জুহি চাওলা ও সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্প

‘তুম হো আকেলে, হাম ভি আকেলে, মাজা আ রাহা হ্যায়, কাসাম সে…’

১৯৮৮ সাল। সুপারহিট সিনেমা ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তাক’ এর এই গানে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন অভিষিক্ত এক জুটি। দু’জনই কালক্রমে নিজেদের নন্দিত করেছেন। একজন যার নামেই প্রকাশ পায় তাঁর অর্জন।  তিনি আমির খান, বলিউডের মিস্টার পারফেকশনিস্ট।

আর আরেকজন বিখ্যাত তাঁর দুষ্ট-মিষ্টি হাসির জন্য। নিজের স্নিগ্ধতা ও অভিনয়গুণে দর্শকদের বিমোহিত করেছিলেন। তিনি হলেন বলিউডের সোনালী নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা জুহি চাওলা।

১৯৮৪ সালে মিস ইন্ডিয়া খেতাব পেয়েছিলেন। বিশ্ব সুন্দরীর মঞ্চেও গিয়েছিলেন। সেখানে জিততে না পারলেও তিনি সেরা ১০-এ জায়গা পান। শুধু তাই নয়, তিনি সেরা জাতীয় পোশাকের জন্য পুরস্কারও জিতেন। এরপর মনসুর আলী খানের ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তাক’ এর বিশাল সাফল্যে শুরুতেই বাজিমাৎ। রাতারাতি সাফল্যে হয়ে ওঠেন দর্শক-পরিচালকদের অন্যতম আস্থাভাজন নায়িকা।

এর ঠিক পরের বছরেই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে উপহার দেন সুপারহিট বাংলা সিনেমা ‘অমর প্রেম’। যশ চোপড়ার যুগান্তকারী সিনেমা ‘চাঁদনী’তে অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে যশ সাহেবেরই আরেক সাড়া জাগানো সিনেমা ‘ডর’-এ অভিনয় করে নিজের জনপ্রিয়তা আরো একধাপ বাড়িয়ে নেন।

পারিবারিক ধারার ‘স্বর্গ’ থেকে অ্যাকশন ধারার ‘বেনাম বাদশা’ – সব ছবিতেই হয়েছেন সফল। ‘বোল রাধা বোল’ ছিল ক্যারিয়ারে অন্যতম সংযোজন। তবে নিজের ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা ছবি অপেক্ষা করেছিল মহেশ ভাটের হাত ধরে। সঙ্গে সেই আমির খান। সিনেমার নাম ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’। অভিনয় ও জনপ্রিয়তার গুণে অর্জন করেছিলেন নিজের ক্যারিয়ারে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে একমাত্র ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। এর আগে একবার পেয়েছিলেন সেরা নবাগতার পুরস্কার। তারকাবহুল ‘ইশক’ ছবিটি ছিল ক্যারিয়ারের অন্যতম বাণিজ্যিক সফল সিনেমা।

শাহরুখ খানের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অন্যতম প্রভাবক হয়ে আছেন বন্ধু জুহি চাওলা। ‘রাজু বান হ্যায়া জেন্টলম্যান’ সিনেমার সেটে প্রথম দেখায় শাহরুখকে সেভাবে পছন্দ না করলেও এক সময় দু’জনই মধ্যে গড়ে উঠে ভালো বন্ধুত্ব ও জুটি। সেই সুবাদে ‘ডর’, ‘রামজানে’, ‘ইয়েস বস’-এর সাফল্যে দু’জনই গড়ে তোলেন নিজেদের প্রযোজনা সংস্থা।

সেই সংস্থার ই প্রথম সিনেমা ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’, এরপর ‘অশোকা’। প্রথম দুটো ফ্লপ হলেও তৃতীয় সিনেমা ‘চালতে চালতে’ বাণিজ্যিক সফল। শাহরুখও নিজের একক প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম ছবি ‘পাহেলি’ তে প্রিয় বন্ধুকে ডেকে নেন। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) মাঠেও দেখিয়েছেন বন্ধুত্বের নিদর্শন। শাহরুখের সাথে জুহিও কলকাতা নাইট রাইডার্সের একজন কর্ণধার। শাহরুখের ‘ওম শান্তি ওম’ এর পরেও জিরোতেও অতিথি শিল্পী হিসেবে আছেন জুহি।

আমির খান তাঁর বর্ণিল ক্যারিয়ারে বহু নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন। তবুও সবার আগে যার নাম আসবে সে জুহি চাওলা। একটা জনপ্রিয় জুটিও গড়ে উঠেছিল। তবে বিধিবাম! ‘ইশক’ সিনেমার সেটে মান-অভিমানে তাঁদেরকে আর একসাথে দেখা যায়নি।

