ভারতের বিশ্বজয়ের ‘বিরাট’ সুযোগ

ভারত নি:সন্দেহে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দল। সেটা কন্ডিশন যাই হোক না কেন। কারণটা পরিস্কার  – ফর্মের ওপেনিং জুটি, বিশ্বমানের পেস বোলিং, দু’জন কবজি জাদুকর, বিরাটের অধিনায়কত্ব ও রান তাড়া করার পাশবিক ক্ষমতা এবং মহেন্দ্র সিং ধোনির অভিজ্ঞতা ও চাপ নেওয়ার ক্ষমতা। এবার বিশ্বকাপে ভারতকে আটকানো যেকোনো দলের জন্যই কঠিন হবে।

  • দলের শক্তিমত্তা

ক্রিকেটে ভারতকে বলা হয় ব্যাটসম্যানের স্বর্গরাজ্য। ওয়ানডে ক্রিকেটের শুরু থেকে এই দেশটি একের পর এক সেরা সব ব্যাটসম্যান উপহার দিয়ে আসছে। সুনীল গাভাস্কার, নবযুত সিং সিধু, মহীন্দার অমরনাথ, মোহাম্মাদ আজহারউদ্দীন, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, শচীন টেন্ডুলকার, বীরেন্দ্র শেবাগের মতো বহু ওয়ার্ল্ড ক্লাস তারকা ব্যাটসম্যান দেখেছে এই দুনিয়া; যারা সবাই অতীতে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছে।

বর্তমান টিম ইন্ডিয়াতেও টপ অর্ডারে তিন জন ওয়ার্ল্ড ক্লাস এবং বিস্ফোরক ব্যাটসম্যান রয়েছে; শিখর ধাওয়ান, রহিত শর্মা এবং ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলি। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিনজনে মিলে খেলেছেন ৫৬৪ ম্যাচ, করেছেন ২৪,০৩১ রান! ক্রিজে এরা থাকা মানেই প্রতিপক্ষের জন্য আতঙ্ক। এদের প্রত্যেকে ম্যাচ উইনার।

দলের টপ অর্ডারের মতো স্পিন ডিপার্টমেন্টেও যুগ যুগ ধরে ভারত একেকজন বিশ্বমানের স্পিনার পেয়ে আসছে। ভারতের বর্তমান কোচ রবি শাস্ত্রী নিজেও একজন ভালো মানের বামহাতি স্পিনার ছিলেন। বর্তমান স্কোয়াডে রয়েছে দুই লেগি, ডানহাতি ইউজুবেন্দ্রা চাহাল এবং বামহাতি কুলদীপ যাদব, সাথে আছে অভিজ্ঞ বামহাতি আর্ম বোলার রবীন্দ্র জাদেজা। এবারের বিশ্বকাপে এই স্পিন ত্রয়ী অংশগ্রহণ করা বাকি সবদলকে ভোগাবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়।

টপ অর্ডার এবং স্পিনের পরে যেটি ভারতের শক্তিশালী তা হলো স্কোয়াডে থাকা সবার ফিটনেস। ভারত ফিল্ডিংয়ে কতটা দূর্দান্ত, নিয়মিত যারা খেলা দেখে তারা সবাই জানে। দারুণ ফিটনেস টিম ইন্ডিয়াকে দারুণ সব ফিল্ডিং করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। আর যে দলে বর্তমান দুনিয়ার সেরা উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান মহেন্দ্র সিং ধোনি থাকে, তখন সে দলের ফিল্ডিংয়ে আত্মবিশ্বাস আরো বেশি থাকে। অধিনায়কত্বেও তিনি কোহলির জন্য ‘বিরাট’ ভরসার নাম।

  • অভিজ্ঞতা

এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচ খেলার দিক থেকে সবচেয়ে অভিজ্ঞ দল এটি। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন ২০১১ এর বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, এটি তার শেষ বিশ্বকাপ। বর্তমান অধিনায়ক বিরাট কোহলি খেলেছেন দুইটি বিশ্বকাপ।

এছাড়া দুই ওপেনার ধাওয়ান-রহিত, উইকেটকিপার দিনেশ কার্তিক, অলরাউন্ডার রবীন্দ্র জাদেজা, দুই ফার্স্ট বোলার ভুবনেশ্বর কুমার ও মোহাম্মদ শামি খেলেছেন একটি করে বিশ্বকাপ। বাকি সাতজনের সবাই এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে পা রাখবেন।

  • তুরুপের তাস

অধিনায়ক বিরাট কোহলিই এই দলের সবথেকে বড় এক্স-ফ্যাক্টর। বর্তমানে বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ব্যাটসম্যান, একদিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যার রয়েছে ৪১ টি সেঞ্চুরি। ষাটের কাছাকাছি গড়ে করেছেন প্রায় বার হাজার রান। লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকারের ‘সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি’ রেকর্ডকে তিনি একরকম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতেই তিনি এই রেকর্ড ভেঙে ফেলবেন, যদি তিনি তার সাম্প্রতিক ফর্ম ধরে রাখতে পারেন।

