বাংলা নাটকের বিবর্তন: বিটিভির প্যাকেজ যুগ থেকে একুশে টিভি

বিটিভির মানসম্মত নাটকের পাশাপাশি ৯০ দশকে সেই একই রকম সেট আর স্বল্প বাজেটের নির্মানে দর্শক যখন ক্লান্ত তখন ১৯৯৫ সালে আসে প্যাকেজ নাটকের ধারণা। বাজেট বাড়লো, গল্পে বৈচিত্র আসলো, লোকেশনে নতুনত্ব।

সব মিলিয়ে প্যাকেজ নাটক হয়ে উঠলো বাংলাদেশের মানুষের প্রধান বিনোদন। ঠিক সেসময়ে বাংলা সিনেমায় শুরু হয় অশ্লীলতার ভয়াবহতা। হলে যেয়ে সিনেমা দেখা বাঙালির বিনোদনের প্রতীক হয়ে উঠলো বোকাবাক্স।

৯০ দশকের ওই সময়টা ছিল অদ্ভুত। তখন মানুষের সামাজিকতার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ছিলনা। মানুষ ঘরে বসে গল্প করতে করতে টিভি দেখতো। একেকজন একেক দিকে স্মার্টফোনে মুখ গুজে থাকতো না।

মানুষ তখন চাকচিক্যের চেয়ে স্বস্তি খুঁজতো বেশি। পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার ছিল। সুস্থ বিনোদন চাইতো সবাই। সেইসময় এখনকার মত ভয়ংকর জ্যাম ছিলনা। অফিস বা ক্লাস শেষে সবাই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতো।

‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ে

টিভির অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষা করতো সবাই। আর সেটা দেখার পর পরের দিন অফিস বা ক্লাসে গিয়ে তা নিয়ে আড্ডা। এক হুমায়ুন আহমেদ বা হানিফ সংকেতের নাটক নিয়ে কত আলোচনা। নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি বিদ্যুৎ চলে যাবে কিনা তা নিয়ে টেনশন থাকতো। না থেকে উপায় নেই, কোনো পুন:প্রচারের ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে!

কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে কোনো নাটকের এপিসোড মিস হয়ে গেলে শুধু আফসোস। আর পরের দিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প শুনে নেয়ার অনুভুতি আজকের প্রজন্ম হয়ত বুঝবেনা।

সেসময় হুমায়ূন আহমেদ, অরুণ চৌধুরী, কায়েস চৌধুরী, ফেরদৌস হাসান, মোহন খান, মামুনুর রশীদ, আব্দুল্লাহ আল মামুনরা নির্মাণ করেছেন একের পর এক নাটক। অন্যদিকে নাট্যকার হিসাবে ইমদাদুল হক মিলন, প্রনব ভট্ট, মাসুম রেজারা ছিলেন চাহিদার শীর্ষে।

৯০ দশকের উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে এক ঘন্টার নাটক হিসাবে জনপ্রিয়তা পায় তৌকির-বিপাশার ‘প্রিয়জন’, তৌকির-শমী কায়সারের ‘কুসুম’, আজিজুল হাকি-শমীর ‘নাটের গুরু’ কিংবা নির্মানের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত প্যাকেজ যুগের প্রথম টেলিফিল্ম আজ নিতুর বিয়ে পায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা। জাহিদ-শমির ‘গাঙচিল ভালবাসা’য় দেখা যায় লোকেশনের দারুণ ব্যবহার।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম টেলিফিল্ম ‘আড়াল’-এ মৌসুমী-তৌকির।

ধারাবাহিক এর মধ্যে জনপ্রিয়তা পায় কায়েস চৌধুরীর ‘না’, অরুণ চৌধুরীর ‘ছোট ছোট ঢেউ’, শায়ের চৌধুরীর ‘ভোলার ডায়রি’, হুমায়ূন আহমেদের ‘সবুজ সাথী’, মামুনুর রশীদের ‘সুন্দরী’র মত নাটক। সেই সময়ই মোহাম্মদ হোসেন জেমীর বানানো ‘দমন’ বা ‘লোহার চুড়ি’র মত স্টাইলিশ থ্রিলার ধারাবাহিক। যা এখনো বেঞ্চমার্ক হিসাবে ধরা যায় দর্শক অপেক্ষা করতেন হানিফ সংকেত, হুমায়ূন আহমেদের নাটকের জন্য। প্যাকেজের কল্যানেই তারকা হিসাবে পাই আমরা মানসম্মত নাটক।

