পর্দার অ্যাঙরি হিরো, বাস্তবের নিপাট ভদ্রলোক

তিনি সব সময় কাপে বা মগে কোনো কিছু খেলে সেটা বাঁ-হাত দিয়ে ধরেন। তার মতে, ডান হাতকে এমনিতেই মানুষ নানা কাজে ব্যস্ত রাখে, তাই বাঁ-হাত দিয়ে খেলে নাকি জীবানু সংক্রমণের আশঙ্কা কম থাকে।

এখানেই শেষ নয়, তিনি কাগজের প্লেটে খাবার খেতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর সেই প্লেট হতে হবে এমন যা পচনশীল। তার বাড়িতে অতিথি এলেও এমন কাগজের প্লেটেই খেতে দেওয়া হয়।

কেউ যদি তাঁর সাথে দেখা করতে চান, তাহলে তাঁকে নক কেটে পরিপাটি হয়ে যেতে হবে। অপরিচ্ছন্ন বড় নখ তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। তিনি তার বাড়ি কাজের লোক, কিংবা ড্রাইভারের ব্যাপারেও একই রকম সচেতন। কারণ, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে তিনি বরাবরই খুঁতখুতে।

এই মানুষটি হলেন অজিত কুমার, তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মহীরুহ। পুরো নাম অজিত কুমার সুব্রামানি। সেই নব্বই দশকের গোড়া থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে আছেন। অ্যাংরি হিরো কিংবা অ্যান্টি হিরো হিসেবে তাঁর কদর সেকালেও ছিল, একালেও আছে। ‘ধিনা’, ‘মানকাণ্ঠা’, ‘ভাল্লি’, ‘বিল্লা’, ভিরাম’, ‘ভেদালাম’, ‘ভিশ্বম’ কিংবা ‘ভিভেগামের’ মত ছবিগুলো তাঁর অর্জনের মুকুটে পালক হয়ে শোভা পাচ্ছে।

১৯৯০ সালে শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এর তিন বছর পর তিনি শীর্ষ চরিত্রগুলো পাওয়া শুরু করেন। প্রথম ছবি ১৯৯৩ সালের রোম্যান্টিক তামিল ছবি ‘অমরাবতী’। সেই থেকে চলছে তাঁর গাড়ি। তিনি কালক্রমে নিজের একটা অ্যাকশন হিরোর ইমেজ গড়ে তুলতে পেরেছেন। তাই তো তার নামের শেষে যোগ হয়েছে ‘থালা’। থালা মানে ‘শীর্ষ’। সত্যিই তিনি তামিল ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে আছেন।

তামিল ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে মাথায় তুলে রেখেছে। তিনিও ইন্ডাস্ট্রিকে দিয়েছেন হাত ভরে। অজিত ক্যারিয়ারের একদম শুরু থেকে শেষ অবধি আছেন তামিল ইন্ডাস্ট্রিতেই। যেখানে তিনি ৫০ টির ওপর তামিল ছবি করেছেন, সেখানে মাত্র একটি করে করেন তেলেগু আর হিন্দি ছবি।

অজিতের একমাত্র বলিউড ছবিটি হল শাহরুখ খানের ‘অশোকা’। ২০০১ সালের এই ছবিতে ছোট্ট একটা নেতিবাচক চরিত্র করেছিলেন। পর্দায় যতক্ষণ ছিলেন অভিনয়ের ওজনটা স্পষ্ট বোঝা গেছে।

একমাত্র তেলেগু ছবি ১৯৯৩ সালে ‘প্রেমা পুস্থাকাম’। এই ছবিটির একটা করুণ ইতিহাস আছে। ছবির শ্যুটির চলাকালেই পরিচাল গোলাপুড়ি শ্রীনিবাস পানিতে ডুবে মারা যান। আজো সেই শ্রীনিবাসনের নামে সেরা নবাগত পরিচালকের পুরস্কার দেওয়ার চল আছে ভারতে।

অজিত বরাবরই ওজনদার একজন অভিনেতা। পর্দায় তিনি থাকলে আর কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনটাও অন্যদের চেয়ে ভিন্ন। অনেক সাদামাটা আর শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে বিশ্বাস করেন তিনি।

সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে এখনো বাবা মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বের হন। তিনি সন্ধ্যা ছয়টার পর পারতপক্ষে কোনো শ্যুটিং রাখেন না। চেন্নাইয়ে যখন থাকেন, ছয়টা বাজলেই জিম থেকে সোজা চলে আসেন বাড়িতে। সময় কাটান পরিবারের সাথে।

এমনকি খুব প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যা ছয়টার পর কাউকে ফোনও দেন না। ফোন করলেও আগেই বলে নেন, ‘এটা কি কথা বলার সঠিক সময়?’ ছুটির দিনগুলোতে তিনি পরিবারের সাথে থাকেন। ভাইদের, বন্ধুদের সময় দেন। শ্বশুরবাড়ি যান।

নিজের বাড়ি আর অফিসের ইন্টেরিওর খুব যত্ন করে নিজের হাতে করেছেন অজিত। বন্ধু ও অনেক ঘনিষ্ট পরিচিত জনের এমন অনেক আর্কিটেকচারাল স্ট্রাকচারের ডিজাইনও ‘থালা’রই করা। অবসর সময়ে তিনি ছবি আঁকেন, ছবি তোলেন, কিংবা ডুবে যান রান্নাবান্নায়। তিনি বিভিন্ন দেশের মূদ্রা আর ডাকটিকেট সংগ্রহ করেন।

