জ্ঞান অর্জনের বয়স ও এক অসুস্থ সংস্কৃতি

দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, উনার বর্তমান বয়স ৫৫ থেকে ৫৮ বছরের মতো হবে। তিনি আমাদের এই শহরে পিএচডি করতে এসছিলেন বছর তিনেক আগে।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের একটা অবাক করা বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা পরম মমতায় নিয়ম করে একে-অন্যের সমালোচনা করে বেড়াই! এর জন্য আমাদের কোন স্পেসিফিক কারণের প্রয়োজন হয় না। সেই সঙ্গে অন্যকে ছোট করে দেখার একটা ব্যাপার আমাদের মাঝে কাজ করে।

ধরুন আপনি নতুন বিদেশে এসছেন। তো যারা অনেক দিন ধরে এই শহরে থাকে, তারা এমন একটা ভাব নিবে- জগতের সমুদয় সকল জ্ঞান তাদের আছে! শুধু তাই না, তারা আপনাকে যত রকম ভাবে নিরুৎসাহিত করা যায়, তার সব কিছুই করে বেড়াবে! এক সময় আপনার মনে হবে- আমি বিদেশে আসলাম কেন!

আমার এই দীর্ঘ ১৪ বছরের বিদেশ জীবনে ইউরোপের যত গুলো শহরে থেকেছি, সব জায়গায় একই চিত্র! একে-অপরের সমালোচনা করে বেড়াচ্ছে আপনার অগোচরে; যে যেভাবে পারছে অন্যকে ছোট করে দেখার চেষ্টা করছে! এ এক অসুস্থ সংস্কৃতি!

তো ওই অধ্যাপক তিন বছর আগে যখন প্রায় ৫৫ বছর বয়েসে আমাদের এই শহরে এসছিলেন; স্বাভাবিক ভাবেই অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল। তিনি এতো বয়েসে পিএচডি করতে এসছেন, এই নিয়েও আমাদের সমস্যা! আমার পরিচিত একজন একদিন বলে বসলেন, ‘আপনি এই বয়সে বিদেশে পিএচডি করতে এসছেন কেন? এখন তো আপনার ছেলেমেয়ের পিএচডি করতে আসার কথা!’

এই অধ্যাপককে আমি চিনতাম না। তার বিষয়ে জানতে পেরে আমার খুব তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো। ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফোন দিয়ে একদিন উনার বাসায় উপস্থিত হলাম। ঘণ্টা খানেক উনার সাথে কথা বললাম। তিনি বললেন, ‘৩০ বছর বয়সে কানাডাতে মাস্টার্স শেষ করে সেখানেই পিএইচডি করার অফার পেয়েছিলাম। কিন্তু ওই সময় দেশে পারিবারিক একটা সমস্যা থাকাতে মাস্টার্স শেষ করেই দেশে ফেরত চলে যাই। আমার ভালো কোথাও পিএচডি করার ইচ্ছা সব সময়ই ছিলো। কিন্তু নানান পারিবারিক ঝামেলায় আর এতো দিন সেটা করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। ছেলে-মেয়েরা এখন বড় হয়েছে; তাই এইবার সুযোগ পেয়ে স্ত্রী’কে জিজ্ঞেস করলাম- এইবার কি যাওয়া যায়? ও রাজি হওয়াতে চলে আসলাম।’

আমি এই ভদ্রলোকের কথা এতো চমৎকার ভাবে শুনছিলাম, মনে হচ্ছিলো মোহাবিষ্ট হয়ে যাচ্ছি! এতো বয়সেও একজন মানুষ আগ্রহ ধরে রেখে ঠিক ঠিক পিএচডি করতে চলে এসছেন দেখে আমার প্রচণ্ড ভালো লাগছিলো। তাছাড়া উনি কথাও বলছিলেন খুব চমৎকার করে। উনার সাথে বিদায় নেয়ার সময় বলে এসছিলাম- কোন রকম সাহায্য লাগলে অবশ্যই আমাকে ফোন করে জানাবেন। আমি সব রকম সাহায্য করার চেষ্টা করবো।

কিন্তু আমরা বাংলাদেশি বলে কথা! কোথায় মানুষটাকে উৎসাহিত করবো, সাহায্য করবো; সেটা না করে সবাই নিজেরা নিজেরা কানাঘুষা করতে থাকলাম- এতো বয়েসে সে কেন এখানে পিএচডি করতে আসছে, পারলে তাকে নিয়ে হাসাহাসিও করি আমরা!

ভদ্রলোক শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি দেশে ফেরত যাবেন। কারন এই শহরে থাকার কোন উৎসাহ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না! আমি অবশ্য অনেক করে বলেছিলাম-কারো কথা না ধরে, থেকে যেতে। কিন্তু তিনি আর থাকতে চাইলেন না। তিনি অবশ্য বলেছিলেন-শারীরিক সমস্যা হচ্ছে বিদেশে এসে, তাই চলে যেতে চাইছেন। তবে আমি খুব বুঝতে পারছিলাম কারনটা! একটা সময় চলেও গেলেন। মাত্র মাস খানেক থেকেই তিনি বিদায় নিলেন।

ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা বেশীরভাগ বাংলাদেশিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা একে অপরের দুর্নাম করে বেড়ায়। আমার ধারনা বিদেশে থাকা বেশীরভাগ বাংলাদেশিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই এমন!

অন্যকে ছোট করে আমরা জগতের সমুদয় সকল আনন্দ পাই। আপনি বড় হতে চান ভালো কথা, অন্যকে ছোট করে কেন হতে হবে? আমার সব সময়’ই মনে হয়-আমরা প্রতিটা বাংলাদেশি অন্যকে ছোট করার এক অদ্ভুত ক্ষমা নিয়ে জন্মেছি!

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ওই অধ্যাপক বছর খানেক আগে আবার এসছেন এই শহরে পিএচডি করতে। এবার বোধকরি তিনি পিএচডি’টা শেষ করবেন বলেই মনস্থির করেছেন। আমি যতবার উনাকে দেখি, উনার সঙ্গে কথা বলি, আমার মাঝে একধরণের উৎসাহ বোধ কাজ করে। উনার সঙ্গে কথা বললে মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। এতো চমৎকার করে কথা বলেন, স্বপ্ন দেখাতে জানেন-যে কারো মন ভালো হতে বাধ্য। আমি তো একদিন বলে বসেছি।

– আমার মন খারপ হলে আমি আপনার বাসায় গিয়ে হাজির হবো। তাহলে আমার মন এমনিতেই ভালো হয়ে যাবে!

পড়াশোনা করার কিংবা জ্ঞান অর্জন করার জন্য কোন বয়েস নেই। যার যখন ইচ্ছে সেটা করতে পারে। এই মানুষটাকে দেখে কতো কিছুই না শেখার আছে, উৎসাহ পাবার আছে। আর আমরা কিনা এমন মানুষটাকেও নিরুৎসাহিত করেছি!

আপনি একজন মানুষকে উৎসাহ দিতে না পারেন, তাকে নিরুৎসাহিত করার তো কোন মানে নেই! আর অন্য মানুষজন, কে- কি করছে, সেটা নিয়ে কেন আপনাকে মাথা ঘামাতে হবে? আপনি আপনার নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকুন না; তাহলেই তো চলছে! তবে আমরা বাংলাদেশি বলে কথা- নিজের দিকে তাকানোর আগে আমরা অন্যের দিকেই আগে তাকাই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।