প্যাকেজের আওতায় হুমায়ুন আহমেদের নক্ষত্রের রাত বা আজ রবিবারের মত নাটক পাই আমরা৷ পাশাপাশি হানিফ সংকেতের ‘পুত্রদায়’-এর মত নাটক। আরো জনপ্রিয়তা পায় অনন্ত হীরার ‘বিষকাটা’ বা ভারতীয় নির্মাতা রিঙ্গোর ‘স্বপ্ন’ বা ‘আরিয়ানা’র মত ঝকঝকে টেলিফিল্ম। যা দর্শক রূচি তৈরিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। সেসময় নতুন তারকার উত্থান ও ঘটে।

যেমন তৌকির, বিপাশা, শহীদুজ্জামান সেলিম, জাহিদ হাসান, শমী কায়সার, আফসানা মিমি প্রমুখ শিল্পিরা তারকা খ্যাতি পান। এইসব বড় তারকার পাশাপাশি টনি ডায়েস, তাজিন আহমেদ, সুইটি, তানিয়ারাও সমানে কাজ করেছেন। আবার মঞ্চ মাতানো দুর্দান্ত অভিনেতাদের মধ্যে ফজলুর রহমান বাবু, আজাদ আবুল কালামরা ছোট পর্দায় মন্ত্রমুগ্ধ করেন দর্শকদের।

তৌকির-বিপাশা যেন ৯০ এর ছেলেমেয়েদের প্রেম শেখানোর কারিগর। তাঁরা ছিলেন স্বপ্নের জুটি। কিংবা জাহিদ হাসানের কমিক টাইমিংয়ে হাসির ঝড় উঠতো। সে সময় সাধারণত সোমবার একক ও বৃহস্পতিবার ধারাবাহিক নাটক প্রচারিত হতো। ৯০ দশকের শেষে ড্রইংরুম বিনোদনে এক পশলা বৃষ্টির মত এলো একুশে টিভি।

একুশে টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক বন্ধন

বড় বাজেট, বড় আয়োজনের একের পর এক নাটক তাক লাগায়। ডিশ এন্টেনা তখন বিস্তার লাভ শুরু করলেও একুশের প্রভাব ছিল অন্যরকম। গ্রামের গল্প সালাউদ্দিন লাভলুর ‘বন্ধুবরেষু’ বা গিয়াসউদ্দীন সেলিমের শহুরে গল্প নিয়ে ‘বিপ্রতীপ’ সব ধরনের দর্শকের মন জয় করে। একুশে টিভিতেই প্রচার হয় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী’র ‘সুচরিতাসু’, প্র‍য়াত আহির আলমের ‘প্রেত’, অমিতাভ রেজার ‘অপেক্ষায় বৃষ্টি’ ও ‘একটি গোল্ডফিশের অপমৃত্যু’র মত নাটক।

একুশের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠা পান মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, গিয়াসউদ্দীন সেলিম, নুরুল আলম আতিক বা অমিতাভ রেজার মত নির্মাতা যারা পরবর্তিতে রাজত্ব করেছেন এদেশের বিনোদন জগতে। নাট্যকার বা চিত্রনাট্যকার হিসাবে উত্থান হয় আনিসুল হক, পান্থ শাহরিয়ারদের।

একুশের আরেকটি নাটকের কথা না বললেই নয়, সেটি হল ধারাবাহিক ‘বন্ধন’। আফসানা মিমির এই নাটকটি সেসময় ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। জাহিদ হাসান, আবুল হায়াত, আজাদ কালাম, মিমির মত তারকাদের অভিনিত নাটকটি নিয়ে দর্শক হাইপ ছিল ব্যাপক। সেসময় আসলে সব মিলিয়ে মানুষ সুস্থ বিনোদনেই মনযোগী ছিল তাই এত সফল হয়েছিল একুশে।

সেই সময় থেকেই বাংলা নাটকে নতুন চিন্তার উত্থান। যা পরবর্তীতে নতুন মোড় নিয়েছে, কখনো মুখ থুবড়েও পরেছে। সে গল্প আরেকদিন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।