দ্য বাইসাইকেল থিফ: আজো বড্ড বাস্তবিক এক সিনেমা

‘উড়তে শেখা পাখি গল্পটা আকাশ দেখার আগেই শেষ

বদলে যাওয়া ভাগ্যরেখায় এটাই তো ছিল অবশেষ’

কোন একটা বাংলা নাটকের গান এটি। আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য পাখিই রয়েছে যাদের ইচ্ছের ডানা কেটে যায় ভোরের প্রথম প্রহরেই। কেউ কেউ মুষড়ে পড়ে, কেউবা ঝেড়ে কাশে, কেউ আবার কিছু বুঝে উঠার আগেই বদলে যায় দৃশ্যপট। জীবন এমনই। কখনো উজাড় করে বর দিবে, আবার আশার আলো নিভিয়ে দেবে দপ করেই!

‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ বা ‘সাইকেল চোর’। ৭০ বছর পরেও যেটি বড্ড বাস্তবিক এক সিনেমা। চুরি, প্রশাসনের আলসেমি, সমাজ ব্যবস্থা, দারিদ্রতা, বেকারত্ব সবমিলিয়ে বর্তমানেরই আয়না যেন ৯ জন লেখকের সম্মিলিত এই চিত্রনাট্য!

চোরেরা বড্ড বেরসিক হয়। অন্যের বাড়া ভাতে ছাঁই দিতে তারা বেশ পারঙ্গম। তারাও অবশ্য নিয়তির নির্মমতারই শিকার। ‘দ্য বাইসাইকেল থিফ’ সিনেমায় আপনি উপলব্ধি করবেন ঠিক এহেন সত্যটুকুই যার পরতে পরতে রয়েছে হাহাকার, ভেজাতে গিয়েও দমিয়ে রাখা অগুণণ নির্লিপ্ত চোখ। উপলব্ধি করবেন, জীবন পুষ্পশয্যা নয়! ওই যে স্কুল লাইফে প্রেজ অ্যান্ড ইডিয়মসে পড়তাম, ‘লাইফ ইজ নট এ বেড অব রোজেস’! এখানেও একদম তাই!

সাল ১৯৪৮। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ধ্বংসস্তুপে পতিত মানুষগুলি একটু একটু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাঁচতে হবে, কিন্তু জোগান নেই। ইতালিয়ান সরকার বেকারদের কর্মসংস্থান দিচ্ছে, সেখানেই ভাগ্যের শিঁকে ছিঁড়ে অ্যান্তোনিও রিচি নামক দুই পুত্রসন্তানের জনকের। কাজটা শহরে শহরে ঘুরে বিজ্ঞাপনের পোস্টার লাগানোর।

একনজরে দ্য বাইসাইকেল থিফ (ইতালি, ১৯৪৮)

  • পরিচালনা: ভিট্টোরিও ডি সিকা
  • আইএমডিবি রেটিং: ৮.৪
  • রটেন টম্যাটোস: ৯৮%
  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইতালির সর্বশ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে গণ্য করা হয়।
  • ১৯৯৮ সালে করা এক জরিপে সর্বকালের সেরা সিনেমার তালিকায় ষষ্ঠ স্থান পায় এটি।
  • সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে হালের অনুরাগ কাশ্যপসহ বহু পরিচালকের অনুপ্রেরণা এই ছবি।

কাজের শর্ত একটিই, সাইকেল থাকতে হবে অবশ্যই। রিচিরও সাইকেল ছিল তবে যুদ্ধের সময় তা বন্ধক দিয়েছিল। এগিয়ে আসে সহধর্মিনী মারিয়া রিচি। ঘরের যাবতীয় বেডশীট, ইয়েস বেডশীট! বন্ধক রেখে বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয় ‘ফিদেস ১৯৩৫’ মডেলের সাইকেলটি। রিচিও পরদিন থেকে নেমে পড়েন কাজে। ভালো কাটছিল ক’টা দিন। সুখ কি আর বেশিদিন সয়? সাইকেলটা চুরি হয়ে গেল কর্মক্ষেত্র থেকেই!

তারপরের গল্পে আপনি যদি থ্রিল খুঁজেন, পাবেন না। যদি বাস্তবতা খুঁজেন, অনেকক্ষণ ধরেই দেখছেন। সামনে এবার মর্মস্পর্শী কিছু দৃশ্য দেখবেন। অভাবের পরিবারে খানিক সুখ এনে দিতে ৭ বছরের বাচ্চা ছেলে ব্রনোও ঘরের বড়ছেলের দায়িত্বটা নিয়ে বসে। কাজ নেয় পেট্রল পাম্পে।

সন্ধ্যায় যখন সাইকেল ছাড়া ফিরে আসে বাবা, ছেলে বুঝতে পারে কোথাও গন্ডগোল পেকেছে! শুরু হয় বাপ-ব্যাটার অভিযান। পুলিশে কমপ্লেইন করলে তাদের গা ছাড়া ভাব, চোরকে ধরলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে সাইকেল ফিরে না পাওয়া, কুসংস্কারাচ্ছান্ন স্ত্রীকে নিয়ে মজা করা ব্যক্তিটিও সাইকেল ফিরে পেতে দ্বারস্ত হয় দরবেশ মহিলার।

এতকিছুর পর আদৌ ফিরে পায় সাইকেল? নাকি সময়ের ব্যবধানে তিনিও বনে যান চোর? চুরি যদি করেও সফল হতে পারেন? প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে সিনেমায় চোখ রাখতে হবে। অবশ্য এই প্রশ্নগুলির উত্তরই নয় কেবল, জীবনের পথে চলতে গিয়ে এমন আরো বহু প্রশ্নের সম্মুখীন আমি আপনি হয়েছি সেসবের উত্তরও মিলবে এতে।

অনেক কথাই হলো, অভিনয় নিয়ে বলা হয়নি। বলা ভালো বলতে চাইনি। ব্রুনো রিচি চরিত্রে ছোট্টো এনজো স্তাইওলা, অ্যান্তোনিও রিচ্চি চরিত্রে ল্যাম্বার্তো ম্যাজ্জিওরানি কিংবা  মারিয়া রিচি চরিত্রে লাস্যময়ী লিয়ানিলা ক্যারেলা রা নিজেদের ছাড়িয়ে গেছেন। লিয়ানি’র পর্দা উপস্থিতি কম ছিল। গোটা মুভি জুড়ে প্রাণের সঞ্চার করেছেন দুইজন। অ্যান্তোনিও আর ব্রুনো।

হন্যে হয়ে সাইকেল খুঁজে ক্লান্ত পিতা যখন ছেলেকে পিজ্জা খাবার কথা বলে তখন সাদাকালোয়ও সন্তানের মুখে স্পষ্ট দেখা যায় আলোর বিচ্ছুরণ। রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দু’জনের অভিনয় যেন ছাপিয়ে যায় রিল ছেড়ে রিয়েল লাইফকেও। দুজনার খুনসুটিতে উঠে আসে ছাপোষা আনন্দ। খেতে বসেই হঠাৎ খোয়ানো চাকরির সমূহ লাভের হিসেব কষাটা ভাবায় খুব!

এরা ছাড়াও বাকী চরিত্ররাও যার যার জায়গায় যথেষ্ট দিয়েছেন। সিনেমার একেবারে শেষে বাপ-ব্যাটার নিশ্চুপ উদাস পথচলা শিখায়, জীবন থেমে থাকে না কোনভাবেই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।