দ্য ফল অব দ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড, নাকি বড় ঝড়ের আগে ক্ষণিকের নীরবতা?

ভারতের বানিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই। তবে, শহরটা বেশি পরিচিত বলিউডের সুবাদে। একটা সময় ঠিক একইভাবেই পরিচিত ছিল আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াদের স্বর্গ হিসেবে। সংঘবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেটের কল্যানে নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে শহরটিতে রীতিমত ত্রাস সৃষ্টি করে বেড়াতেন দাউদ ইব্রাহিম কিংবা ছোটা রাজনরা।

শহরটি কি না দেখেছে! যেমন দেখেছে তাঁদের বন্ধুত্ব, তেমনি তাদের শত্রুতা আর রাস্তায় রাস্তায় রক্তের বন্যাও দেখেছে। তবে, একটা সময় যে মাফিয়া দুনিয়া পুলিশ, ব্যবসায়ী, বিল্ডারদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতো, এখন সে দুনিয়াটা চূড়ান্ত পতনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।

২০১৬ সালে মুম্বাই পুলিশে মহারাষ্ট্র কনট্রোল অব অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যাক্টের (এমসিওসিএ) অধীনে পাঁচটা মামলা দাখিল হয়েছে, এর মধ্যে মাত্র দু’টি আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে জড়িত। এই তথ্যটাই বলে দেয়া মুম্বাই এখন আগের থেকে অনেক শান্ত।

সেই বছরই এমসিওসিএ বিষয়ক মামলায় ৪১ জনকে গ্রেফতার করে মুম্বাই পুলিশ। এর মধ্যে চারজনের দাউদ ইব্রাহিম গ্যাঙের সাথে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।  আন্ডারওয়ার্ল্ডে এই গ্যাঙটাই ডি-কোম্পানি নামে ‘বিখ্যাত’। গেল তিন-চার বছরে হেমন্ত পুজারি, অরুণ গাওলি, পান্ডেব পুত্রা ও কুমারী পিল্লাই গ্যাঙগুলোও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

হঠাৎ এই চূড়ান্ত পতনের কারণ কি? পুলিশ এখন অনেক বেশি তটস্থ? নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ড নিজেদের কাজের ধরণ পাল্টে ফেলেছে? নাকি তাদের ‘ইন্টারেস্ট’-এর জায়গাটাই বদলে গেছে? নাকি এটা শুধুই বড় ঝড়ের আগে ক্ষণিকের নীরবতা?

মুম্বাই পুলিশের দাবী, শ্যুটারের অপ্রতুলতাই আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ঝিমুনির মধ্যে রেখেছে। মুম্বাই পুলিশের এক ক্রাইম ব্রাঞ্চ কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে গ্যাঙগুলো উত্তর প্রদেশ থেকে শ্যুটার খুঁজে বের করতো। রবি পুজারি গ্যাঙ ইউপি’র ডোমবিভলি, কোঙ্কান, ম্যাঙ্গালোর ও আজমগর থেকে ‍শ্যুটারদের বের করতো। রুদ্ধশ্বাস সব অপারেশন করে শ্যুটাররা পেত পাঁচ থেকে ১০ হাজার রুপি। অন্যদিকে, মূল ক্লায়েন্টের কাছ থেকে গ্যাঙ লিডাররা পেতেন কোটির ওপর। ফলে, সামান্য কয়েক হাজার রুপির জন্য শ্যুটাররা নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে নারাজ হয়ে ওঠে।’

তিনি আরো জানান, সম্প্রতি ক্রাইম ব্রাঞ্চ অঙ্কুশ ইন্দুলকার ও সাগর চাভান নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। তারা ওশিয়ারার এক বিল্ডার কাম ব্যবসায়ীকে ‘টপকাতে’ চলেলি গ্যাঙস্টার এজাজ লাকদাওয়ালার নির্দেশে। এই বিল্ডারের কাছে এজাজের দাবী ছিল দুই কোটি, অন্যদিকে সেই বিল্ডারকেই হত্যার জন্য ‍শ্যুটারদের মাত্র হাজার পাঁচেক রুপি দেওয়ার দফারফা হয়। পুলিশ জানায়, অর্থের খুব প্রয়োজন ছিল বলেই দুই শ্যুটার এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।

কেএমএম প্রসন্ন, মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের এসিপি (অ্যাডিশনাল কমিশনার অব পুলিশ) বলেন, ‘এমসিওসিএ একটা কঠোর আইন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে জড়িত কেউ গুলি করতে গিয়ে ধরা পরলে তার কমপক্ষে ২০ বছর জেল হবে। ভিকটিম প্রাণে বাঁচলেও ১০ বছরের জেল হবে।’

