রিল দুনিয়ার চিরসবুজ পথিক

তিনি নায়ক, গায়ক, প্রযোজক পরিচালক। সব মাধ্যমেই ছড়িয়েছেন দ্যূতি। শুধু অভিনয় দিয়েই নয়, নিজের শারীরিক গড়ন, চলন, ফ্যাশন সচেতনতা, সৌন্দর্য দিয়ে তিনি দর্শকদের কাছ থেকে পেয়েছেন চিরসবুজের খেতাব। চলচ্চিত্রে তিনি একের পর এক দারুণ চরিত্র করে দর্শকনন্দিত হয়েছেন। ‘আগুনের দিন শেষ হবে একদিন’ বা ‘তুমি আমার কত চেনা গান’ শুনলেই যে সুদর্শন নায়কের চেহারা ভেসে আসে। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা জনপ্রিয় নায়ক আলমগীর।

বাবা কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর অন্যতম প্রযোজক। শিশুশিল্পী হিসেবে নিজেও করেছেন অভিনয়। তাই ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রজগতের সাথে পরিচয় আছে আলমগীরের। নায়ক হিসেবে প্রথম অভিনয় আলমগীর কুমকুমের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আমার জন্মভূমি’তে। প্রথম সিনেমাই মুক্তিযুদ্ধের, সাথে সহশিল্পী কালজয়ী জুটি রাজ্জাক-কবরী।

নিজের প্রতিভার আলো প্রথম ছবিতেই বেশ ছড়িয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পরবর্তী এক দশক ছিল শুধুই হতাশা আর নিজেকে প্রমাণ করার সময়। সমসাময়িকরা যেখানে পেয়ে যাচ্ছেন মহাতারকার খেতাব, সেখানে তিনি তখনো দর্শকমহলে এককভাবে গ্রহনযোগ্যতাই পাননি।

১৯৮০ সালে এসে দিলীপ বিশ্বাসের তারকাবহুল ছবি ‘জিঞ্জির’ ও আমজাদ হোসেনের ‘কসাই’ এই ছবি দুটি ক্যারিয়ারে অন্যমাত্রা আনলেও, মাহেন্দ্রক্ষন আসে ১৯৮২ সালে সুভাষ দত্তের সুপারহিট ছবি ‘সবুজ সাথী’ ছবি দিয়ে। এরপর আমজাদ হোসেনের বিখ্যাত ছবি ‘ভাত দে’ করার পর দর্শকমহলে নতুনভাবে আলোচনায় আসেন তিনি।

বুলবুল আহমেদের সাথে

তাঁর ক্যারিয়ারে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম মালেক আফসারীর ‘ক্ষতিপূরণ’। থ্রিলার ধাঁচের এই ছবিতে একজন পোড় খাওয়া চিত্রশিল্পীর ভূমিকায় দুর্দান্ত অভিনয় এখনো দর্শকদের মনে গেঁথে আছে। এছাড়া কাজী হায়াতের ‘দেশপ্রেমিক’ ছবিতে একজন একজন চিত্রপরিচালকের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় ছবিটিকে করে প্রাণবন্ত।

এই দুই সিনেমাতেই তিনি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়া সখিনার যুদ্ধ, মা ও ছেলে, মান সম্মান, গীত, অপেক্ষা, সত্য মিথ্যা, ব্যাথার দান, দোলনা, ঘরের বউ, গরিবের বউ, জীবনধারা, সান্ত্বনা, পিতা মাতা সন্তান, ক্ষমা, শিল্পী, বাংলার বধূ, স্ত্রীর মর্যাদাসহ বেশ কিছু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র দিয়ে তিনি হয়ে পড়েন বাংলা চলচ্চিত্রের শীর্ষনায়কদের একজন।

বিউটিকুইন ববিতার সাথে আলমগীর

খল চরিত্রেও নিজেকে মেলে ধরেছিলেন পোকা মাকড়ের ঘর বসতি, রানী কুঠির বাকী ইতিহাস ছবিতে। নারগিস আক্তারের ‘চার সতীনের ঘর’ ছবিতে চারজন নায়িকা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিষ্প্রভ হয়ে যাননি। কয়েক বছর আগেও দেলোয়ার জাহান ঝন্টুর ‘হেডমাস্টার’ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন।

পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি ১৯৮৬ সালের ছবি ‘নিষ্পাপ’। নির্মাতা হিসেবে প্রথম ছবিতেই সফল, এই ছবিতে তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি গায়করুপেও আবির্ভূত হন। এই ছবিটিও ক্যারিয়ার গতিশীল করতে বেশ সাহায্য করে। পরবর্তীতে তিনি বৌমা ও নির্মম এই ছবি দুটি পরিচালনা করেন। এছাড়া মায়ের দোয়া সহ বেশ সংখ্যক ছবি প্রযোজনা করেন।

আলমগীরে পাশে প্রথম কন্যা আঁখি। সাথে বাকি দুই কন্যা ও প্রথম স্ত্রী খোশনূর।

নব্বই দশক ও পরবর্তী সময়ে সত্যের মৃত্যু নেই, মায়ের অধিকার, সুখের ঘরে দু:খের আগুন, মিলন হবে কত দিনে, লাট সাহেবের মেয়ে, আমি সেই মেয়ে, বাপের টাকা, শেষ বংশধর, টাকাসহ বেশকিছু চলচ্চিত্রে চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও পেয়েছেন দারুন সাফল্য। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় বাবাও তিনি।

বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা অভিনেত্রী শাবানার ক্যারিয়ার বর্ণাঢ্যময় হয়েছিল আলমগীরের সাথে জুটি বেঁধেছিলেন বলেই। জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা রোজিনা সেই সোনালী সময়ের মত এখনো আলমগীরের সাথে জুটি বেঁধে অভিনয় করতে চান। বহু দর্শক যার গান শুনে বিমুগ্ধ হয়েছিল সেই কিংবদন্তি রুনা লায়লার পর্দার নায়ক থেকে জীবনের নায়ক হয়েছেন এই আলমগীর।

চম্পা, দিতির বিপরীতে যেমন অভিনয় করেছেন নায়ক আলমগীর, তেমন তাদের বাবা হয়েও এসেছেন চলচ্চিত্রের পর্দায়। ক্যারিয়ারের সুবর্ণ সময়েই রাইসুল ইসলাম আসাদ, জাফর ইকবালদের বাবা হয়েছেন। সমসাময়িকদের মত গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে পার্শ্ব চরিত্রে বা অশ্লীল ছবিতে অভিনয় করেন নি।

চিত্রনায়ক আলমগীর তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারে পেয়েছেন সর্বাধিক নয়টি জাতীয় পুরস্কার, একাধিক বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন। জুরি বোর্ডের সদস্য ও হয়েছেন। তবে বছর কয়েক আগে জুরি বোর্ডের সদস্য থাকাকালীন পুরস্কৃত হওয়ায় সমালোচিত হয়েছিলেন।

কন্যা ও গায়িকা আঁখি আলমগীরের সাথে।

অনেক বছর বিরতি দিয়ে তিনি আবার এসেছেন নির্মানে। ছবির নাম ‘একটি সিনেমার গল্প’। প্রথমদিকে আশা জাগানিয়া হলেও শেষ অবধি একটি হতাশাজনক ছবি হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়েছে এটা।

গায়ক হিসেবেও নাম কুড়িয়েছেন আলমগীর। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেছেন। ‘আগুনের আলো’ সিনেমায় তিনি প্রথম কণ্ঠ দেন। ‘কার পাপে’, ‘ঝুমকা’ ও ‘নির্দোষ’ চলচ্চিত্রেও তিনি গান গেয়েছেন।

সুখী দম্পতি

১৯৭৩ সালে তিনি প্রথম বিয়ে করেন। স্ত্রী কবি ও সাহিত্যিক জোবেদা খাতুনের মেয়ে খোশনূর আলমগীর, তিনি নিজেও ছিলেন গীতিকার। তাঁদের কন্যা কণ্ঠশিল্পী আঁখি আলমগীর। ১৯৯৯ সালে আলমগীর বিয়ে করেন কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লাকে। দুই ভবনের দুই কিংবদন্তির সংসারটা সুখেই কাটছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।