আইরিশম্যান, মার্টিন স্করসেজি ও গ্যাংস্টার দুনিয়া

প্রারম্ভিক দৃশ্য।

ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলা ‘ইন দ্য স্টিল অব দ্য নাইট’ দর্শকের মাঝে ধীরতা বইয়ে দিয়েছে। ক্যামেরা সেই ধীরতাকে নিজের মাঝে ধারণ করে দীর্ঘ ট্র‍্যাকিং শটে নার্সিং হোমের লম্বা সরু গলি ধরে চলছে, দর্শককে বগলদাবা করে। কখনো ডানে/বায়ে ঘুরছে, নার্সিং হোমের শান্ত পরিবেশ আর চলমান ব্যস্ততার সাথে দর্শককে পরিচয় করিয়ে দিতে। ফের এগিয়ে চলছে। একটা সময় থামলো এক বৃদ্ধের সামনে এসে।

ওই থামার মাঝেও জড়িয়ে আছে কমনীয়তা। হুইলচেয়ারে বসে আছে বৃদ্ধ। সারা শরীরে বার্ধক্য। বার্ধক্যের গ্লানি ঢাকতেই কি না চোখে চশমা পড়ে আছেন। মাথায় চুলের সংখ্যা কমেছে বয়সের সাথে সাথে। তবে বুড়োর গাম্ভীর্য বলে দিচ্ছে, মাথার চুলগুলো সাদা শুধু সময়ের সাথে হয়নি, অভিজ্ঞতার সাথে হয়েছে।

ব্যাকগ্রাউন্ডে চলমান ভয়েসওভার ন্যারেশানকে থামিয়ে বৃদ্ধ ফ্র‍্যাঙ্ক শির‍্যান কথা বলে উঠেন এবার, ক্যামেরার দিকে অপ্রতিভ চেয়ে, যেন ডকুমেন্টারির জন্য সাক্ষাতকার দিচ্ছেন। এই বৃদ্ধ ফ্র‍্যাঙ্ক শির‍্যানই সিনেমার শিরোনামের সেই ‘আইরিশম্যান’। পাপের কমতি নেই, তার গোটা জীবনটায়। সে-সুবিশাল গল্পই জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে স্বীকার করার মতো বলে যাচ্ছেন দর্শকদের।

৫০ দশকের কিছুটা এদিক/ওদিক সময় হতে ফ্র‍্যাঙ্ক তার গল্প বলে চলে। ফিলাডেলফিয়ায় মাংস সরবরাহকারী ট্রাক ড্রাইভার হিসেবে সে কাজ করতো। পাশাপাশি বাড়তি কিছু আয়ের জন্য পণ্য হাতবদল করতো ফিলাডেলফিয়া মাফিয়া পরিবারের এক গ্যাংস্টারের সাথে। এই হাতবদলের ঘটনা ফ্র‍্যাঙ্কের কোম্পানি জেনে গেলে অভিযোগ আনে তাঁর উপর, আদালতে যা নিষ্পত্তি হয় বিল বাফালিনো নামক এক ব্যক্তির বিচক্ষণতায়।

আদালতে ফ্র‍্যাঙ্ক তার মক্কেলের নাম প্রকাশ না করায়, ফ্র‍্যাঙ্কের আনুগত্যে মুগ্ধ হয়ে বিল বাফালিনো তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় পেনসিলভানিয়া মাফিয়া পরিবারের মাথা রাসেল বাফালিনোর সাথে। এবং ফ্র‍্যাঙ্কের উত্থান ঘটে মূলত রাসেলের সাথে পরিচিত হওয়ার পরই। মাংসের চালানের সাথে সাথে এখন দু-একটা মানুষ ও উপরে চালান করে ফ্র‍্যাঙ্ক, বাফালিনো মাফিয়া পরিবারের হয়ে। ভাড়াটে খুনি, যাকে বলে।

মাফিয়া পরিবার ভদ্রতা আর নমনীয়তা গায়ে জড়িয়ে রাখতে ‘ভাড়াটে খুনি’ বিশেষণটাকে নতুন ছাঁচ দিয়ে করে নিয়েছে ‘হাউজ পেইন্টার’। ঠিক সিনেমার শুরুতে ফ্র‍্যাঙ্ক যেমন বলে, ছোটবেলায় হাউজ পেইন্টার বলতে সে বুঝতো যারা হাউজ পেইন্ট বা ঘর রঙ করে। কিন্তু এখন!

