যে কারণে জরুরী নেইমারের উপস্থিতি

শেষ দুই ম্যাচের পর্যালোচনায় কেউ কি নেইমারের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সাথে ২০১০ সালের কাকার কোনো  মিল খুঁজে পেয়েছেন? ওই বিশ্বকাপেও কাকা ইনজুরি থেকে এসে খেলতে নামেন। সাধারণ ট্যাকেলে পড়ে যাচ্ছিলেন। বল পায়ে আত্মবিশ্বাসের  অভাব ছিল। যদিও আস্তে আস্তে সেটা কাটিয়ে উঠলেও বিশ্বকাপে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি।

ইনজুরি থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপ খেলা আসলেই কঠিন অনেক। বিশ্বকাপে মনে হয় ক্লাব ফুটবলের চেয়েও বেশি শারীরিক সক্ষমতা, অনেক বেশি একাগ্রতার দরকার। মাত্র তিন ম্যাচের খেলা – তাই সব দলই জান প্রাণ দিয়ে খেলে এখানে। তাই সদ্য অস্ত্রোপচার থেকে সুস্থ হয়ে একজন মানুষের জন্য এত দ্রুত পরিপার্শ্বিক প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নিতে একটু হলেও সময় লাগে।

দু’দিন আগে যেখানে প্রচন্ড ব্যাথা ছিল সেখানে ৯০ মিনিট চূড়ান্ত শারীরিক আক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে পুরো ‍উদ্যোমে খেলতে একটু সাহস এবং ভারসাম্যের প্রয়োজন আছে। সেটা চিন্তা করলে নেইমারের এরকম সচরাচরের চেয়ে ‘লেস ডাইনামিক অ্যাপ্রোচ’ একেবারে অপ্রত্যাশিত না।

এটা ঠিক যে নেইমারের ডাইভ কিংবা অভিনয় করে ফ্রি-কিক আদায়ের ভাল অভ্যাস আছে। সেটা কিন্তু, আন্তর্জাতিক ও ক্লাব ফুটবলে কম বেশি সব ফরোয়ার্ডেরই আছে। আবার একই সাথে একজন নেইমার দুর্দান্ত ড্রিবলার এবং স্কোরার।

অল্পতেই ভারসাম্য হারানো নেইমারের সদ্য ইনজুরি কাটিয়ে ফেরার প্রভাবেও হতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচের পর তো তিনি সেই অর্থে প্রতিযোগীতামূলক ম্যাচই খেলেননি। বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতিমূলক প্রীতি ম্যাচেও তো এমন প্রতিযোগীতার আমেজ থাকে না।

তবে আশার কথা হচ্ছে সর্বশেষ কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচে নেইমার তুলনামূলক ভাল খেলেছেন। এবং কাকার তুলনায় বয়স তাঁর পক্ষেই আছে।

নেইমারের এই অবস্থায় তিনি মৌসুমী সমর্থকদের রোষের মুখে পড়ছেন। কৌতিনহোর সাথে অর্থহীন ও উদ্ভট তুলনাও হচ্ছে বিস্তর। এটা মূলত নেইমার সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে হচ্ছে। এটা নিশ্চিত থাকা উচিত এই দলে নেইমার না থাকলে মানসিক ভাবে পুরা দলের শক্তি অর্ধেক কমে যাবে।

নেইমার আর কৌতিনহো এক সাথে থাকাতে দ ‘জনে চাপ ভাগাভাগি করে নিতে পারছে। দলের সেরা খেলোয়াড় হওয়াতে নেইমারের ওপর চাপের ভাগটা বেশি। এবং ব্রাজিলের বেশিরভাগ আক্রমনই মার্সেলো হয়ে নেইমারের পা থেকেই শুরু হয়, ফলস্বরুপ নেইমারের ভুল্গুলো চোখে পড়ে বেশি।

এদিকে কৌতিনহোর উপর নেইমারের মতো প্রত্যাশার চাপ না থাকার কারণে সে তার স্বাভাবিক খেলাটা খেলে যাচ্ছেন সহজেই। এই অবস্থায় হঠাৎ করে খেলা দেখতে বসলে মনে হতে পারে – আরে কৌতিনহোতো নেইমারের চেয়ে ভাল খেলে। ভাবনাটা অযৌক্তিক না, কিন্তু অগভীর।

একটা উদাহারণ দিলে আরেকটু পরিষ্কার হবে। ২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন রিভালদো। রোনালদো আট গোল দিলেও তাঁর স্বাভাবিক নান্দনিক ফুটবল থেকে অনেক দূরে ছিলেন। ওই বিশ্বকাপটা রোনালদো না থাকলে আমরা রিভালদোর সেরাটা পেতাম না, ইনফ্যাক্ট রিভালদোর ব্রাজিলের মতো বড় দলকে পুরো টুর্নামেন্ট টানার মতো লেভেলটা ছিলনা বলেই আমি বিশ্বাস করি।

রোনালদো দলে থাকাতে পুরো ফোকাসটা যখন রোনালদোর উপর চলে যায়। তখন রিভালদো আর সেকালের তরুণ রোনালদিনহো নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে থাকেন। যারা রোনালদোর সত্যিকার খেলা কখনো দেখে নি, শুধুমাত্র বিশ্বকাপের পারফর্মেন্সের উপর ভিত্তি করে তাঁকে বিচার করে তাদের এখনো বলতে শুনি ‘রোনালদো শুধু ডিবক্সের আশেপাশে ঘুরতো, তবে গোল মিস করতো না।’

প্রায় দু’বছর ইনজুরির সাথে যুদ্ধ করে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া রোনালদো বেস্ট ফিজিক্যাল অ্যাট্রিবিউট হারানোর ফলে শুধু স্ট্রাইকার রোল প্লে করা আর আট গোল করার মৌসুমী সমর্থকদের কাছে তিনি কেবল ‘ডি-বক্সের সুযোগ সন্ধানী স্ট্রাইকার’। আর্জেন্টিনার বাতিস্তুতাকেও অনেকে এভাবে দেখে।

মোদ্দা কথা হল, নেইমার বাদে এই ব্রাজিল আলোহীন। হ্যাঁ, অনেকগুলোই তারকা আছেন দলে কিন্তু সেই তারাগুলোর আলোকিত হওয়ার জন্য হলেও নেইমারের উপস্থিতি দলের জন্য অপরিহার্য। নেইমার থাকা মানে ওকে ঘিরে প্রতিপক্ষের আলাদা গেমপ্ল্যান সাজানো, ম্যান মার্কিং। যেটা কার্যকর করতে গিয়ে যুগে যুগে রিভালদো, বেবেতো, জার্জিনহোরা নিরবে নিজেদের কাজটা করে গেছে।

এরই সুবাদে ব্রাজিলের জার্সিতে পাঁচটা তারকা চিহ্নের স্থান করে দিয়েছে। ব্রাজিল কখনো একটা খেলোয়াড়ের উপর নির্ভর হয়ে বিশ্বকাপ জেতেনি, কিন্তু সেখানে দলের চেহারা হিসেবে পেলে, রোমারিও, রোনালদোরা ছিল। ব্রাজিলের এই দলটা যদি বিশ্বকাপ জেতে তাহলে এই দলের রোনালদো হবে নেইমার, কৌতিনহো নাহয় রিভালদোর জায়গাতেই থাকবে – ক্ষতি নাই যদি ষষ্ঠ তারকাটাও যোগ হয় লোগোতে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।