বিরিয়ানি: পারস্য থেকে ঢাকার অলিগলি

বিরিয়ানি শব্দটি মূলত এসেছে পারস্য থেকে। পারস্য হল বর্তমান ইরান। ধারণা করা হয়, শব্দটির উতপত্তি মূলত ‘বিরিঞ্জ’ থেকে যার অর্থ চাল। অন্য ধারণা মতে, এটি এসেছে ‘বেরিয়ান’ বা ‘বিরিয়ান’ থেকে, যা মূলত বোঝায় কোনো কিছু ভাজা বা রোস্ট করা।

নামের মত এর উৎপত্তি নিয়েও বেশ মতভেদ আছে। অনেকের মতে মুঘল রাজকীয় হেঁসেল ঘর থেকেই উৎপত্তি হয়েছে বিরিয়ানি। পারস্যের পিলাফ আর স্থানীয় চালের সংমিশ্রণ পেয়েই বিরিয়ানির জন্ম।

আবার অনেকের মতে, বাবরের উপমহাদেশে আসার আগে থেকেই এখানে প্রচলিত ছিল বিরিয়ানি। ১৬ শতকে মুঘল লেখনী আইন-ই-আকবরী মূলত পলান (পোলাও) এবং বিরিয়ানির মধ্যে কোনো সীমারেখা টানেননি। এই তত্ত্ব মতে, তৈমুর লঙ-এর দিল্লী আক্রমণের সাথে ভারতবর্ষে বিরিয়ানীর আগমন। যদিও এই তত্ত্বের কোনো প্রমাণাদি আমাদের হাতে নেই, অর্থাৎ, তুর্কী কিংবা মোঘল শাসকদের হাত ধরে যে বিরিয়ানীর আগমন, তা অনেকটাই হলফ করে বলা যায়।

লন্ডনের মাইল এন্ড রোডে ঢাকা বিরিয়ানি হাউজ

আবার ধারণা করা হয়, দক্ষিণ ভারতে যে বিরিয়ানী প্রচলিত, তা আসে আরব বণিকদের হাত ধরে। তখন মূলত বিরিয়ানি ছিল সৈনিকদের খাবার, বিশাল ডেকচিতে করে চাল আর মাংস মিশিয়ে রান্না করাটা সহজ। যুদ্ধের সময় এই পদ্ধতি ভালো কাজে দিত।

পরবর্তীতে জনপ্রিয়তার কারণে এর অনেক শাখা প্রশাখা ছড়িয়েছে, তবে এটা অনেকাংশে ঠিক, উত্তর ভারতের বিরিয়ানি রান্নার ধারাটা মুঘলদের অবদান, আর দক্ষিণ ভারতের ধারাটা আরব বণিকদের।

বিরিয়ানিকে মোটামুটিভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, পাক্কি আর কাচ্চি। রান্না করা মাংস আর সেদ্ধ করা চাল মিশিয়ে করা হয় পাক্কি। কাচ্চি বিরিয়ানির বৈশিষ্ট্য হল, কাচা মাংস, চাল আর মসলা, সব একসাথে নিয়ে মিশিয়ে পরে রান্না করা হয়। অর্থাৎ, কাচ্চিতে সব একসাথে রান্না হচ্ছে আর পাক্কিতে আলাদা করে রান্নার পর সব মিলিয়ে দেয়া হচ্ছে।

হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি

বিরিয়ানির স্বাদ আর গঠন, ভারতের জায়গাভেদে ভিন্ন। হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি উন্নতি লাভ করে মূলত নিজামদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তবে, ভারতীয় বিরিয়ানি ও বাংলাদেশের বিরিয়ানির মধ্যে স্বাদ ও গন্ধে বিস্তর ফাঁড়াক। আবার ঢাকার রেস্টুরেন্টগুলোতে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি বলতে যা পাওয়া যায়, তাঁর সাথে সত্যিকারের হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানির স্বাদেও অমিল আছে।

কলকাতার বিরিয়ানি আসলে এসেছে লখনৌর বিরিয়ানির আদল নিয়ে। নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ যখন ১৮৫৬ সালের ছয় মে পালিয়ে আসলেন কলকাতায়, সাথে নিয়ে এলেন বিরিয়ানি। এতে মসলার আধিক্য অন্যদের চেয়ে কম।

কলকাতার ততকালীন নিম্ন আয়ের লোকরা বিরিয়ানিতে আলু দিত বেশি করে, ফলনতার জন্য। এরপরে আলুর ব্যবহারই কলকাতার বিরিয়ানির বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠল। পুরোনো ঢাকার সাতরওজায় যে কলকাতা বিরিয়ানি নামের বিরিয়ানির দোকান আছে, তারা মূলত সেই আদি কোলকাতার রেসিপিটাই ব্যবহার করে।

নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ

এছাড়াও আছে লখনৌ বিরিয়ানি, বোম্বে বিরিয়ানি, করাচি বিরিয়ানি, সিন্ধি বিরিয়ানি ইত্যাদি। শুধু এই অঞ্চলেই না, পৃথিবীর নানা অঞ্চলে নানা নামে বেনামে বিরিয়ানি চলছে দেদারসে। ঢাকাতেও আছে বিরিয়ানির রকমফের। খানিকটা ফিউশন করে আজকাল যে ইলিশ পোলাও বা চিংড়ি পোলাও করা হয় সেটাও মূলত বিরিয়ানিরই একটা ভিন্ন সংস্করণ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।