শাম্মি কাপুর: উপমহাদেশের এলভিস প্রিসলি

চকলেট বয়সুলভ চেহারা ও প্রতিভা দিয়ে ষাট ও সত্তর দশকে রাজত্ব করে গেছেন শাম্মি কাপুর। এই অভিনেতা ১৯৫৩ সালে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন ‘জীবন জ্যোতি’ সিনেমা দিয়ে। তবে, সিনেমাটি বক্স অফিসে খুব বাজে ভাবে ব্যর্থ হয়।

এখান থেকেই কাপুর পরিবারের এই রত্নের লড়াইয়ের সূচনা হয়। সেই লড়াই চলে চার বছর ধরে। এরপর ‘তুমসা নেহি দেখা’ সিনেমাটি তাঁর ক্যারিয়ারের গ্রাফ পাল্টে দেয়। ওই সময়ে তিনি রাতারাতি বলিউডের নতুন সেনসেশনে পরিণত হন। ফ্যান-ফলোয়িংও যথেষ্ট মাত্রায় বাড়তে থাকে। সেই সময়টাতে তিনি ছিলেন উপমহাদেশের এলভিস প্রিসলি।

শাম্মির সাফল্য সেখানেই থেমে ছিল না। এটা ছিল কেবল সূচনা। কালক্রমে শাম্মি প্রমাণ করতেন বলিউডে থাকতেই এসেছেন তিনি। একে একে ‘দিল দেকে দেখো’, ‘সিঙ্গাপুর’, ‘জঙলি’, ‘কলেজ গার্ল’, ‘প্রফেসর’, ‘চায়না টাউন’, ‘প্যায়ার কিয়া তো ডারনা ক্যায়া’র মত কালজয়ী ও ব্লকবাস্টার সিনেমা উপহার দিতে থাকেন তিনি।

১৯৬১ সালে ‘জঙলি’ সিনেমার সাফল্যের জের ধরে ওই দশকটাকেই রঙিন করে তুলেছিলেন শাম্মি কাপুর। ষাটের দশকে শাম্মির বাজিমাতের পেছনে বড় কারণ হল গান। আকর্ষণীয় ও সুরেলা সব গান এই সময় তাঁর সিনেমাগুলোতে দেখা যেত। এর মধ্যে ‘সুকু সুকু’, ‘ও হাসিনা জুলফো ওয়ালি’, ‘আজ কাল তেরে মেরে প্যায়ার কে চার্চে’. ‘আজা আজা ম্যায় হু প্যায়ার তেরা’ – ইত্যাদি গানগুলোর কথা না বললেই না।

এখনো বলিউডের ইতিহাসে সেরা গানগুলো সংক্ষিপ্ত তালিকা করলে তাতে শাম্মির সিনেমার একাধিক গান কোনো বিতর্ক ছাড়াই জায়গা করে নেবে। আরেকটা আকর্ষণীয় দিক ছিল শাম্মির নাচ ও ব্যক্তিত্ব। অনেকে এগুলোর কল্যানেই গানগুলো এতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

একালের মত সেকালেও সমালোচকদের অভাব ছিল না। ‘কাশ্মির কি কালি’, ‘রাজকুমার’, ‘জানওয়ার’, ‘অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস’ -এর মত হালকা চালের সিনেমা সাফল্য পাওয়ার পর একদল লোক বলাবলি শুরু করেছিল যে, শাম্মিকে দিয়ে নাকি সিরিয়াস কোনো চরিত্র হবে না।

শাম্মি মুখে কিছু বলেননি। শুধু ‘জঙলি’, ‘বাত্তামিজ’, ‘ব্লাফমাস্টার’ ‘পাগলা কাহি কা’, ‘তিসরি মঞ্জিল’ ও ‘ব্রহ্মচারী’ সিনেমাগুলো দিয়ে সকল সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন প্রতাপের সাথে।

অনেক নায়িকাই তরুণ বয়সে নিজেদের বিপরীতে পেয়েছেন শাম্মি কাপুরকে। আর কালক্রমে সেই নায়িকারা নিজেদের নিয়ে যেতে পেরেছেন কিংবদন্তি অভিনেত্রীর কাঁতারে। এর মধ্যে আছেন সায়রা বানু, আশা পারেখ ও শর্মিলা ঠাকুররা।

কেন্দ্রীয় চরিত্রে শাম্মি কাপুরের শেষ সিনেমা ১৯৭১ সালের ‘আন্দাজ’। সত্তরের দশকের শুরুতেই অনেক বেশি ওজন বাড়তে শুরু করে শাম্মি কাপুরের। আর সেটাই নায়ক হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ারের যবনিকা পতন ঘটায়।

যদিও পরবর্তীতে পার্শ্ব চরিত্রে ‘বিধাতা’, ‘হিরো’ ও ‘প্রেম রোগ’এর মত সিনেমায় অভিনেতা হিসেবে কাজ করে আবারো নিজের জাত চেনান শাম্মি। সব মিলিয়ে কেন্দ্রী চরিত্রে ৫০ টিরও বেশি ও পার্শ্বচরিত্রে ২০ টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

১৯৬৮ সালে ‘ব্রহ্মচারী’ সিনেমার জন্য শাম্মি ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জয় করেন। ‘বিধাতা’র জন্য ১৯৮২ সালে পার্শ্বচরিত্রে পান ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ১৯৯৫ সালে তিনি ভারতীয় সিনেমায় অবদান রাখার জন্য ফিল্মফেয়ারের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার পান।

অভিনয় জীবনের বাইরের একটা তথ্য দেই। শাম্মি হলেন ভারতের প্রথম দিককার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের একজন। তিনি। ইন্টারনেট ইউজার্স কমিউনিটি অব ইন্ডিয়ার (আইইউসিআই) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি।

শেষ বয়সের শাম্মি

শাম্মির জন্ম মুম্বাইয়ে, ১৯৩১ সালের ২১ অক্টোবর। মা রামশারনি কাপুর ও বাবা স্বনামধন্য অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুর। শাম্মি কাপুরের আসল নাম শমশের রাজ কাপুর। সিনেমার প্রয়োজনে নামটা হয়ে যায় শাম্মি কাপুর।

অভিনেতা হিসেবে শাম্মির শেষ কাজ ২০১১ সালের ‘রকস্টার’। সিনেমাটি ছিল তারই নাতি রণবীর কাপুরের আকাশচুম্বি খ্যাতি পাওয়ার মঞ্চ। রণবীর সেটা পেয়েছিলেনও। তবে, সেই খ্যাতির আলো দেখে যেতে পারেননি শাম্মি।

‘রকস্টার’ মুক্তি পায় ১১ নভেম্বর। এর আগেই ১৪ আগস্ট ভোরবেলা মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হসপিটালে জীবনের শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিভে যায় ভারতীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির আরেকটি প্রদীপ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।