ঠিক আর দশজনের মতই সাধারণ একটা আটপৌঢ়ে জীবন।

অজিত ২০০০ সালে বিয়ে করেন অভিনেত্রী শালিনীকে। শালিনী ‘আলাইপাউথে’র জন্য ২০০১ সালেও ফিল্ম ফেয়ারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জয় করেন।

অজিতের জন্ম ১৯৭০ সালের এক মে, হায়দারাবাদে। বাবা তামিল, মা বাঙালি। অজিতরা তিন ভাই। বাকি দু’জন হলেন অনূপ কুমার ও অনিল কুমার। এক ভাই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, আরেক ভাই আইআইটি থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার।

যদিও, পড়াশোনায় কোনো কালেই খুব ভাল ছিলেন না অজিত। বরং গাড়ি চালানোর নেশায় হায়ার সেকেন্ডারি দেওয়ার আগেই তার শিক্ষাজীবনের ইতি হয়। তিনি পেশাদার একজন কার রেসার। একটা সময় মুুম্বাই, চেন্নাই কিংবা দিল্লীতে রেসিং করতেন। জার্মানি আর মালয়েশিয়াতেও করেছেন।

তিনি অল্প কয়েকজন ভারতীয় পেশাদার রেসারদের একজন। তিনি ২০১০ সালে আরো দু’জন ভারতীয়’র সাথে ফর্মুলা টু চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন।

তিনি ভিন্নরকম এক তারকা। একবা গাড়ি নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। পাশ দিয়েই মটরসাইকেলে করে কয়েকজন ভক্ত যাচ্ছিলেন। প্রিয় তারকাকে কাছে পেয়ে তাঁরা অটোগ্রাফ চেয়ে বসলেন।

অজিত প্রথমেই অটোগ্রাফ দিলেন না। আগে ভক্তদের হেলমেট কিনে দিলেন। কারণ, তারা হেলমেট ছাড়াই বাইক চালাচ্ছিলেন। অজিত এই ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস। খুব ঘনিষ্ট এক বন্ধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলেই তিনি ভয়টা বেশি পান।

তার সামনে গিয়ে চাইলেই আপনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো অভিনেতার বদনাম করতে পারবেন না। এমন মানুষ কিংবা ভক্তদের একেবারেই বরদাস্ত করেন না অফিস। তাঁর অফিসে বা আশেপাশে এমন কারোরই ঠাঁই হয় না। এজন্য ২০১১ সালে তাঁর কোনো ফ্যান ক্লাব করাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। দর্শকই যার রুটি-রুজি, তাঁর জন্য এই কাজটা করা খুবই কঠিন।

তাহলে বুঝুন তিনি কাজের ব্যাপারে কতটা সিরিয়াস হবেন। তিনি এক সাথে একটার বেশি ছবি করেন না। এমনকি কোনো ছবি করার সময় অন্য কোনো ছবির ব্যাপারে কোনো প্রযোজক বা পরিচালকের সাথে কথাও বলেন না। কারণ, তিনি মনে করেন এর ফলে তাঁর মনোযোগ সরে যেতে পারে।

কখনো কোনো প্রযোজকের সাথে দেখা করতে হলে, তিনি নিজে গাড়ি চালিয়ে তাঁর কাছে যান। অজিত মনে করেন, এটাই আদর্শ উপায়। প্রযোজকদেরই অধিপতি মেনে অভ্যস্ত তিনি। এতটাই বিনয়ী এই মানুষটা, তা পর্দায় তিনি যতটাই আক্রমণাত্মক হন না কেন!

তিনি সরাসরি কোনো ছবির প্রস্তাব পেতে পছন্দ করেন না। তিনি চান, কোনো পরিচালক কোনো ছবির ব্যাপারে প্রস্তাব করার আগে কিছুক্ষণ ‘ক্যাজুয়াল’ আলাপ করে নিজেদের আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিক। কারণ, অজিতই বলেন, ‘যার সাথে তিন-চার মাস কাজ করতে হবে, কথা বলতে হবে তাঁর সাথে কেন মিনিট ১৫ স্বাভাবিক কথা বলা যাবে না!’

তিনি প্রতিটি ছবির জন্য আলাদা আলাদ ফোন নম্বর ব্যবহার করেন। সেটা প্রি-প্রোডাকশনের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়, চলে ডাবিংয়ের একদম শেষ দিন পর্যন্ত। পোস্ট প্রোডাকশন শেষ হওয়া মাত্রই তিনি নম্বর পাল্টে ফেলেন। এটা তার জন্য মানসিক একটা তৃপ্তির ব্যাপার। আর বিনা কারণে, তিনি ফোনের ধারের কাছেও যান না।

অজিত বড় পরিচালকদের সাথে কাজ করেন খুব সামান্যই। তারপরও তিনি ইন্ডাস্ট্রির ‘এ’ ক্যাটাগরির অভিনেতা। এটা ইন্ডাস্ট্রিতে বিরল এক নজীর। অজিত বরং আজকর দিনে বড় বড় অনেক পরিচালকের অভিষেক ছবিতে কাজ করে তাঁদের সাফল্য এনে দিয়েছেন। এর মধ্যে আছেন এস. জে. সুরিয়া, এ. আর. মুরুগাদোস, ভি. জে. দুরাই কিংবা সারাভানা সুবাইয়াহ’র মত নির্মাতারা।

অজিত নিখাঁদ মাটির মানুষ। সেটে বয়স্ক কোনো অভিনেতা থাকলে তিনি পরিচালকদের অনুরোধ করেন, তাঁদের যেন আলাদা করে দৃশ্যগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মোদ্দা কথা তিনি পরিপূর্ণ এক বিশুদ্ধ মানুষ। আজকের এই প্রতিযোগীতার দিনে এমন মানুষও যে আছেন, ভাবতেই অবাক লাগে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।