টি-টোয়েন্টি নামের ‘আতঙ্ক’

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট আসার পর আমরা ভেবেছিলাম এটাই আমাদের জন্য আদর্শ ফরম্যাট। অথচ ১২ বছর এই ফরম্যাটে খেলার পর আমরা জানি আর যাই হোক টি-টুয়েন্টি আমাদের জন্য না।

চিকি শট, ধুম ধাড়াক্কা আন্দাজে টানা, এলোমেলো শট এসব দিয়ে টি-টোয়েন্টি খেলবো বলে ধারনা করেছিলাম, কিন্তু তাকিয়ে দেখেন এই ফরম্যাটের সেরা ব্যাটসম্যান যারা তারা প্রায় সবাই সোজা ব্যাটের ক্লিন হিটার। টাইমিং, শট সিলেকশন আর স্ট্রেইট ব্যাটে খেলেই তারা সফল।

আমাদের অবশ্যই কোন গেইল নেই, এবি ডি ভিলিয়ার্স নেই আবার ভিরাট কোহলির মতো রান মেশিন নেই। কিন্তু যারা আছে তারাও ব্যাসিক কাজটা ঠিক মতো পারেনা। তারা মূলত আত্মবিশ্বাসের উপর ভর করে খেলে। আর সেই আত্মবিশ্বাস এখন শূন্যের কোঠায়, যার কারনে পুরা দল কনফিউজড।

কতখানি কনফিউজড? তামিমের ব্যাটিং দেখেন গতকাল, সহজ সহজ বলে ডট বল দিলো। তারপর দুটি বাউন্ডারি মারলো, পরের বলটা একটা স্লোয়ার বাউন্সার ছিলো। রাবাদার বল না যে টোকা লাগলেই বাউন্ডারি পার! সেই বলেই একেবারে কনফিউজড মাইন্ডে ‘হাফ-শট’ খেলে আউট সার্কেলের ভেতর। হয় আত্মবিশ্বাসের সাথে মারুক না হয় ডাক করুক? স্কয়ার লেগ থেকে ফাইন লেগ হয়ে কিপারের হাতে, লেগ সাইডে এই অঞ্চলে তামিমের আউটের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।

মুশফিকের কথা বলি, পরপর বাউন্ডারি হাঁকিয়েও আগে থেকে ঠিক করে রাখে ডাউন দ্যা উইকেটে যাবে! যেন প্রতি বলেই মারতে হবে! অথচ ভিভ রিচার্ডসের মতো আক্রমনাত্বক ব্যাটসম্যান বলেন, “১২০ বল অনেক বল, এখানেও ইনিংস বিল্ড করতে হবে, লম্বা সময় ব্যাট করতে হবে, বোলার টার্গেট করতে হবে, আবার ভালো বোলারের ভালো বলে সম্মান দিতে হবে, সিঙ্গেল, ডাবলস নিয়ে স্কোরবোর্ড সচল রাখতে হবে”

অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, ডট বল দিয়ে নিজেই নিজের উপর প্রেসার বানিয়ে এমন এক শট নিলেন যেটা খেলার মতো ব্যালান্স তার ছিলোনা। লুজ শট।

সামান্য ক্যালকুলেশন কেউ করেনা মনেহয়। গতকাল সাইড উইকেটে খেলা হয়েছিলো। কমেন্ট্রি বক্সের দিক থেকে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরের জন্য লেগ সাইডে বড় বাউন্ডারি ছিলো আর অফ সাইডে ছোট। ভারতের ব্যাটসম্যানরা ছোট দিকের বাউন্ডারি খুব সুন্দর করে ব্যবহার করেছে। আমরা পারিনি! আর যখনই করতে চেয়েছি বল ৩০ গজই পার হয়না!

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের আউট হয়েছে ওই বড় পাশেই। রোহিত শর্মার ফিল্ডিং সাজানো ভালো ছিলো। ফিল্ডারকে বাউন্ডারি আর সার্কেলের মাঝে রেখেছিলো। ছোট পাশ হলে ফিল্ডারকে অবশ্যই একেবারে বাউন্ডারির সাথে রাখতেন। বলটা বোলার ওইভাবেই করেছিলো, অফ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে শর্ট বল। রিয়াদ এতো অভিজ্ঞ অথচ বিষয়টা বুঝলেন না! আফসোস! অফ সাইডে ডিপে একটাই ফিল্ডার ছিলো, রিয়াদ মারলেন তার হাতেই! এক চুল এদিক, সেদিক না।

দল নির্বাচনের সময় নান্নু বারবার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন, তাই তিন অভিজ্ঞ প্লেয়ারের কথাই বললাম আগে। অন্যরা যে খুব ভালো করেছে সেটাও না।

