সিঙ্গারা: কিমার সাম্বোসা থেকে ‘আলুর দোষ’

দক্ষ কারিগরের হাতে সিঙ্গারা একটা বেশ জমাটি-খোলতাই চেহারা নেয়। কারিগর দক্ষ না হলে ঐ একই সিঙ্গারার গায়ে ভাজার পর কেমন আঁচিলের মতোন ফুসকুড়ি দেখা যায়। আবার ঠিকঠাক তিনকোনাও হয়না। স্বাদটা খোলতাই হয়না। সিঙ্গারা কেন তিনকোনা হবে বা কেন এমন ডাঁসা পেয়ারার মতো পেলব, কোনা থেকেও বাকী অংশ গোলাকার হবে তার কারণ খুঁজে পাইনি। তবে এই বস্তুর ইতিহাস বেশ পুরোনো।

ইনি আমাদের এদিকটার খাবার নন। রূপনগরের রাজকন্যার মতো এসেছেন ইরান থেকে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বায়হাকির ‘তারিখ-এ-বেহাগি’ বইতে ‘সাম্বোসা’ এর কথা উল্লেখ আছে। তাঁর দাবি ইরানের এই সাম্বোসাই বর্তমান সিঙ্গারার আদিরুপ। সাম্বোসা শব্দটি আবার এসেছে ফার্সি শব্দ ‘সংবোসাগ’ থেকে।

এই যে এত ঘ্যাম, এরপর কি আর ‘ও আচ্ছা সিঙ্গারা’ বলে নাক সিঁটকানো সম্ভব? একদল ইতিহাসবিদের মতে আবার গজনবী সাম্রাজ্যের সম্রাটের সভায় একধরনের মুচমুচে খাবার পরিবেশন করা হতো, তার ভেতর থাকতো গোশতের কিমা, কিসমিস, শুকনো নানা পদের বাদাম। ঐ জিনিসই নাকি সিঙ্গারার আদিরুপ।

পৃথিবীর যে প্রান্ত থেকেই যে খাবার আমাদের এদিকটায় এসেছে, তাকে আমরা বাংলাফায়েড করে ছেড়ে দিয়েছি। উদাহরণ হিসেবে হালের স্ট্রবেবির কথা বলা যায়। বাঙ্গালীর হাতে আসার পরই এই বস্তু আমরা কুচিকুচি করে কেটে মরিচগুড়ো, সর্ষেবাটা, লবন, বিট লবন সমেত স্ট্রবেরী ভর্তা বানিয়ে খেয়ে ফেলেছি। সেই ইউরোপের ভয়াবহ রোমান্টিক এক খাবার বাঙালির হাতে এসে ফুটপাথের ভর্তা হয়ে গেছে। এই খাবার খেতে আমাদের মোমবাতির আলোয় কোন স্বল্পবসনা লাস্যময়ীর প্রয়োজন পড়েনা। টুথপিকে গেঁথে টুকটুক করে আমরা স্ট্রবেরী ভর্তা খাই।

ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগীজরা যখন আমাদের এদিককার লোকজনকে আলু চেনালো তখন থেকেই এই তেলেভাজা সিঙ্গারায় কিমা এবং বাদামের জায়গায় আলু ঢুকে গেছে। আফটার অল আলুকে তো আমরা খুব আপন করেই নিয়েছি। উদাহরণ হচ্ছে, বাংলা ব্যাকরনে ‘আলুর দোষ’ বাগধারা যেমন আছে, তেমনি আমাদের পলিসিমেকাররা স্লোগানও বানান, ‘বেশি করে আলু খান, ভাতের উপর চাপ কমান!’

সে যাকগে আমাদের সিঙ্গারা যেহেতু এখন বাংলাফায়েড তাই আলু আছে, বাদাম থাকে, কলিজা, কিমা ভরে নানাপদের সিঙ্গারা আছে আশপাশে। পুরুষ্টু-ডাঁশা সিঙ্গারা দেখলে এমনিতেই কেমন যেন জিভে জল চলে আসে। প্রথমে আটার খোলস, একটু দামী সিঙ্গারা হলে এর পরেই পুর, আলু আছে, কলিজা আছে, বাদাম আছে। আছে পাঁচফোড়ন! একেক কামড়ে একেক খন্ড দাঁতে কেটে মনে হচ্ছে কি প্রভুখন্ড খাচ্ছি ব্রাদার! সাথে টক দই আর পুদিনা পাতার থকথকে সস। কাঁচা পেঁয়াজ আর স্বাস্থ্যবান-ঝকঝকে সবুজ কাঁচামরিচ!

সসে চুবিয়ে গরম সিঙ্গারার এক কামড়-এরপর হুহুহাহা করে সেই সিঙ্গারার গরম কমিয়ে কাঁচা পেঁয়াজ কচ করে এক কামড় আর এরপরেই কাঁচামরিচ টুক করে এক কামড়! এরপর চোখ বন্ধ করে চিবুতে চিবুতে বিড়বিড় করা, আহা স্বর্গীয় খাদ্য!

কে বানালো এই বস্তু? সেজন্যেই কিঞ্চিৎ ইতিহাস ঘাঁটাঘাটি করলাম। আমাদের এদিককার ব্যাপারগুলোয় যা হয় আরকি, নির্দিষ্ট সেই কারিগরের নাম জানা গেলোনা। শুধু জানা গেলো সম্রাটের খানাপিনায় কোন এক কালে এই বস্তুর ফার্সী সংস্করন এর জোগান ছিলো।

কারিগরের নাম জানা গেলে তার কবরে এক পিস টকটকে লাল গোলাপ ফেডেক্স করে দিতাম। হূমায়ুন আহমেদের ভাষায় হাত সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দেবার যেহেতু সামর্থ্য বা সুযোগ কোনটাই নেই, এক পিস গোলাপ ফেডেক্স করা যেতেই পারে, তাইনা? যেনতেন লোক তো না, সিঙ্গারার আবিস্কারক বলে কথা!

ছোটবেলায় বেশ গাড্ডায় পড়ে যেতাম এই ভেবে যে সিঙ্গারার ভেতর আলুটালু ঢুকায় কিভাবে। দেখার পর অবশ্য কৌতুহল মিটেছে। মাথা ভর্তি গোবর, তাই নিজে নিজে রহস্য ভেদ করতে পারিনি। যাদের মাথা ভর্তি গোবর তারা সম্ভবত দেখেই শেখে। সিঙ্গারা আমাকে তাই শুধু খাবার হিসেবে রসনাই মেটায়নি, কিছুটা জ্ঞান ও দিয়েছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।