ধানমন্ডির সেই মেয়েটি

সকালে উঠে ধানমন্ডিতে হাটতে যাওয়া বা ট্র্যাকস্যুট পরে দৌড়ানো এইটা আমাদের ঢাকায় থাকলে একটা রেগুলার রুটিন ছিল। ৮১-৮২’র কথা বলছি। মাত্র কফি হাউজে আড্ডা মারা শিখেছি, বলাকা ভবনের ইব্রাহিম থেকে টিপ্ বোতাম ওয়ালা জিনসের প্যান্ট বানিয়ে পড়া শিখেছি।

স্টেডিয়ামের সিরাজ থেকে ট্রাকস্যুট বানিয়ে পড়তে শিখেছি। আব্বা বিদেশ থেকে কেডস, লেদার জ্যাকেট এনে দিতো, ওগুলো পরে কয়েক বন্ধু মিলে সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।

ধানমন্ডি মহিলা স্টেডিয়ামের মেইন গেইটের ঠিক উল্টো দিকের বাড়িতে দোতালায় একটা মেয়ে জানালার কাছে বসে পড়তো। একদিন হাঁটার সময় বন্ধু পাপ্পু নিচের দিক তাকিয়েই আমাকে বললো, ‘উপরে বাম দিকে তাকা।’ দেখলাম, একটি সুন্দর মেয়ে জানালার কাছে বসে ‘উউউউ উঁউঁউঁ আআআ উম উম উম’ করে পড়ছে।

ব্যাস, সেই মেয়েটাকে দেখতে খুব সকালে উঠে দৌড়ানোর নাম করে বের হয়ে যেতাম। সাথে প্রিয় বন্ধুরা এক এক করে জড়ো হয়ে খালি ওই রাস্তা দিয়েই দৌড়াতাম। মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণ করার সে কি প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু কোনো ভাবেই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছিলাম না। আর বন্ধু পাপ্পু এতই এক্সপার্ট ছিল, ও মাটির দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারতো, কোন জানালায় সুন্দর মেয়েটা আছে।

দৌড়াদৌড়ি করে, হাঁটা হাঁটি করে, মাঝে মাঝে হোটেলে নাস্তা খেয়ে বাড়ি ফিরে কলেজের দিকে ছুটতাম। কিন্তু মন পড়ে থাকতো, কখন, কাল সকালে উঠে আবার তাঁকে দেখতে যাবো। মাঝে মাঝে বিকেলের দিকেই বন্ধুরা মিলে সাইকেল নিয়ে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, ধানমন্ডি ৮ নম্বর ব্রিজ হয়ে সেই পুরোনো জায়গায় পল্লী বিদ্যুতের পাশের বাড়িটার সামনের ও পাশের রাস্তায় কয়েক চক্কর মেরে কখনো তার দেখা পেলে খুশি মনে বাড়ি ফিরতাম আর দেখা না পেলে বিফল মন নিয়ে ভাগ্যকে গালাগাল দিতে দিতে বাড়ি ফিরতাম।

দেখা না পেলে এক এক দিন এক জনকে ‘কুফা’ বানাতাম। অর্থাৎ কোনো এক বন্ধুকে শুধু শুধু দোষ দিতাম এই বলে যে , তুই কুফা, তার জন্য ওর দেখা পেলাম না। এই দোষ আমার উপর মাঝে মাঝে পড়তো।

একদিন সকালে হঠাৎ দেখি, মেয়েটি পড়ার টেবিল বাদ দিয়ে জানালা ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। তিন বন্ধু তিন সাইকেলে ছিলামI উত্তেজনায় কাজল সাইকেল থেকে আছাড় খেয়ে মাটিতে পড়লো। ওর সাথে আটকিয়ে আমরাও রাস্তায়। উপরে তাকিয়ে দেখি, মেয়েটা খিল খিল করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে।

আমরা থ্রি স্টুজেস একজন আরেকজনকে কুফা বলতে বলতে খুশিতে হাসতে লাগলাম এই ভেবে, আমাদের এতদিনের নিরলস ফিল্ডিং কাজে লেগেছে। মেয়েটার চোখে পড়তে পেরেছি। অনেক কষ্টে দেরি করে ফিরলে বাসায় বকা খাবো এই ভয়ে ওকে রেখে ফিরে আসলাম।

অনেকদিন এমন চলেছিল। এরপর হঠাৎ একদিন মেয়েটির দেখা পাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো, কিন্তু আমাদের চক্কর দেয়া বন্ধ হলো না। কিন্তু ওর দেখা না পাওয়ায় ওদিকে যাওয়ার উৎসাহ নষ্ট হয়ে গেলো। নানা চিন্তা করতে লাগলাম, রীতিমতো গবেষণা।

হয় ওর বিয়ে হয়ে গেছে, অথবা পড়তে বিদেশ বা ঢাকার বাইরে চলে গিয়েছেI খুব মন খারাপ হলো। এতো সুন্দর একটা স্মৃতি কি শুধু স্মৃতি হয়েই থাকবে। কিন্তু না, আর দেখা পেলাম না। মাঝে মাঝে মনে হতো, হঠাৎ হয়তো কোনো একদিন কোথাও দেখা হয়ে যাবেI কিন্তু হলো না।

২ মাস আগেই দেশে বেড়ানোর সময় ম্যাপেল লিফ স্কুলে একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় নিজের অজান্তেই ওই জানালার দিকে চোখ চলে গেলো। সেই জানালা আর খুঁজে পেলাম না। সাদা দোতলা বাড়ির সেই জানালটির জায়গায় আমাদের স্মৃতিকে গুড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট।

ইচ্ছে হচ্ছিলো, দারোয়ানকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘ভাই! এখানে ওই জানালায় একটা মেয়ে বসে আওয়াজ তুলে পড়তো, আপনি কি জানেন, সে কোথায়?’ কিন্তু আমাকে নির্ঘাত পাগল ভাববে ভেবেই ক্ষান্ত দিলাম। মনে পড়লো, মেয়েটির নাম ও তো জানতে পারি নি।

ধানমন্ডি ৮ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক ব্রিজ। এর রেলিং এ মাঝে মাঝে বসে আশে পাশের সুন্দর দৃশ্য , সুন্দর পথচারীদের যাতায়ত দেখা হতোI দূরে ধানমন্ডি মাঠ দেখা যাচ্ছে। ব্রিজ পার হয়ে ডানে গেলে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার ও দ্বীপে যাবার রাস্তাI বামে গেলে কলাবাগান নার্সারি ও বাস স্ট্যান্ড ও মিরপুর রোড। এখন এর আদল আমূল পাল্টে গেছে।

এখনকার ধানমন্ডি ৮ নম্বরের ব্রিজ।
অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।