প্রসন্ন মুম্বাই মাফিয়ার সুপ্তাবস্তাকে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান চালানোর ফলাফল হিসেবেই দেখতে চান। তিনি বলেন, ‘গেল তিন-চার বছরে রবি পুজারি গ্যাঙয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ৫০ শতাংশ সহচরদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ২০১৪ সালের আগস্টে এই গ্যাঙ সিনেমা প্রযোজক করিম মোরানিকে হত্যার চেষ্টা করে, কিন্তু গুলি গিয়ে লাগে তাঁর পার্ক করা গাড়িতে। এরপর এই একই গ্যাঙ নির্মাতা মহেশ ভাট ও তাঁর ভাই মুকেশ ভাটকে টার্গেট করে। কিন্তু, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। সেবার ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। একটা রবি পুজারির জন্য বড় একটা বিপর্যয় ছিল।’

২০১৭ সালের জানুয়ারির নথি ঘেটে শেষ তিন বছরে মুম্বাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া ৮৭ জন আন্ডারওয়ার্ল্ড সদস্যের নাম জানা যায়, যারা প্রত্যেকেই বড় কোনো গ্যাঙয়ের সাথে জড়িত। প্রসন্ন বলেন, ‘পুলিশ অনেকগুলো বড় মিশন পরিচালনা করেছে। তিলক নগরে ছোটা রাজনের গনেশ মন্ডলকে টার্গেট করেছিল ছোটা শাকিলের গ্যাঙ। সেটা ভেস্তে দেয় পুলিশ। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতান হন গ্যাঙস্টার গুরু সত্যমের ছেলে ভূষণ। ছোটা রাজন, কুমার পিল্লাই কিংবা সন্তোষ শেঠির মত গ্যাঙস্টাররা এখন জেলে। ছোটা রাজনকে গ্রেফতার করা পারাটা পুলিশের একটা বড় কৃতীত্ব। গ্যাঙগুলোর পুরনো সতীর্থদেরও আমরা খুঁজে খুঁজে গ্রেফতার করছি। সম্প্রতি আমরা উত্তরাঞ্চল থেকে ড্যানিকে গ্রেফতার করেছি। ২০০৬ সালে কালা ঘোড়া শ্যুটআউটের সময় সে ছিল ছোটা রাজনের ঘনিষ্ট সহচরদের একজন।’

নব্বই দশকে ত্রাস ছড়ানো ডি-কোম্পানি এখন কোথায়? – এই প্রশ্নের জবাবে সিনিয়র এই পুলিশ অফিসার বলেন, ‘ডি-গ্যাঙ নিজেদের বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিয়েছে, তারা এখন অন্য ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছে। দাউদের সংগঠন একটা বিশাল কোম্পানি। অন্য কোনো গ্যাঙের সাথে ওটার তুলনা চলে না। বাকিরা এখনো চাদাবাজির ব্যবসায় জড়িত। কারণটা পরিস্কার, ওরা পেশিশক্তির বিনিময়ে টাকা চায়।’

রবি পুজারির গ্যাঙকে কার্যত অক্ষম করে দেওয়া ক্রাইম ব্রাঞ্চের এক কর্মকর্তা জানালেন, পুলিশের সোর্স নেটওয়ার্কগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘অ্যাকটিভ’। তিনি বলেন, ‘একটা সময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের ব্যাপারে তথ্যের জন্যে আমাদের নির্ভর করতে হত ইন্টিলিজেন্স এজেন্সির ওপর।  তবে, নিজেদেরও কিছু তথ্য বের করার ক্ষমতা থাকা দরকার। একই সাথে তথ্যগুলো গোপন রাখাটাও জরুরী। আগে অনেকগুলো কেসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগে ভাগেই লিক হয়ে গেছে।’

প্রসন্ন বলেন, ‘ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক এখন আমাদের সাহায্য করছে। এমনকি এখন কনস্টেবলরাও খবর যোগার করতে পারে। মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকাদের কাঠ থেকে অনেক খবর আছে। অ্যান্টি-এক্সটরশন সেল এই তথ্য সংগ্রহ করেই আন্ডারওয়ার্ল্ড অপরাশেনগুলো দমন করে।’

গ্যাঙ সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার আরেকটা কারণ হল জনপ্রিয়তার অভাব। প্রসন্ন বলেন, ‘একটা গ্যাঙ ততক্ষণই টিকে থাকে যখন তাদের একজন নেতা আর বিস্তর সমর্থক থাকে। সমর্থক ছাড়া নেতার জন্ম হয় না। নেতা নিজের কর্মীদের নিয়ন্ত্রন করেন। নেতা থাকলে তার সেনা-সামন্তরা কাজ করতে ভরসা পায়। আমরা এমনও তথ্য পেয়েছি যে, গ্যাঙস্টারদের অনেকেই নিজেদের কাজ সম্পাদনের জন্য টাকা দিয়ে বসে আছেন কিন্তু কাজ হচ্ছে না। ফলে গ্যাঙগুলোরও অনেক দেনা জমে গেছে।’

