পুরস্কার দিয়ে মাইলেজ পাওয়া একটি সংক্রামক রোগ

আইসিসি ট্রফির পর পত্রিকায় খেলার পাতায় প্রতিদিনই মাসজুড়ে দেখতাম ঘোষণা আর ঘোষণা। আকরাম ভাই, বুলবুল ভাইদের সাফল্যে চুল কাটা ফ্রি থেকে শুরু করে কত কিছু পুরস্কার! সাফল্য পেলে দিতে কার না ভাল লাগে? পুরো দেশের মানুষের আবেগের বহি:প্রকাশ ব্যবসায়ী সমাজ তাদের ঘোষণায় যেনো দিয়ে দিতেন।

এই রোমান্টিক দৃশ্যগুলো তখনই অদ্ভুত লাগা শুরু করবে, যখন বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ী দলের সদস্যরা দেখলেন ১০ ভাগও প্রতিশ্রুত পুরষ্কার তাদের কপালে জোটেনি। সেটা নিয়ে আক্ষেপ আছে। ছিল। এবং থাকবেও।

বাংলাদেশে ক্রিকেট এখন দারুণ ব্যবসা। এতোটাই যে সবাই এর আশেপাশে লেপ্টে থাকতে চায়। কেউ ফ্রেঞ্চাইজি হিসেবে সামান্য খরচ করে, কেউ অঞ্চল ভিত্তিক ক্রিকেটে সামান্য অনুদান দিয়ে বোর্ড পরিচালক হিসেবে, কেউ একে ওকে ধরে।

যেভাবেই হোক না কেনো ক্রিকেট তথা জাতীয় দলের সঙ্গে থাকতে চায়। কিন্তু কেউ একটা ক্লাব তৈরী করতে চায় না। কেউ ক্রিকেটারদের পাওনা টাকা আদায়ে আইনী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসেনা । শুধু ক্রিকেট সাফল্য পেলে একটা বড় গোত্র এগিয়ে আসেন। প্রেসিডেন্ট বক্সেও থাকেন!

তামিমের এক সাহসী সিদ্ধান্ত নতুন উদাহরণ। যেটা নিয়ে বিজ্ঞাপনের বাজারে গত তিন দিন রমরমা। পত্রিকায় ছবিটা দিয়ে বীরত্ব, সাহসীকতার সব কিছু করা হয়েছে। নিজেদের প্রসারও চান্সে দেখিয়ে দিয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এক বোর্ড পরিচালক তো তার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ম্যাচের দিনই তামিম ইকবালের জন্য দশ লাখ টাকার পুরস্কারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তামিম দেশে ফিরেছেন। আশা করছি ৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের মত কোন ঘটনা এবার ঘটবে না। তিনি নিশ্চয় তার সুনাম রাখার জন্য অর্থটা দেবেন।

মনে আছে ২০১১ সালের বিশ্বকাপে রিয়াদ ও শফিউল দারুণ এক জুটি গড়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় এনে দেয়ার পর ব্যক্তি বিশেষ কিছু পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। দুই জন সেগুলো আদৌ পেয়েছেন বলে জানি না।

মাইলেজের লোভটা ভয়ঙ্কর সংক্রামক। আমরা মিডিয়াও মুখিয়ে থাকি সামান্য ভাল হলেও সেটাকে বড় করতে। যাতে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি আরো অনুপ্রাণিত হয় ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের পেছনে খরচ করতে। কিন্তু অতীত বলে সেগুলো খুব সামান্যই পূরণ হয়েছে। দেশের ক্রিকেটের ইমেজ নিজ প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়াতেও কাজে লাগিয়েছেন একজন টাইকুন এটা জানা।

তো এভাবেই চলছে। আজ তামিম এক হাতে ব্যাট করেছে বলে বীর স্বীকৃতি পাচ্ছেন। মাইলেজ নিতে অনেকে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। কেউ তার কাছে গিয়ে বলবেন না, ভাই আমি আপনার কি কাজে লাগবে পারি?

এবার সাকিব ভাঙা আঙুল নিয়ে সাত উইকেট পেলে আবার আরেকটা মাইলেজ পরিস্থিতি তৈরী হবে। হুড়মুড় করে চলবে বিজ্ঞাপন,ছবি প্রতিযোগিতা। কিন্তু কাজের কাজটা ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের জন্য করতে পেরেছেন এমন নজির খুব নেই।

আজ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তামিমকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছেন। সেটা অধিকাংশ মাধ্যমই জানে না। কারন প্রধানমন্ত্রী এটা স্বাভাবিক শিষ্টাচার হিসেবেই নিয়েছেন। কিন্তু এ কাজটা করতে গেলে এমন কেউ কেউ আছেন যে ফেসবুক লাইভ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

ওই জায়গা থেকে বেরিয়ে কেউ ক্রিকেটের ও ক্রিকেটারদের স্বার্থে কিছু করুন। পুরস্কার ঘোষণা করলে সেটা দিন। নাহলে অহেতুক প্রচার মাধ্যমে দিস্তা দিস্তা কাগজ ও এয়ার টাইম নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। প্রোডাক্ট হিসেবে ক্রিকেট লোভনীয়। কিন্তু তার দেখভাল না করল কিন্তু সোনার ডিম পাড়া হাঁস হতে সময় লাগবে না। ১৯৯৭ থেকে ২০১৮ অনেক দূর। কিন্তু কিছু জিনিসের পার্থক্যটা এখনো চোখে পড়লো না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।