছু খেলোয়াড়কে চিনি খেলা দিয়ে, আর কিছু খেলাকে চিনি খেলোয়াড়কে দিয়ে, ফেদেরার দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ। এই টেনিস না বোঝা আমাদেরকে একটু হলেও টেনিসটা শিখিয়ে দিয়েছেন রজার, ধন্যবাদ কিংবদন্তি!

ধ্রুপদি টেনিসের সর্বশেষ ব্যাক্তি, টেনিসের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়, আর সব ক্রিড়া মিলিয়েই সর্বকালের সেরা ক্রীড়াবিদের একজন, দ্যা ফেড এক্সপ্রেস। এভাবেই টেনে এনেছেন আমার শৈশব, রাঙিয়ে দিয়েছিলেন কৈশোর আর এখন – তার ৩৭ তম বসন্তে আমিও পড়াশোনার সব পাঠ চুকিয়ে চাকরি করছি, আর এখনও তার খেলা দেখে যাচ্ছি।

আমি ‘ফেদেরারের যুগে’ জন্মেছি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।
মাহবুব এলাহী

মাহবুব এলাহী

ভালবাসি ক্রিকেট। ভালবাসি বাংলাদেশ।