১২ বছর ধরে নির্মিত একটি ‘অ্যাবসার্ড’ সিনেমা

কামরুজ্জামান কামু একটি সিনেমা বানিয়েছেন। সিনেমা বলছি এ কারণে- এতে বাংলাদেশের সেন্সরবোর্ডের একটি ছাড়পত্র আছে। তা না থাকলে এটাকে সিনেমা বলতে আমার কুন্ঠা হত। আমি সিনেমার বিশেষজ্ঞ নই। কী কারণে টেলিফিল্ম আর সিনেমা আলাদা সেটার টেকনিক্যাল ব্যাখ্যা জানা নেই। কিন্তু অনেক সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে একটা দেখার চোখ তৈরি হয়েছে। সেই চোখ আমাকে কোন ভালো অভিজ্ঞতা দেয় নি।

সিনেমার দুটি অংশ। প্রথম অংশটি সরল, স্বাভাবিক, এবং চলনসই। খারাপ লাগছিলো না দেখতে। কামু তার প্রেমিকার সাথে হলে বসে বাংলা সিনেমা দেখছে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে বসে তার জন্যে একটি সিনেমা বানিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রূতি করছে, বেশ সম্ভাবনাময় শুরু ছিলো, সবদিক থেকেই। চিত্রায়ন যথেষ্ট ভালো ছিলো। সিনেমা সিনেমাই লাগছিলো।

এরপরে কাহিনী অবশ্য একরৈখিক থাকে নি। সিনেমার মধ্যে সিনেমা ঢুকে যায়, কল্পনার মধ্যে কল্পনা ঢুকে যায়। মোশাররফ করিম আর তানভিন সুইটি দম্পতি কখনও সিনেমার চরিত্র, আবার কখনও কামুর সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। মোশাররফ করিমের যার সাথে অবৈধ সম্পর্ক, সেই মেয়ের প্রেমিক কামুর কাছে পরামর্শের জন্যে আসছে, কামুও পরামর্শ দিচ্ছে তাকে, কিন্তু আদতে তাঁরা সবাই কামুর স্ক্রিপ্টের চরিত্র।

কামু ডুবে যাচ্ছেন, খেই হারিয়ে ফেলছেন কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে, এই দ্বন্দ্বমুখর পরিস্থতি খারাপ লাগছিলো না দেখতে। তবে সমস্যা যেটা ছিলো, তা হলো- কামু ছাড়া আর কারো মধ্যে সিনেমাটিক ম্যানারিজম পাই নি। কামু তাঁর সিনেমার সম্ভাব্য নায়িকার সাথে বসে বসে বিভিন্ন রকম উচ্চাঙ্গের সংলাপ দিচ্ছে, এই অংশগুলিই শুধুমাত্র ভিন্নমাত্রার ছিলো, কিন্তু বাকিদের দেখে মনে হয়েছে ফারুকীর ভাই-বেরাদর প্রজেক্টের কোন অংশ। যাই হোক, সেভাবে দেখতেও খারাপ লাগছিলো না, কিন্তু সমস্যা শুরু হলো ছবির দ্বিতীয়ার্ধে।

দ্বিতীয়ার্ধ অনেক উইয়ার্ড, অ্যাবসার্ড, সারররিয়েল। এ ধরণের ট্রিটমেন্ট দিতে সিদ্ধহস্ত পরিচালকেরা হলেন ফেলিনি, বুনুয়েল প্রমুখ। সিনেমা তৈরি নিয়ে সিনেমা তো ফেলিনিও করেছেন তাঁর ‘8 ½’-এ। কিন্তু কামু টেলিফিল্ম বানানোর যোগ্যতা নিয়ে তৈরি করতে চেয়েছেন পরাবাস্তব মাস্টারপিস ফিল্ম, তা কি হয় না কি!