রাসেল বাফালিনোর নির্দেশে, ফ্র‍্যাঙ্ক ঘরের দেয়াল রঙ করে নির্দিষ্ট টার্গেটের রক্তে। ক্রমেই রাসেলের বিশ্বাস আর ভক্তি জয় করে তাঁর ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে ফ্র‍্যাঙ্ক। যার ফলশ্রুতিতে, রাসেল তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় টিমস্টার ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট জিফি হফার সাথে। হফার দেহরক্ষী হিসেবে নতুন পরিচয় জুড়ে ফ্র‍্যাঙ্কের নামের পাশে। তবে হফার টিমস্টার ইউনিয়নে যোগদান করতে না চাওয়া ‘শিকাগো ক্যাব কোম্পানি’ উড়িয়ে দেওয়ার পর ফ্র‍্যাঙ্ক শুধু হফার দেহরক্ষীই নয়, বন্ধু হয়ে উঠে।

তার পরিবারের সাথেও ভাব জমে যায় হফার, বিশেষ করে মেয়ে পেগির সাথে। কিন্তু হফা জেলে যাওয়ার পর ফ্র‍্যাঙ্কের আনুগত্যে টানাপোড়ন দেখা যায়। জেলমুক্তির পর পুনরায় ইউনিয়নের কতৃত্ব নিতে হফার কর্মকান্ড অসন্তোষ জাগায় রাসেল আর তার উপরের বসদের মাঝে, যা ফ্র‍্যাঙ্ককে সংকটময় অবস্থানে দাঁড় করায় এবং কঠিন এক সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত করে।

বাস্তব চরিত্র ও ঘটনাবলীর নিরিখে রচিত চার্লস ব্র‍্যান্ডত্-এর ‘আই হার্ড ইউ পেইন্ট হাউজেস’ বইয়ের সিনেম্যাটিক সংযোজন দ্যা আইরিশম্যান। এবং ৭৭ বছর বয়সী মার্টিন স্করসেজি এই সিনেমা দিয়েই তাঁর ‘গ্যাংস্টার দুনিয়ায়’ আরো একবার ফিরে এলেন। হয়তোবা বিদায় জানানোর উদ্দেশ্যেই এই পদচিহ্ন রেখে যাওয়া।

তেমনটিই যদি হয়, তবে বলতে হয় – ‘বিদায়’ স্মরণীয় করে রাখার প্রতিটি উপায়ই তিনি অবলম্বন করেছেন এবং বিভিন্ন দৃশ্যে তার কালজয়ী সিনেমাগুলোর প্রতি হালকা ইঙ্গিত দিয়ে, ইন্টারটেক্সুয়াল রসবোধযুক্ত করলেন। যেমন- একটি দৃশ্যে, ফ্র‍্যাঙ্ক যখন শিকাগো ক্যাব কোম্পানির হলুদ রঙা ক্যাবগুলো উড়িয়ে দিতে ব্যস্ত, সেখানে হলুদ রঙা ক্যাবগুলো ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ সিনেমার কথা মনে করায়।

