‘মার যত্ন করে আমার স্বর্ণপদকটা মুছে রাখাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য’

অর্থই সকল অনর্থের মূল। আবার অর্থ মানুষের জীবনে বড় একটি অনুঘটক। মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন অর্থ। আবার কখনো কখনো অর্থ ছাড়াও একজন মানুষ সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে পারেন। হতে পারেন সমাজের রোল মডেল। এ জন্য প্রয়োজন একাগ্রতা, ইচ্ছা, উদ্যম এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য। আর্থিক সংকট এবং পারিপার্শ্বিক নানাবিধ সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র উদ্যম, ইচ্ছা এবং লক্ষ্য ঠিক থাকলে যে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া পাওয়া যায় তারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ মুন্সিগঞ্জের প্রিয়তা।

ছোট বেলা থেকেই নানাবিধ সমস্যার মধ্যে বড় হওয়া প্রিয়তার পড়াশোনা আর স্কুল একদম ভালো লাগতো না। স্কুলের পুরো সময়ই সে কাঁদত। ঢাকায় জন্ম হলেও প্রিয়তার শৈশব কেটেছে গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। একান্নবর্তী পরিবারে বড় হওয়া প্রিয়তা সবার আদরের। যে প্রিয়তা পড়তেই চাইতো না, কে জানতো বড় হয়ে সেই পড়াশোনার জন্য স্বর্ণপদক পাবে!

প্রিয়তা, রুবাইয়া জাবিনের ডাকনাম। পড়াশোনা নয়, ছোটবেলা থেকে তার ঝোঁক ছিল নাচের প্রতি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাংলাদেশ শিশু একাডেমী, থিয়েটার সার্কেল, জাগরণ খেলাঘর আসর, শিল্পকলা একাডেমির সদস্য হয়েছিলেন। থানা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে নাচ, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয়ে নিয়মিত পুরস্কার পেয়েছেন। মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পীর স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।

কিন্তু সুন্দর এই সময়টা থমকে যায় বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে। পারিবারিক কারণে নিজের প্রিয় শৈশব, কৈশোরের স্মৃতি ছেড়ে মাকে নিয়ে তাকে বড় বোনের কাছে চলে আসতে হয়। নতুন জায়গায় নতুনভাবে জীবন শুরু করাটা খুব একটা আনন্দের ছিল না। প্রতিদিন ভালো থাকার জন্য কষ্ট করতে হয়েছে। অভাবের কারণে একসময় স্কুলে যাওয়াও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সপ্তম শ্রেণির বই নিয়ে বাসায় বসে পড়তেন। ভাবতে পারেননি আর কখনো স্কুলে যেতে পারবেন। কিন্তু পরিবারের লোকজন অনেক কষ্ট করে তাঁকে আবার স্কুলে ভর্তি করায়।

ভালো নম্বর থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারেননি শুধু পড়ার ব্যয়ভার বহন করতে পারবেন না বলে। মানবিক বিভাগে পড়েও বিন্দুমাত্র দুঃখ বা আফসোস নেই প্রিয়তার। আনন্দ নিয়ে পড়েছেন। পেট ভরে ভাত খেতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছেন।

পড়াশোনায় মন দিয়েই নিজের ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ২০০৮ সালে সাভার রেডিও কলোনি মডেল স্কুল থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ এবং সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করেন। বোর্ডের বই ছাড়া আর কোনো বই তাঁর ছিল না। বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়তেন। এ সব বিষয় খেয়াল করে স্কুলের শিক্ষকেরা তাঁকে পড়াশোনার জন্য নানাভাবে সাহায্য করতেন।

২০১০ সালে সাভার মডেল কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৮০ পান। কলেজে সব সময় প্রথম হওয়া প্রিয়তার এই ফলাফল নিজেরই ভালো লাগেনি। তারপরও হাল ছাড়েনি। দূরে কোথাও পড়ালেখার খরচ চালাতে পারবো না বলে ঢাকার মধ্যে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাতাসেই বোধ হয় একটু বুক ভরে শ্বাস নেয়ার সুযোগ হলো। ২০১৫ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ১০০ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভারত সফর করেছেন, ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করেছেন। স্নাতকে ‘কলা ও মানবিক’ অনুষদে চার বছর প্রথম স্থান অর্জন করে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৫’ পেয়েছেন। সেই স্বর্ণপদক প্রাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য দেয়ার জন্য নির্বাচিত হন তিনি। অনুষদে পরপর চার বছরই লিখিত পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ২০১৫ সালে তাকে মেধাবৃত্তি প্রদান করে। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পূরক বৃত্তিও পান। স্নাতকে চার বছরই প্রথম হওয়ায় বিভাগ থেকেও তিনি বৃত্তি পেয়েছেন।

পেছনের কথা বলতে গেলে এখন প্রিয়তার গলা ধরে আসে। তিনি জানান, এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ নিজেই চালিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পাঠ্যবই কেনার মতো টাকা ছিল না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে বসে থাকতেন। লাইব্রেরিতে বসে থাকতে থাকতেই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতার বইয়ের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়েছে।

বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে পারেননি, পড়েছেন নাটক ও নাট্যকলা বিভাগে। অনেকে কটু কথা বলেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন তার মেধা নিয়ে। প্রিয়তা বলেন, ‘তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাদের ওই কথাগুলো আমাকে প্রতিদিন প্রেরণা দিত। আমি দেখিয়ে দিতে চেয়েছি, এই বিভাগ থেকেও ভালো ফল করা যায়।’

নিজের সব সুখ পরিবারের মানুষগুলোর হাসিমুখের মাঝে লুকিয়ে আছে উল্লেখ করে প্রিয়তা বলছিলেন, ‘মার যত্ন করে আমার স্বর্ণপদকটা মুছে রাখাই আমার সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য।’

গবেষণা আর পড়ালেখার সঙ্গেই থাকতে চান তিনি। বিভাগের একাডেমিক প্রযোজনাগুলোতে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়মিত মঞ্চ নাটক করেন। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কমর্রত আছেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।