আত্মহননের পথ ছেড়ে বিত্তের চূড়ায়

৯০ দশকের লন্ডন। সময়টা এক শরতের সন্ধ্যেবেলা। টেমস নদীর ধারে আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই বসে আছেন এক বছর তিরিশের নারী। বিগবেনে ঘড়ির কাঁটা সোয়া পাঁচটা ছুঁয়েছে। হঠাৎ টেমসের জলে কেউ ঝাঁপ দিলো।

গার্ড সঙ্গে সঙ্গে হুইশল বাজালেন। জলরক্ষী বাহিনীর বোট ততক্ষণে উদ্ধার কাজে নেমে পড়েছে। উৎসাহীরা ভিড় জমিয়েছেন। কে ঝাঁপ দিলো তখনও কেউ বুঝে উঠতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকারীরা যাকে তুলে আনলেন, সেই বছর তিরিশের নারী একটু আগেই বসে ছিলেন টেমসের তীরে।

তাঁর জ্ঞান ছিল না। বাধ্য হয়েই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। যখন তার জ্ঞান ফিরল ডাক্তার বললেন, আপনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করলেন কেনো ? কী এমন হয়েছে আপনার ?

 

নির্বীকার সেই নারী বললেন, ‘আমার নাম জোয়ানি, আমি বাড়ি যাবো।’ ডাক্তার বুঝলেন উনি ‘অ্যাকিউট ডিপ্রেশনে’ ভুগছেন। ডাক্তার জোয়ানিকে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিতে বললেন।

এর মাঝে অনেকদিন কেটে গেছে। জোয়ানির স্বামী তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন। তাঁর একটি সন্তানও আছে। জোয়ানির বাবার অমতে বিয়ে হওয়ায় জোয়ানির পৈতৃক বাড়িতেও ঠাঁই হলো না তাঁর। অর্থনৈতিক অবস্থা এমন শোচনীয় যে খাবারটুকু জোটাবার সামর্থ্যও ছিলো না জোয়ানির।

অগত‍্যা বাধ্য হলেন সন্তানকে সরকারি হোমের আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিতে। আরো একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন তিনি। কিন্তু বন্ধুরা ঠিক সময় এসে পড়ায় সে যাত্রায়ও বেঁচে যান।

 

পেট চালাবার তাগিদে ক্যাফেতে কাজ নেন। কিন্তু তাতেও দেনার টাকা শোধ করা যাচ্ছিল না। এমনিই একদিন ম্যাঞ্চেস্টার থেকে লন্ডনে যাবার ট্রেনে চেপে বসলেন। যাত্রাপথে এক বিস্ময় বালককে নিয়ে একটা গল্পের প্লট হঠাৎই মাথায় এলো জোয়ানির। হাতের কাছে কিছু না থাকায় টিস্যু পেপারের ওপরেই লিখে ফেললেন গল্পটি।

লন্ডনে পৌঁছে আবার ক্যাফেতে কাজ শুরু করলেন যথারীতি। একদিন অপরাহ্নের বিরতিতে তার বন্ধু রবার্ট ঐ টিস্যু পেপারগুলি আবিষ্কার করলেন এবং আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ লেখা কি তোমার জোয়ানি? নির্বিকার জোয়ানি শুধু ঘাড় নাড়লেন। রবার্ট বললেন, এক্ষুনি তার উচিত কোনো প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করা। কী মনে করলেন জানা নেই, তবে সেদিন কাজ সেরে এক প্রকাশকের কাছে তিনি ঐ পেপারগুলি দিয়ে এলেন।

এক সপ্তাহ পর সেই ক্যাফের ম্যানেজারের কাছে জোয়ানির জন্য একটা ফোন এলো। ফোনের ওপারে ছিলেন ‘ব্লুমস্ বিউরি’ প্রকাশনা সংস্থার প্রধান সম্পাদক বেরি ক্যানিংহাম। উনি জোয়ানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি ঐ আশ্চর্য বালকের কাহিনীকে আরো বিস্তৃত আকারে লিখতে পারবেন কি ?

জোয়ানি বললেন, হ্যাঁ পারব। কিন্তু আমার তো উপার্জন বন্ধ হয়ে যাবে তাহলে। বেরি বললেন, আপনাকে আমরা দৈনিক পারিশ্রমিক দেব। দয়া করে আপনি লিখুন। ক্যাফে ছাড়লেন জোয়ানি, মন দিলেন লেখায়। প্রকাশিত হলো জোয়ানির প্রথম বই। বাকিটা ইতিহাস। বিশ্ব জুড়ে চল্লিশ কোটি বই বিক্রি হয়ে গেলো কয়েক দিনের মধ‍্যেই। লেখিকা জোয়ানি হয়ে গেলেন ৫৬০ কোটি ইউরোর মালিক।

হ‍্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছেন। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছিলো জগত বিখ্যাত ‘হ্যারি পটার’ সিরিজের, আর জোয়ানি… আর কেউ নন, স্বয়ং জে.কে রাউলিং। এমন অনুপ্রেরণাদায়কগ গল্প তো আর রোজ রোজ শোনা যায় না!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।