আবার মবস্টার জো গ্যালোর জন্মদিন উদযাপনের সেই দৃশ্য, যেখানে মঞ্চে কৌতুকশিল্পী ডন রিকলস পারফর্ম করছিল সেই ক্লাবটি ‘রেজিং বুল’-এর লোকেশন এবং সেই দৃশ্যে স্ট্যাডিক্যাম শটটি ‘গুডফেলাস’ সিনেমার বিখ্যাত সেই স্ট্যাডিক্যাম শটের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একজন মাফিয়ার উত্থান এবং পতনের গল্প, ইতিমধ্যে অজস্রবার দর্শক পর্দায় দেখেছে। এমনকি খোদ স্করসেজির সিনেমা’তেও। তবে ‘দ্য আইরিশম্যান’ তার গল্প কখনোই প্রথাগত ধারায় দর্শকদের বলে না। প্রথাগত সকল নিয়মকে এই সিনেমা মড়মড় শব্দে ভেঙেছে। কখনোবা ভুলিয়ে ভালিয়ে হাতে নিয়ে পলকে দৃষ্টিসীমার বাইরে নিক্ষেপ করেছে। এবং ফ্ল্যাশব্যাকের-ও ফ্ল্যাশব্যাক সন্নিবেশিত করে, প্রথাগত ন্যারেটিভকে ভেঙে, ফের গড়েছেন স্করসেজি। প্রারম্ভিক দৃশ্যের বৃদ্ধ ফ্র‍্যাঙ্কের গল্পবয়ান দর্শককে ফ্ল্যাশব্যাকে নিয়ে যায় রোড ট্রিপে, যেখানে ফ্র‍্যাঙ্ক ও রাসেল, তাদের দুই স্ত্রী’কে নিয়ে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন বলে যাচ্ছিলেন। এবং সেই ট্রিপ থেকে দর্শককে আবার ফ্ল্যাশব্যাকে নেওয়া হয়।

সেই ভ্রমণে গাড়ি চালাতে চালাতে মধ্যবয়সী ফ্র‍্যাঙ্ক রাসেলের সাথে প্রথম পরিচয় এবং এই দিনটির আগ পর্যন্ত সব ঘটনার স্মৃতিচারণ করছিলেন। স্করসেজি এই যাত্রা দিয়ে হয়তো মানবজীবনকে একটি যাত্রা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ হতে ‘ওয়াটার-গেট কেলেঙ্কারি’ পরবর্তী অস্থিরতা এবং তারো পর অব্দি আমেরিকার বিস্তৃত রাজনৈতিক ইতিহাস, যাতে জড়িয়ে আছে জন এফ. কেনেডির নির্বাচন; কিউবার মিসাইল সংকট; রবার্ট কেনেডির ‘হফা দমন’ মিশন; জে.এফ. কেনেডির হত্যাকান্ড; একজন গ্যাংস্টারের দৃষ্টিকোণ হতে বর্ণনা করেছে এই সিনেমা, যা সম্পূর্ণতা পেয়েছে বার্ধক্য, মৃত্যুর মতো নিগূঢ় বিষয়াদি দিয়ে।

ফ্র‍্যাঙ্ক শির‍্যানের ইতালিয়ান- আমেরিকান মাফিয়া’দের সাথে ৩ দশকের সম্পৃক্ততার অত্যুত্সাহী ক্রাইম-ড্রামা হতে বন্ধুত্ব, বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধবোধের গল্পে রূপান্তরের মাঝেই ‘দ্য আইরিশম্যানের’ প্রধান স্বকীয়তাবোধ লুকিয়ে আছে। নজর দেওয়ার মতো প্রচুর এবং সুবিশাল বিষয়াদি রয়েছে দ্য আইরিশম্যানে, তবে স্টিভেন জাইলিয়ানের চমৎকারিত্বে ভরা চিত্রনাট্য এবং ইতিহাস উদ্ব্যক্তিতে স্করসেজির সতর্ক দৃষ্টির ফলস্বরূপ, দর্শককে বিস্তীর্ণ ইতিহাস মাথায় নিয়ে বসতে হয় না।