রাজন আর পিল্লাই জেলে। প্রসন্ন দাবী করলেন দাউদ আর শাকিলকেও শিগগিরই জেলের ভাত খাওয়ানো হবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রচেস্টা জারি আছে।’

গ্যাঙস্টারদের এই কাটতিহীন বাজারেও ধিকি ধিকি করে দুটি গ্যাঙ টিকে আছে –

  • এজাজ লাকদাওয়ালা

বান্দ্রা সেন্ট স্ট্যানিসলউস স্কুলের সাবেক ছাত্র এজাজ লাকদাওয়ালা নিজের চাচার ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে চাকরী শুরু করেছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে কলহের জের ধরে তিনি হারেন মেহতাকে খুন করেন। গ্রেফতার হন, অভিযোগ প্রমানিত হলে ১৯৯৩ সালে তাকে জেলে পাঠানো হয়।

জেলে তার সাথে পরিচয় হয় সুনিল মাদগাওঙ্কার অ্যালিয়াস মাতিয়ার। এজাজকে এই মাতিয়া ছোটা শাকিলের সহযোগী ফরিদ রাজ্জিকে মারার ‘সুপারি’ দেন। হত্যাচেষ্টার পরও ১৯৯৬ সালে রাজ্জি প্রাণে বেঁচে যান। লাকদাওয়ালাকে আবারো গ্রেফতার করে নাসিক জেলে পাঠানো হয়।

জেল থেকে পালিয়ে ১৯৯৮ সালে তিনি মালয়েশিয়া পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন ছোটা রাজন গ্যাঙয়ে। একটা সময় ছোটা রাজনের ছায়া থেকে বের হয়ে নিজের আলাদা গ্যাঙ খোলেন এজাজ।

ধারণা করা হয়, কানাডার কোনো একটা জায়গা থেকে তিনি নিজের অপরাধচক্র পরিচালনা করেন। ছোটা শাকিলের সাথে জোট গড়তে চেয়েছিলেন বলে, ২০০৩ সালে ব্যাংককয়ে তাঁর ওপর হামলা চালায় ছোটা রাজন গ্যাঙ। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু,  জখম নিয়েই তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে চলে যান দক্ষিণ আফ্রিকায়।

২০০৪ সালে ওটোয়া থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেন পুলিশ। যদিও, তিনি ছাড়া পেয়ে যান। এরপর কিছুদিন গা ঢাক দেওয়ার পর ২০০৮ সালে তিনি ফের মুম্বাইয়ে চাঁদাবাজি শুরু করেন। মুম্বাই পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজি সংক্রান্ত ২৪ টি মামলা দাখিল করা আছে।

  • রবি পুজারি

স্কুল ড্রপআউট হওয়ার পরও ইংরেজি, হিন্দি, কান্নাড়া ও তুলু ভাষায় অনর্গকল কথা বলতে পারেন রবি পুজারি। নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে তিনি মুম্বাইয়ের আন্ধেরি এলাকায় নিজের ‘ক্রিমিনাল ক্যারিয়ার’ শুরু করেন। তার টার্গের ছিল সিনেমার লোক আর ব্যবসায়ী। তখনও ‘ছোটা-মোটা গুন্ডা’ই ছিলেন রবি।

এরপর তিনি ছোটা রাজনের সাথে যোগ দিয়ে নব্বই দশকের শেষ ভাগে দুবাই চলে যান। হোটেল মালিক ও বিল্ডারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেন। তবে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের আলাদা নাম করতে চাইতেন রবি। প্রায় এক যুগ আগে তিনি রাজনের সাথে ছাড়াছাড়ি করেন। এরপর থেকেই তিনি নিজের আলাদা গ্যাঙ পরিচালনা করছেন।

সম্প্রতি (আগস্ট, ২০১৮) এক এসএমএসে তিনি ছাত্রীনেত্রী শেহলা রশিদ শোরাকে হত্যার হুমকি দেন। নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে রবির বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন শোরা। হত্যার হুমকি দেওয়া অবশ্য তার জন্য নতুন কিছু নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল অবধি তিনি এমন হুমকি ফিল্মি দুনিয়ার শাহরুখ খান, সালমান খান, অক্ষয় কুমার, করণ জোহর রাকেশ রোশনদেরও দিয়েছেন।

রবি অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্টধারী। নিজের অপরাধ সংঘ তিনি অস্ট্রেলিয়া থেকেই পরিচালনা করেন বলে জানায় সিডনি মর্নিং হেরাল্ড। তবে, অস্ট্রেলিয়ায় তার সঠিক অবস্থান কেউ জানে না।

– ডেইলি নিউজ অ্যানালাইসিস (ডিএনএ)-এ প্রকাশি ‘দ্য ফল অব দ্য আন্ডারওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনের ছায়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।