সাদামাটা এক বাঙালির ভারতবর্ষ কাঁপানোর গল্প

‘শালা মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে!’ – এক যুগ আগে এই সংলাপটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, বিশেষ করে কিশোর বয়সী ছেলেরা এই সংলাপ নিয়ে বেশ মজা করত। সংলাপটি ছিল জনপ্রিয় বাংলা ছবি ‘মিনিষ্টার ফাটাকেষ্ট’ ছবির। এই ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে দুই বাংলার ‘ফাটাকেষ্ট’ হয়ে পড়েন মিঠুন চক্রবর্তী।

শিশু কিংবা বৃদ্ধ সবার কাছেই তিনি অতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ছবিটা এতই জনপ্রিয় হয়েছিল, পরে এটার সিক্যুয়েল ও বের হয়। এই ছবি দুটি ছাড়াও বারুদ, রাজা বাবু, গুরু, তুলকালাম,যুদ্ধ এই ছবি গুলো দিয়ে মধ্য বয়সী নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী দুই বাংলায় নতুন রুপে পরিচিত হতে লাগলেন, ব্যক্তিগত ভাবে মিঠুন চক্রবর্তীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় এই ছবিগুলো দিয়েই।

বাংলাদেশের গ্রাম বা মফস্বলে মিঠুন চক্রবর্তীর জনপ্রিয়তা এইসব ছবি দিয়েই। এই ছবিগুলো দিয়ে বাণিজ্যিক সফল নায়ক হিসেবে পরিচিতি পেলেও, এছাড়া রয়েছে বেশ কিছু ভালো বাংলা সিনেমা রয়েছে। মিঠুনকে একজন পরিনত অভিনেতা বানানো সেসব ছবির মধ্যে প্রথমেই আসে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘তাহাদের কথা’ সিনেমাটি। এই ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য ১৯৯২ সালে জাতীয় পুরস্কারও অর্জন করেন।

এছাড়া ত্রয়ী, কালপুরুষ, তিতলি, শুকনো লংকা, আমি সুভাষ বলছি, নোবেল চোর, এক নদীর গল্প,নকশাল ছবিগুলোর সৌজন্যতায় তিনি হয়েছেন বাংলা সিনেমার এক প্রখ্যাত অভিনেতা। উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করেছেন ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ ছবিতে। মনমোহিনী শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে রোমান্স করে গেয়েছেন ‘আধো আলো’ ছায়াতে!

একবার শুনেছিলাম মিঠুন সাহেব সত্তরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেখতে অতটা সুদর্শন ছিলেন না বলে পরিচালকরা ফিরিয়ে দেন। পরবর্তীতে বরিশালের ছেলে মিঠুন কাজ করেছেন বাংলাদেশেও। শক্তি সামন্তের যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘অবিচার’ এ অভিনয় করে তখন বেশ আলোচিত হয়েছেন। এই ছবিতে চিত্রনায়িকা রোজিনা তাঁর হাত ছাড়তে চাননি, কিংবা আবেদনময়ী নায়িকা নূতন তাঁর কাঁচা যৌবন পাকতে দেন নি।এই ছবির প্রায় দুই যুগ পর আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ছবিতে অভিনয় করেন।

এই তো গেল বাংলা ছবির ফাটাকেষ্টর কথা, হিন্দিতে তিনি অন্য নামে পরিচিত। সেইখানে তিনি ‘ডিসকো ড্যান্সার’। এই ছবি দিয়ে তিনি বলিউডে নাচের জগতে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেন, হয়ে যান সেই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। তবে শুরুটা মসৃন ছিল না, নকশাল আন্দোলনের কারণে কলকাতা ছেড়ে পাড়ি জমান মুম্বাইয়ে। সেইখানে অর্থকষ্টে পড়ে অভাবে দিন কাটিয়েছেন, থেকেছেন অন্যের বাড়িতে।