বরং ভেতর থেকে এই সব চোখে দেখা একজন গ্যাংস্টারের দৃষ্টি আর বয়ান দিয়েই সবটা দেখা ও শোনা হয়। এবং জাইলিয়ানের চিত্রনাট্যে নীতিগত দ্বন্দ্বের বিষয়টি ফ্র‍্যাঙ্কের স্বীকারোক্তির অনুষঙ্গে আরো বেশি অনুনাদি হয়ে উঠে। মাফিয়া দুনিয়ার নিজস্ব, বলতে গেলে একেবারে ঘরোয়া সাংকেতিক শব্দ, গাম্ভীর্যতা, জটিলতার মাঝে জাইলিয়ান খানিকটা রসবোধ এনেছেন টারান্টিনো ধাঁচের সংলাপ দিয়ে। রাসেল এবং ফ্র‍্যাঙ্কের স্ত্রী’দ্বয়ের ধূমপান নিয়ে আলাপ, মিটিং এর জন্য যথাযথ পোশাক পড়া নিয়ে হফা ও টনি প্রো’র উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় কিংবা চাকি, তার বন্ধুকে কোন মাছ পৌঁছে দিয়েছে তা নিয়ে তর্কাতর্কিতে টারান্টিনো’র সিনেমার সংলাপ আর তাতে লুকিয়ে রাখা খটখটে রসবোধের কথাই মনে পড়ে।

সিনেমার মূল সংঘাত হফা আর মাফিয়াদের মধ্যে নয়, বরং ফ্র‍্যাঙ্ক শির‍্যান আর তাঁর ভেতরকার চেতনার মাঝে। অস্পষ্টতায় নিজেকে জড়িয়ে রাখা এই চরিত্রে রবার্ট ডি নিরো ইদানীংকালে তাঁর শ্রেষ্ঠ অভিনয় দিয়েছেন। ডিনারপার্টিতে রাসেল যখন ফ্র‍্যাঙ্ককে নির্মম পথটা বেছে নিতে বলে এবং হফাকে গুলি করার আগে ডেট্রয়েট পৌঁছানোর পর কয়েকবার গাড়ি ঘোরানোর মুহূর্তগুলোতেই ফ্র‍্যাঙ্ক চরিত্রের দ্বন্দ্ব ও দুর্বোধ্যতা স্পষ্ট করে তোলেন নিরো। এবং সিনেমার শেষ অংকে, ফ্র‍্যাঙ্ক চরিত্রের একাকীত্ব ও অসহায়ত্বের গভীরে দর্শককে নিয়ে যান এই অভিনেতা।

ফ্র‍্যাঙ্ক বীরযোদ্ধা নয়, যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে নিজের অপরাধকে বেমালুম চাপা দিয়ে, অন্য এক পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করেছে সে। বিশ্বযুদ্ধে তার সেই কর্মকান্ডই তার আবেগ আর নীতির বিচারকে অবশ করে দিয়েছে। সে খুন পছন্দ করে না, আবার ঘৃণাও করে না। ‘ভায়োলেন্স’ তার কাছে শুধুমাত্র একটা যন্ত্র। সবকিছু চুপচাপ আর ঠিকঠাক পরিচালনার একটা নিরেট অস্ত্র মাত্র ভায়োলেন্স।

তার দুর্বোধ্যতাই তার মাঝে দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। আর ফ্র‍্যাঙ্কের অন্তর্দ্বন্দ্বের সুরাহা করার ক্ষমতা একমাত্র রাখে তার মেয়ে পেগি। পেগিই তার বাবার সকল কর্মের বিচারক। পেগি কিছু বলে না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। ওই দৃষ্টির তেজ সহ্য করতে পারে না ফ্র‍্যাঙ্কের মতো গ্যাংস্টার-ও।

