দ্য গ্রেট মুমিনুল ফোর্ট

চট্রগ্রামের পশ্চিমে শিল্পাঞ্চল পাদদেশঘেঁষা জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামটিকে মুমিনুলের কেল্লা নামে ডাকা শুরু করলেও ভুল হবেনা!

বৃহস্পতিবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম দিনটা বাংলাদেশ নিজেদের অনুকূলে রাখতে পারল মমিনুলের ১২০ রানের ইনিংসটার জন্যই। এই ভেনুতে আট ম্যাচে মুমিনুলের সেঞ্চুরিসংখ্যা ইতোমধ্যে ছয়-এ চলে গেছে। সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবের খ্যাত মাহেলা জয়াবর্ধনেকে টপকে গেলেন মুমিনুল এই সেঞ্চুরি দিয়ে। এক মাঠে ছয় বা তার বেশি শতক করা দশম ব্যাটসম্যান এখন মমিনুল।

বাংলাদেশের রীতিতে, কোন স্টেডিয়াম কারো নামে জনপ্রিয় হওয়া অবশ্যই দারুণ ব্যাপার। বাংলাদেশের আর কোন ব্যাটসম্যানের একই মাঠে দু’টির বেশি সেঞ্চুরি নেই এবং যারা এক মাঠে এক হাজারের বেশি রান করেছেন তাদের মধ্যে ঢাকায় সাকিবের গড় ৪৪.০৩, ঢাকায় তামিমের গড় ৩৭.৫ এবং চট্টগ্রামে মুশফিকের গড় ৪৩.৮৪। মমিনুলের সাথে তুলনায় আসলে এগুলো সবগুলিই যেন ফিকে লাগে, চট্টগ্রামে ১৪ ইনিংস খেলার পর, তাঁর গড় ৮৯.৯০।

এটিই কি তার প্রিয়  মাঠ? সাগরপাড়ের সন্তান মুমিনুলের সাথে এই মাঠটা বা শহরটার কি আত্মিক যোগাযোগ আছে? তিনি চট্রগ্রাম নামক শহরে কি মিশে গেছেন? সাগরিকার শিল্প এলাকার পাড়ঘেঁষা এই অঞ্চলে কি তিনি সহজবোধ করেন? কারণ এখানে যে অযথা কোলাহল নেই।

‘আমি সত্যিই স্টেডিয়ামে এটা ভেবে আসি না যে, ‘হ্যাঁ, আমি এখানে আসব আর সেঞ্চুরি করে ফিরব’, মুমিনুল ড্রেসিংরুমের দিকে হাটতে হাঁটতে বলেছিলেন। ‘আমি এই জিনিস সম্পর্কে খুব একটা চিন্তা করি না। তাই আসলে আমার কাছে এইসব প্রশ্নের উত্তর নেই।’ যোগ করলেন তিনি।

সাধারণত মুমিনুলের কাছে বেশিরভাগ সেইধরণের প্রশ্নের উত্তর থাকেও না, যখন তাঁর ব্যাটিংয়ের সাথে অন্য প্রসঙ্গ মিশিয়ে নেয়া হয়। তিনি হলেন ‘বল দেখব আর খেলব’ ধরনের লোক। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় তাঁর কাজটা কিভাবে আরো নিখুঁতভাবে করা যায়, এ নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কিছুতো সংযোগ অবশ্যই আছে। মমিনুল চট্টগ্রাম বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলেছেন ( দলের নাম এখনো চট্রগ্রামে বদলায়নি)।

সে ফর্ম অবশ্য খুব দারুণ কিছু না, চারটি প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচ খেলে গড় ১১। তিনি চট্রগ্রামের জন্য খেলেন কারণ তিনি কক্সবাজারের ছেলে, যে জেলা চটগ্রাম বিভাগের অধীনে। মমিনুল চট্টগ্রামে খুব যে  ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন তাও না, তিনি মূলত বিকেএসপিতেই নিজেকে গড়েছেন। এবং, বাকি বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মতো, তিনি রাজধানীতে তার অধিকাংশ ক্রিকেটম্যাচ খেলেছেন।

সুতরাং চট্টগ্রামের সঙ্গে তার একমাত্র সংযোগ ছিল টেস্ট সেঞ্চুরি, এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম দিনেই তিনি তাঁর পছন্দের কাজটি করে ফেলেছেন।

ইনিংসের মানও খুব প্রশংসনীয় ছিল। ইনিংসটি দুই বছর আগে ঢাকায় তামিমের ১০৪ রানের ইনিংসটি মনে করিয়ে দেয়। তামিমের ইনিংসটা ছিল ঐ টেস্টে সর্বোচ্চ ইনিংস,  আসলে তিনি প্রথম দুই সেশনের সুবিধাটুকুর সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন, যখন পিচে ব্যাটিং সুবিধাজনক ছিল। চট্টগ্রামেও মুমিনুল একই কাজ করেন, তিনিও প্রথম দুই সেশনের মধ্যেই শতক হাঁকিয়েছিলেন এবং অন্য ব্যাটসম্যানের চেয়ে আরও সহজভাবে খেলেছেন।