একদিন কৌতুহলে ভর্তি হন পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে। সেখানেই তিনি নজরে পড়েন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃনাল সেনের। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাঁওতালদের সংগ্রামী জীবন নিয়ে নির্মিত মৃনাল সেনের হিন্দি ছবিতে ‘মৃগয়া’ (১৯৭৬) তে নায়ক চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন মিঠুন। প্রথম ছবিতেই বাজিমাৎ, অর্জন করেন জাতীয় পুরস্কার।

প্রথম ছবিতেই জাতীয় পুরস্কার, যেটা ভারতীয় সিনেমা জগতের ইতিহাসে বিরল। কিন্তু দেখতে সুদর্শন না হওয়ায় ছবির অফার আসছিল না, যাও  ক‘টা এসেছিল সেগুলি ছিল সহ চরিত্রের। দিনকাল বেশ খারাপই যাচ্ছিল, তখন জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্তি এক সাংবাদিক সাক্ষাতকার নিতে চাইলে তিনি বলেন, ভরপেট খাওয়ালে তিনি সাক্ষাৎকার দিবেন, কারন তাঁর পেটে ভীষন ক্ষুধা।

সেদিনের সেই ক্ষুধার্ত অভিনেতা নিজের একাগ্রতা,পরিশ্রম ও আত্ববিশ্বাসে পরবর্তীতে জীতেন্দ্র, অমিতাভদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ক্যারিয়ারে রয়েছে গুন্ডা,কালিয়া,কর্মযুদ্ধ,প্রেম প্রতিজ্ঞা,অগ্নিপথ,জল্লাদ,হাম পাঁচের মত জনপ্রিয় ছবি।বহু পুরুষ যাকে হৃদয় দিয়ে বসেছিল,সেই সুপারস্টার শ্রীদেবী মিঠুনের কাছে নিজের হৃদয় সর্মপিত করেছিলেন, যদিও সেটার সুন্দর সমাপ্তি ঘটেনি।

নব্বইয়ে এসে খল চরিত্রে ও তিনি অনবদ্য ছিলেন।সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে স্বামী বিবেকানন্দ ছবি দিয়ে সেরা সহ অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান। অগ্নিপথ ও জল্লাদের জন্য পান সেরা পার্শ্ব ও খল অভিনেতার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।তবে কাজের ক্ষেত্রে তিনি অতটা সুনির্বাচন করতে পারতেন না,তাই ক্যারিয়ারে বেশ দুর্বল ছবি আছে।সুপারহিট ছবি যেমন আছে, তেমন বহু সুপারফ্লপ ছবিও আছে।

বেশ কয়েক বছর সর্বোচ্চ সংখ্যাক ছবি মুক্তি পেয়েছিল তাঁর। গত দুই দশকে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে বলিউডে কাজ করেছেন। হাউজফুল ২, বীর, গুরু, ওমাইগড, কিক, হাওয়াইজাদাসহ বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করতে দেখা গেছে এই অভিনেতাকে।

রাজনীতিতে জড়িয়েছিলেন,আবার ছেড়েও দিয়েছেন। মনের কোন এক অভিমানে বাংলা ছেড়ে এখন স্ত্রী সাবেক নায়িকা যোগিতা বালী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন। সন্তানরাও চলচ্চিত্রে থিতু হতে চেয়েছিলেন,কিন্তু সফল হননি। রিয়েলিটি শো এর বিচারক, উপস্থাপক হয়েছেন। দাদাগিরির উপস্থাপনায় সাড়া জাগাতে না পারলেও, নিজের জীবনের পরিশ্রম, একাগ্রতার বর্ণনা করেছেন নির্দ্বিধায় এই অনুষ্ঠানে, উঠে এসেছিল অনেক অজানা কাহিনী।

১৯৫০ সালের ১৬ জুন জন্মগ্রহণ করেন তিনি। অসংখ্যবার তাঁর মৃত্যুর গুজব উঠেছে। তিনি ফিরে এসেছেন প্রতাপের সাথেই। কিংবদন্তীতুল্য এই অভিনেতা আজো রাষ্ট্রীয় ভাবে পুরস্কৃত হননি। বিষয়টা যথেষ্ট হতাশাজনক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।