একাদশ পছন্দ হয়নি, একজন বোলার কমিয়ে আরিফুলকে খেলানো উচিৎ ছিলো। মাহমুদুল্লাহ-সৌম্য-আরিফুল মিলে ৪ ওভার বল করতে পারতো। তাছাড়া এভাবে এক সিরিজ শেষে বসিয়ে দিলে কখনোই “হিটার” পাবেনা বাংলাদেশ।

লিটন-সাব্বির প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ব্যাট করেছে। অনেকের মতে লিটনের একাদশে থাকাই উচিৎ না, কিন্তু লিটনই সর্বোচ্চ রান করেছে। যদিও স্ট্রাইক রেট লিটন-সাব্বির কারোরই বলার মতো কিছুনা। কিন্তু ধারাবাহিক বিরতি দিয়ে উইকেট পড়লে তখন ২০ ওভার ব্যাট করা নিয়েই সন্দেহ জেগে যায় ফলে টিকে থাকাই মুখ্য হয়ে যায়। তারপরও কিছু কাউন্টার অ্যাট্যাক করা যেত ভারতের এই তরুণ বোলারদের।

৫৭ ডট বল দিলে আপনি কিভাবে ম্যাচ জেতার আশা করেন? ২০ ওভারের খেলায় ১০ ওভার ডট বল। সেই ডট বলের চাপে সাব্বির-লিটন-মিরাজ সবাই মারতে যেয়ে আউট। অদ্ভুত লাগে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেরেও বল বাউন্ডারি পার হয়না! হবে কিভাবে? ছয় মারতে শুধু শক্তি লাগেনা, টাইমিং আর মিডিলিং হতে হয়। বেশিরভাগ সময়ে এটাই সত্যি, সবাই গেইল-ম্যাককালাম না!

যার দিকে ভরসা করে তাকিয়ে ছিলাম সে ফ্লিক করে দূর্দান্ত একটা ছয় মারলো যেপাশে বড় বাউন্ডারি সেদিক দিয়েই। কিন্তু তারপর একই বল শুধু লেংথ সামান্য চেঞ্জ করেছিলো বোলার, মিস টাইমিং করে ফাইন লেগে মাটি ঘেঁষা ক্যাচে আউট। এটাও একটা হাফ-শট ছিলো। লেংথ পিক করতে না পারলে ফ্লিক করার কি দরকার? স্কয়ার লেগে টুকে দিয়ে সিঙ্গেল নিলেই হয়! এমনিতেই তাকে নিয়ে কতো কথা, শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কেন শট খেলতে হবে? সিনিয়র পার্টনার ডট বল দিচ্ছে সেই প্রেসার রিলিজ করতে? কখন আবার দল থেকে বাদ দেয়ার রব উঠে যায় জনতার মুখে!

অনেক এক্সট্রা দিয়েছিলো ভারত, ফ্রি হিট এসেছিলো অনেক, লুজ বলে মিস হিটে ক্যাচ পড়েছে প্রচুর ভারতের ফিল্ডারদের পিছলা হাত ফসকে। কোনটারই সুযোগ নিতে পারেনি বাংলাদেশ। যার কারণে রান মাত্র ১৩৯/৮। পাওয়ার প্লে নামে যে একটা জিনিস আছে সেটাই যেন আমরা ভুলে যাই!

একটু সাহসী হতে হয়, সাহস করে পাওয়ার প্লের অ্যাডভান্টেজ কাজে লাগাবো কবে আমরা? এক/দুই উইকেট পড়লেই খোলসে ঢুকে যেতে হবে? প্রথম ম্যাচে ভারত ৯/২ ছিলো, কিন্তু তারপর? ভারত ঠিকই স্কোরবোর্ডে ১৭৫ রান তুলেছিলো!

ভারতের ‘বি’ টিম বলেন আর ‘এ’ দল, যেই দলটার বোলারদের বেদম পিটানি দিলো শ্রীলংকা তাদের কাছেই নাস্তানাবুদ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। আর দল যত দূর্বল হোক ১৪০ রান মনেহয় ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দল হলেও চেজ করে ফেলতো!

বোলাররা তুলনামূলক ভালো বল করেছে। ১৪০ রান করতে ভারতকে যে ১৮.৪ ওভার খেলতে হয়েছে গত ম্যাচের একমাত্র সাফল্য এটাই।

তবে ভালো হয়নি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের অধিনায়কত্ব। এই রান ডিফেন্ড হয়তো করা যেতনা তবে সেটা করার চেষ্টা কি করেছিলো বাংলাদেশ অধিনায়ক? একটু ব্যতিক্রম প্ল্যানিং কি করা যেতনা? একাদশের একমাত্র বোলার ছিলো অপু যাকে ভারতের ব্যাটসম্যানরা আগে খেলেনি, সেই অপুকে আনা হলো সবার শেষে, সপ্তম বোলার হিসেবে।

