দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার ও ভারতীয় রাজনীতির অন্ধকার দুনিয়া

বলিউডে বায়োপিক নির্মানের যে প্রবল স্রোত চলছে তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’। ছবিটি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে নিয়ে নির্মিত। মুক্তি পেয়েছে ২০১৯ সালের ১১ জানুয়ারি।

বক্স অফিস আশানুরূপ কিছু না দিলেও বাইরে ছবিটি একাধারে আলোচিত ও বিতর্কিত হয়েছে। সিনেমার মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রভাব ফেলা এবং আধুনিক ভারতের একজন আলোচিত-সমালোচিত প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা নির্মানের মাধ্যমে ভারতের রাজনীতি এবং বলিউড, উভয়ই একটি নতুন যুগে প্রবেশ করে ফেলেছে।

২০১৪ সালে ড. মনমোহন সিংয়ের মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারুর লেখা বই থেকে এ সিনেমা বানানো হয়েছে এবং সিনেমার নামও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। হুট করে প্রধানমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর মনমোহন সিংকে যেসব সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে, সঞ্জয় বারু খুব কাছ থেকে তা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

বাস্তব বনাম পর্দা

জন্মগতভাবে ইতালীয় সোনিয়া গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না, ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলের এই প্রতিবাদের মুখে তিনি সেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রী হওয়া থেকে বিরত থাকেন। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মনমোহন সিংয়ের নাম প্রস্তাব করেন সোনিয়া গান্ধী।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাকের সাবেক কর্মকর্তা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলা থেকে হঠাৎ করে ভারতের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্রমিক ঘটনাবলী বিবেচনায় এর চেয়ে ভালো নাম আসলে আর হতে পারে না। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার, যিনি ইলেক্টেড ছিলেন না, সিলেক্টেড ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী পদে সোনিয়া গান্ধী যখন তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন, তখন অবাক হননি, এমন মানুষ সারা ভারতবর্ষে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। সোনিয়ার এ ঘোষণা ছিল ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বড় ধরণের সুনামি। ড. মনমোহন সিং ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত করেননি।

এসব ছাড়াও আরও অনেক কারণে মনমোহন সিং ভারতের বাকী সব প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে আলাদা। ভারতের মতো হিন্দুপ্রধান দেশে তিনিই প্রথম অহিন্দু ও শিখ প্রধানমন্ত্রী। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন এবং তিনিই জওহরলাল নেহরুর পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি পুরো পাঁচ বছর কার্যভার সম্পাদনের পর পুনরায় নির্বাচিত হন।

কাগজে কলমে মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকলেও গান্ধী পরিবার, বিশেষ করে সোনিয়া গান্ধী তাকে মাত্রাতিরিক্ত গাইড করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কংগ্রেসের নের্তৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ এলায়েন্স (ইউপিএ) জোট সরকারের অনেক মন্ত্রীদের দুর্নীতির ভারও নিরীহ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঘাড়ে আসছিল। মনমোহন সিংকে ব্যবহার করে ছেলে রাহুল গান্ধীর রাজনীতির ভিত শক্ত করা ও তাকে ভবিষ্যতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানানোর রাস্তা তৈরী করছিলেন সোনিয়া গান্ধী, এমন অভিযোগও তখন জোরেশোরে শোনা যেত।

মনমোহন সিংয়ের মতো একজন নিপাট ভদ্রলোক গান্ধী পরিবারের গোলকধাঁধায় আটকে গিয়ে হাঁসফাঁস করে মরছেন, এমন কথাও লোকমুখে ফিরতো। বিরোধীদের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্বেও ২০০৮ সালে তিনি বিতর্কিত ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তিতে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে, এ অভিযোগে দেশব্যাপী তাঁর বিরুদ্ধে বিস্তর সমালোচনা ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সোনিয়া গান্ধীর নানা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে পদত্যাগ করতে চেয়েও পারেননি মনমোহন সিং। সমালোচকরা তাকে ‘রিমোর্ট কন্ট্রোল প্রাইম মিনিস্টার’ নামেও ডাকতো।

বলা বাহুল্য, এ সিনেমাতে ২০০৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত মনমোহন সিংয়ের শাসনামলের এসব বিতর্কিত দিকগুলোই তুলে ধরা হয়েছে। কংগ্রেস পার্টি এবং গান্ধী পরিবার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ছবিটি যখন মুক্তি পায়, তার কয়েকমাস পরেই ছিল ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এমন প্রেক্ষাপটে সিনেমাটি কংগ্রেসের ভাবমূর্তিতে আঘাত হেনেছে। আর বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা আগাম অনুমান করা যাচ্ছিল, বাস্তবেও কংগ্রেসের ভরাডুবিই হয়েছে আরেকবার।

কংগ্রেস এখন এই সিনেমার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগলেও কাজ হয়নি। তারা মামলা করেছিল। দাবি জানিয়েছিল, সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার আগে তাদেরকে দেখাতে হবে, তারা গ্রিন সিগন্যাল দিলেই সিনেমাটি ‍মুক্তি পেতে পারে, অন্যথায় নয়। তবে এসব দাবি পাত্তা পায়নি।

অনুপম খেরকে প্রথম দেখায় অনেকেই চিনতে পারবেন না। মনমোহন সিংয়ের কণ্ঠ, ধীরস্থিরতা, হাঁটাচলা- সব হুবহু অনুকরণ করতে পেরেছেন তিনি। ট্রেলার দেখে বলাই যায়, মনমোহন সিংকে এর চেয়ে ভাল ভাবে কেউ উপস্থাপন করতে পারতেন না। সঞ্জয় বারুর চরিত্রে অক্ষয় খান্নাও নিজের সেরা কাজটাই করেছেন।

মনমোহন সিং একবার জনসম্মুখে বলেছিলেন, তিনি শুধু অ্যাকসিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টারই নন, তিনি অ্যাক্সিডেন্টাল ফিন্যান্স মিনিস্টারও ছিলেন। তার ওই মন্তব্য থেকেই সঞ্জয় বারু তার বইয়ের নাম রাখেন ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’। এই বই থেকেই সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। যারা রাজনীতি ও বুরোক্রেসি অনুসরণ করেন, তাদের জন্য মাস্ট ওয়াচ একটা ছবি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।