হফার সেই ঘটনার পর থেকে পেগি কথা বলা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে ফ্র‍্যাঙ্কের সাথে। পেগির চোখে চোখ পড়লেই ফ্র‍্যাঙ্ক তার পাপবোধ দ্বারা তাড়িত হয়। এবং এই পেগি চরিত্রে লুসি গ্যালিনা শক্তিশালী অভিনয়টা দিয়েছেন, সংলাপ না আওড়েই। নীরব থেকে শক্ত চোয়াল আর চোখের ওই শীতলতাতেই পেগি চরিত্রের ভেতরের ঘৃণা লুসি তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেছেন।

তবে জিফি হফা চরিত্রে অ্যাল পাচিনো সবকটা দৃষ্টি তার দিকে টেনে নিয়েছেন। হফা গৌরবিত, বিচক্ষণ এবং মেজাজি একটি চরিত্র। তবে মেজাজ তার উদারতাকে ছাড়িয়ে নয়। আর এই চরিত্রটির মতোই সুবিপুল, মহানুভবতার বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ পাচিনোর অভিনয়। স্করসেজি জানেন পাচিনোর আড়ম্বরতাকে কীভাবে চালনা করলে তার অভিনয়ের সর্বোচ্চটা বের হয়ে আসবে এবং তিনি তাই-ই করেছেন।

‘স্কারফেস’ সিনেমার টনি মন্টানা চরিত্রটির মতোই বিশাল হফা চরিত্রটি। কিন্তু হফা প্রতিমুহূর্তেই নিজস্ব জীবন এবং চিন্তাভাবনায় মত্ত, যার ঝিলিক দেখা যায় পাচিনো’র প্রশস্ত দৃষ্টিসীমার প্রগাঢ়তায়। সিনেমার সূক্ষ্মতম অভিনয়টা দিয়েছেন জো পেশি (রাসেল চরিত্রে)। রাসেলের হাত কতটুকু বিস্তৃত, কতটা ক্ষমতাবান এই রাসেল, তা জো পেশির গাম্ভীর্যেই আঁচ করা যায়। রাসেল চরিত্রের মারমুখো কর্মকান্ড আর চরিত্র রূপদানকারী জো পেশি’র ধীর, শান্ত অভিনয় সুন্দর সমতা তৈরি করেছে চরিত্রটিতে।

স্করসেজি আর তার ভিএফএক্স দলবৃন্দরা সময়কাল মাথায় রেখে চরিত্রদের বয়স কমানোয় প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে বেশ ধূর্ততার পরিচয় দিয়েছেন। এই বিষয়ে প্রায় নিখুঁত ব্যবহার করা হয়েছে প্রযুক্তির। বার্ধক্যে উত্তীর্ণ হওয়া এই চরিত্রগুলোর চলাফেরায় বয়সের ব্যাপারটি খানিক আঁচ করা গেলেও, তারা অভিনয়ে দর্শককে ধরে রেখে মনোযোগটাকে এদিক থেকে সরিয়ে নিয়েছেন সফলভাবে।

সিনেমায় সময় আর স্থানের মধ্যকার চিকন দড়িতে ভারসাম্য হারানোর ঝুঁকি অনুভূত হয় না থেলমা শুনমেকারের বুদ্দিদীপ্ত সম্পাদনায়। গল্প কোন দশকে বা সময়ে চলছে তা সম্পর্কে দর্শককে ওয়াকিবহাল রাখতে সেসব দশকের সিগনিফায়ার ব্যবহার করেছেন তিনি।

পরিচালক স্করসেজি; ক্যামেরার ধীর চলনে সেলুনে চলমান হত্যাকান্ড থেকে সরে এসে এক পুষ্পবিক্রেতার জানালায় স্থির হওয়া এবং অফ স্ক্রিনে মারপিটের শব্দ ভেসে আসার দৃশ্য থেকে, এক মাফিয়াকে হত্যা করার জন্য ফ্র‍্যাঙ্কের নির্দিষ্ট অস্ত্র বেছে নেওয়ার দৃশ্যর মতো একের পর এক বিস্ময়ে দম নিতে ভুলে যাওয়ার মতো দৃশ্যে আঁটকে রেখেছেন দর্শককে।