সৌম্য সরকারের দু’বল পরেই ড্রেসিংরুমে ফেরা,  ইমরুল কায়েসের দুই লাইফ পেয়ে ৮৭বল খেলা পরিস্থিতিকে খারাপ করে দিচ্ছিল। মোহাম্মদ মিথুন মোটেও টেস্টের ৪নাম্বারের মত খেলেছেন না, সাকিব আল হাসান চা বিরতি পর্যন্ত বিপর্যয় আটকাতে চেষ্টা করেছেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলিং আক্রমণ, ২০১৬ সালের ইংল্যান্ডের মত এত ভালো ছিল না, তবে কেমার রোচ এবং শ্যানন গ্যাব্রিয়েল এই জুলাইয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন। মুমিনুল ভালভাবেই গ্যাব্রিয়েলকে সামলেছেন এবং রোচকে খুব একটা ঘাটান নি।

তিনি মূলত তখনি আক্রমণ করছিলেন যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্পিনাররা জায়গা দিচ্ছিল বা শর্ট বল ছাড়ছিল। তিনি রোস্টন চেজের উপর আগ্রাসী হচ্ছিলেন এবং দেবেন্দ্র বিশুকে নিয়মিত স্ট্রাইক রোটেট করছিলেন। তিনি বামহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিকানকে আক্রমণ করেননি বটে, তবে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখছিলেন।

মধ্যাহ্ন বিরতির পর সেঞ্চুরির ছোঁয়া মুমিনুল তামিমকে ছুঁয়ে ফেলেন বাংলাদেশের হয়ে টেস্টের সর্বোচ্চ টেস্ট শতকধারী হিসেবে(আট) । আবার ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির তালিকায় সঙ্গ দিতে শুরু করেছেন বিরাট কোহলিকে , দু’জনই চারটি করে সেঞ্চুরি করেছেন। আবার, এক বছরে মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের সর্বোচ্চ শতক এখন তাঁর, আগের রেকর্ড ছিল তামিমের, ২০১০ সালে তামিমের তিনটি সেঞ্চুরি।

মমিনুলের সেঞ্চুরি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশের এটি ব্যবহার করা উচিত। তিনি চট্টগ্রামে যে ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছেন , সে ম্যাচে বাংলাদেশ হারেনি। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার ১৮১ রান ছিল দেশের মাটিতে তাঁর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।

শ্রীলঙ্কা এবং জিম্বাবুয়ের কাছে লজ্জাজনক শিক্ষা পেয়ে দেশে ফেরার পর। তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির তিন মাস পর, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মমিনুলের অপরাজিত ১০০ ছিল দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটি ইনিংস যা বাংলাদেশের সম্মান রক্ষার  ড্র এনে দিয়েছিল।

জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ১৩১ রানের ইনিংস কেবলমাত্র বাংলাদেশকেই জয় এনে দেয়নি, তাঁকেও ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছিল।

তিনি এই বছর জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একই টেস্টে ১৭৬ এবং ১০৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন যা তাঁর রানখরা কাটিয়ে দিয়েছিল। প্রথম ইনিংস ছিল মুমিনুলসুলভ – শটবহুল, এবং পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। শতকে পৌঁছানোর পরে তাঁর উদযাপনও ছিল দেখার মত। তিনি বাতাসে ঘুষি ছুড়লেন এবং ব্যাট দিয়ে প্যাডে আঘাত করলেন। এটা খুব বড় কিছু না, তবু মুমিনুল বলেই বিশেষকিছু, তিনি হলেন এমন একজন, যিনি ঐতিহ্য না হলে শতকের পর ব্যাট উঁচু করতেন কিনা তাও সন্দেহ।

অনেকে মনে করেন, এটি  শ্রীলঙ্কান ড্রেসিং রুমের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে হাতুরেসিংহে বসেছিলেন। অনেকে এটাও মনে করেন, ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত চলা চন্ডিকা রাজত্বেই মমিনুল নিজেকে হারাচ্ছিলেন। গত বছর সেপ্টেম্বরে টেস্ট দল থেকে বাদ পড়লেন মমিনুল, হাতুরের সিদ্ধান্তেই। ২৪ ঘণ্টা পর বিসিবির প্রধান নাজমুল হাসান মুমিনুলকে ফিরিয়ে আনেন।

যে ক্যারিয়ারে পট পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকেই মুমিনুল নিজেকে বদলে নেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় মুমিনুল ভাল খেলেছেন এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাজে একটা সিরিজ কাটানোর পর নিজের চতুর্থ সেঞ্চুরি পেয়েছেন। গত সপ্তাহে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৬১ রানের ইনিংসটা খেলেন, যখন বাংলাদেশ ছিল ৩ উইকেটে ২৬। চতুর্থ উইকেট জুটিতে মুশফিকের সাথে ২৬৬ রান সংগ্রহ করেন এবং একটি বড় জয়লাভের পথ তৈরি করেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ১২০ রানের ইনিংস বাংলাদেশকে জেতাতে পারে কিনা তা এখনো অজানা, তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যর্থতার পর বলা যায়, এই ইনিংসটাই এখন এই চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড।

– ইএসপিএন ক্রিকইনফো অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।