করানো হয়েছে মাত্র ২ ওভার। আমরা সবসময় বলি, মাশরাফি-মুশফিক কেউই অধিনায়ক হিসেবে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের বোলিং ব্যবহার করেনি যথাযথ উপায়ে। রিয়াদ নিজে কি নিজেকে ব্যবহার করতে পারেন আমার প্রশ্ন? রিয়াদ নিজেও শুরুতে চমক হিসেবে আনতে পারতেন। অনেক সময় বিপিএল-পিএসএলে এমনটা দেখেছি। তাসকিন-রুবেল-মিরাজ-ফিজ এদের নিয়ে প্রতিপক্ষ ভালো হোমওয়ার্ক করে রাখবে সেটাতো জানা কথা! ১৩৯ রানকে ডিফেন্ড করতে হলে ‘আউট অব দ্য বক্স’ কিছু করতে হয়।

ফিল্ডিং সাজানো ভালো হয়নি, ব্যাটসম্যানের পছন্দের জায়গা গুলা ব্লক করতে পারিনি আমরা, যেই পাশে বাউন্ডারি বড় সেপাশে বুদ্ধি করে ফিল্ডিং সাজাতে হয়, বাউন্ডারি লাইনের একটু সামনে ফিল্ডার রাখতে হয়। বেশকিছু বাতাসে ভাসা বল ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ পড়েছে একারনেই। ক্যাচ মিস হয়েছে। মিরাজের ক্যাচটা কিছুটা কঠিন কিন্তু ১৩৯ ডিফেন্ড করতে হলে এগুলা নিতে হবে। ধাওয়ানের স্ট্যাম্পিং মিস হয়েছে। একটা জিনিস বুঝিনা, লিটন একাদশে থাকার পরেও মুশফিক কেন কিপিং করবেন? গ্লাভস হাতে লিটন ‘মাচ্ বেটার অপশন’!

আর ব্যাটসম্যান হিসেবেও রিয়াদকে তিন নাম্বারে চেয়েছিলাম। ইনিংস বিল্ড করা আবার বিগ হিট নেয়া দুটাই তিনি পারেন। এশিয়া কাপের রিয়াদ কোথায় হারালেন?

আসলে গেমপ্ল্যান অনেক বড় বিষয়। বাংলাদেশ নিকট অতীতে যেটুকু সাফল্য পেয়েছিলো সেটা গেমপ্ল্যান আর আক্রমনাত্বক ক্রিকেট খেলেই। তৎকালীন কোচ রিয়াদকে আক্রমনাত্বক অপশন হিসেবে ব্যবহার করেছিলো এশিয়া কাপে। তার পরিকল্পনায় তামিম-মুশফিক টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে না থাকলেও রিয়াদ খুব ভালো করেই ছিলেন।

আবার বিপিএলে দূর্দান্ত অধিনায়কত্ব করেন রিয়াদ। কিন্তু এটাও সত্যি তার পেছনে মাস্টার মাইন্ড হিসেবে কখনো স্টুয়ার্ট ‘ল আবার কখনো মাহেলা জয়াবর্ধনে ছিলেন।

কেউ যদি কোচের ভূমিকা না বুঝতে পারেন তাহলে অন্তত এই বিষয়টা চিন্তা করতে পারেন।

আমাদের না দল হিসেবে গেমপ্ল্যান থাকে আর না ব্যক্তিগত। কোন ব্যাটসম্যানের ভেতর দেখিনা ইনিংস বিল্ড করার ইচ্ছা। হয় ডট বল দেয় আর নাহয় তেড়েফুঁড়ে মারতে যায়। এভাবেই চলছে বিগত ১২ বছর ধরে।

বাংলাদেশ টেকনিক্যালি কোন সলিড টিম না, নেই বিশ্বকাঁপানো ব্যাটসম্যান, নেই অগ্নিগোলা নিক্ষেপ করার মতো পেসার বা মায়াবি ঘূর্নির স্পিনার। বাংলাদেশ যখন ভালো খেলে তখন সম্পুর্ন আত্মবিশ্বাস আর সঠিক গেমপ্ল্যানের উপর নির্ভর করেই ভালো খেলে, জয় লাভ করে।

আর সেই দুইটা জিনিসই এখন নাই, আত্মবিশ্বাস আর গেমপ্ল্যান।

আর শ্রীলঙ্কার এই দুইটা জিনিসই ফিরে এসেছে। যদি কোন মিরাকল না ঘটে তাহলে আগামীকাল শ্রীলংকার বিপক্ষে আরো বড় লজ্জা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

আর যে বা যারা ভারতের ‘বি’ দলের সাথে বাংলাদেশ অনায়াসে জিতবে বলে ধরে নিয়ে তর্ক করেছিলেন তাদের উপদেশ দিবো এই টুর্নামেন্ট আর দেখার দরকার নেই আপনাদের। সহ্য করতে পারবেন না কিন্তু!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।