এমনকি, স্করসেজি তাঁর পছন্দনীয় ডলি শটের ব্যবহার করে এবং অন স্ক্রিন গ্রাফিক দিয়ে সিনেমায় নতুন কোন চরিত্র পদার্পণ করলে, তার শেষ পরিণতি দর্শকের কাছে বর্ণনা করেন, যথেষ্ট রসবোধ রেখে। পরিচালনা ও সম্পাদনায় প্রতিটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের মৌলিক অংশ’টা ধরে গোটা প্রক্রিয়ার সুসংবদ্ধ উপস্থাপনে মাস্টারি দেখিয়েছেন স্করসেজি এবং থেলমা। সঙ্গীতের প্রতি স্করসেজির ভালোবাসা, শ্রদ্ধার কথা তো প্রচলিতই। তাই স্বাভাবিকভাবেই সিনেমার আবহসঙ্গীত নির্বাচনে সময়কাল খেয়ালে রেখে শ্রুতিমধুর সব সঙ্গীতের সংযোজন করা হয়েছে। জ্যাজ, ব্লুজ, আবার ৭০/৮০ দশকের পপ সঙ্গীতের নিখুঁত সংমিশ্রণ সিনেমায় খুঁজে পাওয়া যায়।

দ্যা আইরিশম্যান গ্যাংস্টার’ধর্মী সিনেমা সেটা সত্য, তবে তা এই অর্থেই শুধুমাত্র সত্য যে, এই সিনেমা গ্যাংস্টারদের নিয়ে। কিন্তু একজন ফ্র‍্যাঙ্ক শির‍্যান হওয়ার বেদনা, অনুতাপবোধ, জীবনের শেষ দিনগুলো প্রিয়জনের স্পর্শ বিনে কাটানোর ভয়াবহতাই দ্যা আইরিশম্যানের অখণ্ডনীয় সত্য।

অপরাধ জগতের অংশ ছেড়ে সিনেমার শেষ অংকের এই বার্ধক্যের অভিশাপ আর নিষ্ঠুর একাকীত্বর গল্প প্যাচপেচে নয়, বরং বর্ণিত হতে থাকা গল্পের এমন একটি অংশ, যেটি ছাড়া এই গল্পের পূর্ণতাপ্রাপ্তি হয় না। একজন প্রবীণ পরিচালক যখন, একটি গোটা জীবনের চিত্র তার সিনেমায় আঁকতে যাচ্ছেন, হোক না সে-জীবন পাপে ভর দিয়ে কাটানো, এই অংশ বিনে সেই চিত্র সম্পূর্ণ হতে পারে না। পতন শুধুমাত্র ইতি টানবার একটি উপকরণ নয়, গোটা প্রক্রিয়ার মূল সারমর্ম।

তাই তো, ‘হফা অধ্যায়ের’ ২৮ বছর পর নার্সিং হোমের সেই শীতল, বিষণ্ণ রাতে হালকা করে খোলা রাখা দরজার ফাঁকে ভেসে আসা প্রতিধ্বনি ২৮ বছর আগে কোন এক হোটেলের কামরায় রাত্রিযাপন করা বিশ্বস্ত সেই দেহরক্ষী আর তার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিটির কথা মনে করায়। সেই রাতে ফাঁক করে রাখা দরজার ওপাশে রক্ষাকারী ব্যক্তিটি ছিল। আজ সেই ব্যক্তি কী তবে ওপাশটায় ঈশ্বর বসে তাকে রক্ষা করবেন তেমন ভাবছেন নাকি এ শুধুমাত্রই বৃদ্ধ বয়সের স্বভাবসুলভ আচরণ, নাকি পছন্দের কফিনটি কিনে অপেক্ষা করছেন দরজায় কখন মৃত্যুর নিঃশব্দ টোকা পড়বে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।