একের পর এক চরিত্র আসতে থাকে, অদ্ভুত অদ্ভুত সব দৃশ্যকল্প তৈরি হতে থাকে, অবাস্তব সব ঘটনা ঘটতে থাকে, কিন্তু তাতে নেই কোন নান্দনিকতা, নেই কারিগরি উৎকর্ষ! কামুর কল্পনাশক্তি ভালো। তিনি প্লটটা ভালোই ভেবেছিলেন। সিনেমার চরিত্ররা বাস্তবে এসে বুঝিয়ে কেড়ে নিতে চায় স্বপ্ন, এতে যোগ দেয় প্রশাসন এবং মিডিয়া, একজন কবির নান্দনিক এবং সুন্দর পরিকল্পনা ক্রমশ কদর্য হতে থাকে। কিন্তু কবি কি অসুন্দরের দিকে যেতে পারে? যেখানে একটি ছোট্ট সুন্দর গ্রামে তাঁর জন্যে অপেক্ষা করে আছে পৃথিবীর সুন্দরতম মেয়েটি? একজন প্রকৃত শিল্পী কি এই ঘেরাটোপ থেকে বের হতে পারবে, নাকি শিল্পের আড়তদার হয়ে উঠবে?

এত সুন্দর একটি ভাবনা জঘন্যভাবে নষ্ট করার যতরকম চেষ্টা করা যায়, কামু তা করেছেন, এবং সফল হয়েছেন। পপি এবং মারজুক রাসেলের নাচ-গান আপনি আলাদাভাবে দেখেন, ভুলে যান এটা কোন সিনেমা, ভুলে যান এটি কোন কবির কাজ, আপনার কাছে একটা সস্তা মিউজিক ভিডিও ছাড়া কিছু মনে হবে না। এরকম নাচ গান আরো প্রদর্শিত হয়েছে, এবং সবগুলিই ছিলো দর্শকের জন্যে পীড়াদায়ক। ভায়োলেন্স যা দেখানো হয়েছে তা আমরা বলিউডের সি গ্রেডের মুভিতে দেখে থাকি। কামু অবশ্য এগুলি ঠাট্টার ছলে দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু একটা ভালো সিনেমাতে ইচ্ছাকৃতভাবে অপটু কাজ দেখানোরও একটা আর্ট আছে। কাইজাদ গুস্তাদের বোম্বে বয়েজ ছবিতে এর উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু কামু যা করেছেন, তা ছদ্ম-সি মুভি না হয়ে প্রকৃত অর্থেই সি-মুভি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিনেমার মিউজিক নিয়ে আমার সাধারণত কিছু বলার থাকে না। কিন্তু এই সিনেমার আবহ সঙ্গীত আমার কাছে নব্বই দশকের বিটিভির নাটকের মত লেগেছে, সিনেমার মত না।

আমার এক বন্ধু, যে কি না কামুরও বন্ধু, সে বলেছে এই সিনেমা দেখতে হলে কামুকে জানতে হবে, বুঝতে হবে, তাঁর সংগ্রামটা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আমার কথা হচ্ছে, তা কেন? আমার সাথে তো কামুর ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। আমার সময়ের দাম আছে। আমি দুই ঘন্টা ব্যয় করে এমন কিছু দেখতে চাইবো, যাতে সময়টা ভালো কাটে।

সিনেমার বেশ কয়েক জায়গায় শব্দ নেই। ১২ বছর ধরে একটা সিনেমা বানিয়ে যদি শব্দগ্রহণে এইরকম ত্রূটি থাকে, তাহলে কী বলার আছে!

সিনেমার সংলাপ অবশ্য খুব ভালো। অন্যরকম। কিন্তু শুধু সংলাপ দিয়ে তো আর সিনেমা হয় না! পুরো ছবিটা কামুময়। কামুর বন্ধুবান্ধবদের ভালোই লাগার কথা। কিন্তু, কোনো হলে বা ফেস্টিভালে দিলে বেইজ্জত হবার সম্ভাবনা আছে।

যারা বলছেন এ ধরণের কনসেপ্ট নিয়ে আগে বাংলাদেশে সিনেমা তৈরি হয় নি, তারা দয়া করে অমিত আশরাফের ‘উধাও’ দেখে নিয়েন।  আমার রেটিং ২/১০।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।