প্রসেনজিতের বিপরীতে ‘আপন পর’ নামে আরেকটি সফল বাংলা সিনেমায় অভিনয় করেন। এছাড়া দক্ষিণী ভাষায় বেশ কিছু সিনেমাতেও অভিনয় করেন। নিজের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী নায়িকা মাধুরী দীক্ষিতের সঙ্গে অভিনয় করেছেন ‘গুলাব গ্যাঙ’ সিনেমাতে। ছবিটি ফ্লপ হলেও প্রশংসিত হয়েছিল তাঁর খল ইমেজের অভিনয়। এছাড়া তাঁর অভিনীত অন্যান্য সিনেমার মধ্যে ‘প্রতিবাদ’, ‘অর্জুন পন্ডিত’, ‘দিওয়ানে মাস্তানে’, ‘ভূতনাথ’, ‘ডুপ্লিকেট’, ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস খিলাড়ি’ অন্যতম।

জুহির ক্যারিয়ারটা আরো জমকালো হতে পারতো। তবে, তিনি স্রেফ বোঝাপড়ার ঘাটতির কারণে কয়েকটা চরিত্র হারিয়েছেন। যখন তিনি খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন তখন তাঁকে প্রযোজক যশ চোপড়া ১৯৯৭ সালের সিনেমা ‘দিল তো পাগাল হ্যায়’ সিনেমার নিশা চরিত্রটির জন্য প্রস্তাব করেন। তখনকার প্রতিদ্বন্দ্বী মাধুরীর সাথে দ্বিতীয় নায়িকা হিসেবে কাজ করতে আপত্তি জানান জুহি। পরে সিনেমাটির জন্য কারিশমা কাপুরকে প্রস্তাব করা হয়। কারিশমা বাজিমাৎ করেন। সেরা সহ-অভিনেত্রী হিসেবে জিতে নেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার।

ফলে, এই আক্ষেপটা জুহির আজীবনই থাকবে। তিনি বলেন, ‘ওটা কোনো বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত ছিল না।’ ১৯৯৮ সালের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘রাজা হিন্দুস্তানি’তেও কারিশমা কাপুর প্রথম পছন্দ ছিলেন না। এই চরিত্রটির জন্যও প্রথম প্রস্তাব এসেছিল জুহির কাছে। যদিও তিনি সেটা ফিরিয়ে দেন।

এক সাক্ষাৎকারে জুহি বলেন, ‘আপনি যখন আকাশে উড়তে থাকবেন, তখন আপনার মধ্যে অনেক রকম ইগো প্রবলেম দেখা দেবে। ইগোই তখন আপনার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আমার ভুল সিদ্ধান্তগুলো কারিশমার উপকার করেছে। ও রাতারাতি স্টার হয়ে উঠেছে।

জুহির ক্যারিয়ারের আরো একটা বড় ভুল হল সালমান খানে অরুচি। জুহি কখনোই আমির বা শাহরুখের মত কেন্দ্রীয় চরিত্রে ভাইজানের বিপরীতে কাজ করেননি। ১৯৯৭ সালের সিনেমা ‘দিওয়ানা মাস্তানা’ সিনেমায় জুহির সাথে সালমান ছিলেন অতিথি চরিত্রে।

সেবারই প্রথম ও শেষবারের মত পর্দায় সালমান-জুহিকে এক সাথে দেখা যায়। কেন এক সাথে এই জুটি কাজ করেননি? এই কারণটা অজানা। যদিও, ১৯৯২ সালে এক এক সাক্ষাৎকারে সালমান বলেছিলেন যে, একবার তিনি ‍জুহি চাওলাকে রীতিমত বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কে জানে, এটাই হয়তো সালমান ও জুহির মধ্যে দূরত্বের কারণ!

জুহির ক্যারিয়ারে আরো আক্ষেপ আছে। বলিউডে যখন তিনি অভিষিক্ত হন, তখন রাজত্ব করছিল হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সর্বসেরা দু’জন জনপ্রিয় নায়িকা। আবার কিছুদিন পরে নবীনদের আগমনে একটা সন্ধিক্ষনের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন। এছাড়া সিনেমা নির্বাচনেও কিছু ভুল করেছিলেন। সিনেমার নায়িকাদের একটা সময় বিরতি নিতে হয়, কিন্তু তিনি সেটা বুঝতেই পারেননি। বড় ভুলটা সম্ভবত এখানেই। প্রচুর পার্শ্ব চরিত্র করে গেছেন যেটা অনেক দর্শকই মেনে নিতে পারেননি।

তাঁর ক্যারিয়ারটাকে আসলে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্পের সাথে মিলিয়ে ফেলা যায়। না বুঝে এমন অনেক কিছুই তিনি করেছেন, যা আসলে তাঁর সাথে যায় না। ফলে, এত সাফল্যের পরও এখন আর কিংবদন্তিদের কাতারে খুব কমই উচ্চারিত হয় জুহির নাম।

এক নজরে জুহির ক্যারিয়ার

  • ব্লকবাস্টার – ১ টি
  • সুপারহিট – ১ টি
  • হিট – ৪ টি
  • সেমি হিট – ২ টি
  • অ্যাভারেজ – ৬ টি
  • ফ্লপ – ১২ টি
  • ডিজাস্টার – ১৬ টি
  • মোট সিনেমা – ৪২ টি

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।