কোহলিকে ঠেকাতে যেমন অন্য সব দল আলাদা পরিকল্পনা করছে, তেমনি ভারতের ওপেনিং জুটি (শিখর – রহিত) কেও গোনায় ধরতে হবে। এই দু’জনের একজন যদি সেট হন তবে তারা একাই যথেষ্ট ম্যাচ বের করে আনার জন্যে। স্পেশালি ডানহাতি ব্যাটসম্যান রহিত শর্মা, ওয়ানডে ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যাটসম্যান যার তিনখানা ডাবল সেঞ্চুরি আছে! এছাড়া অতীত পরিসংখ্যান বলে শিখর ধাওয়ান বড় টুর্নামেন্টের প্লেয়ার। বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি মিলিয়ে তার মোট রান ১১১৩ (১৮ ম্যাচ), স্ট্রাইক রেট প্রায় ১০০!

বোলিংয়ে চাহাল-যাদব স্পিন জুটি প্রতিপক্ষের ইনিংসের মাঝের ওভারগুলোতে লাগাম টেনে ধরতে পারে। দুজনে যেমন রান চেক দিতে পারেন, তেমনি উইকেটও নিতে পারেন। দুজনে মিলে খেলছেন ৮৩ ম্যাচ, উইকেট নিয়েছেন ১৫৭ টি! এর পাশাপাশি ফার্স্ট বোলার জাসপ্রীত বুমরাহ হতে পারে ভারতের একজন ট্রাম্পকার্ড। ডানহাতি এই ফার্স্ট বোলার তার সেরা ফর্মে আছেন, যেকোনো সময় এক স্পেল বল করে ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। ৪.৫ ইকোনমিতে ৪৯ ম্যাচে বুমরাহ’র উইকেট সংখ্যা ৮৫ টি!

মিডল অর্ডারের সিম অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়াকেও বেশ কার্যকর ভুমিকায় দেখা যেতে পারে। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট গত এক যুগ ধরে যে একজন জেনুইন হার্ডহিটার+ পেস বোলিং অলরাউন্ডার খুঁজছিলো, তার ফসল হলেন তিনি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার বাউন্ডারি হাঁকানোর ক্ষমতা বেশ ম্যাচ জয়ে ভুমিকা রাখবে।

সবশেষ কার্যকরী ভুমিকা রাখবে ধোনির ক্রিকেট মস্তিষ্ক। ভেতরের খবর হলেও এটা মোটামুটি সবার কাছে পরিষ্কার, দল বিপদে পড়লে অধিনায়ক কোহলি সবার আগে ধোনির কাছ থেকেই পরামর্শ গ্রহন করেন। আর ধোনির ক্রিকেট মস্তিষ্ক বিশ্বের যে কোনো ক্রিকেটারের থেকে প্রখর। যেকোনো প্রতিপক্ষকে তিনি সহজে পরখ করতে পারেন। তাই তিনি পরিস্থিতি বুঝে দলকে তার সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। সাথে বিশ্বকাপ জয়ের অভিজ্ঞতা তো রয়েছেই।

  • দুর্বলতা

ভারতীয় এই স্কোয়াডে দূর্বলতা একটাই, মিডল অর্ডার পারফরমেন্সের দিক থেকে ধারাবাহিক নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনি দীর্ঘসময় ধরে এই পজিশনের হাল ধরে আসলেও বর্তমানে তিনি তার ক্যারিয়ারের অন্তিম লগ্ন পার করছেন। অনেক দিন বাদে সম্প্রতি তিনি ফর্মে যদিও ফিরেছেন, তবে পুরনো সেই ধার যেন কিছুটা অনুপস্থিত।

অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেটের কোনো এক ম্যাচে যদি টপ অর্ডার প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়াতে না পারে, মিডল অর্ডার কতটুকু কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে, তা যথেষ্ট সন্দেহজনক। এছাড়া ভারতের চার নম্বর পজিশনে কে ব্যাট করবে সেটা নিয়ে যথেষ্ট পরীক্ষা নিরিক্ষা করা হয়েছে। কেউই সেট হতে পারেননি। তাই মহেন্দ্র সিং ধোনির ওপর দলের মিডল অর্ডারের বড় দায়িত্ব রয়েছে, অন্যথায় এই পজিশনটি বিশ্বকাপে ভারতকে বেশ ভোগাবে।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, চার নম্বর পজিশনের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কে ব্যাট করবে, সেটা এখনো সূরাহা করতে পারেননি ভারতের টিম ম্যানেজমেন্ট। রবি শাস্ত্রী জায়গাটায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চান, বিরাট চান নবাগত বিজয় শঙ্করকে খেলাতে। আর সাবেকদের পছন্দ স্বয়ং ধোনি।

  • প্রেডিকশন

২০০৭ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে লজ্জাজনক বিদায়ের পর, পরবর্তী দুই বিশ্বকাপে টিম ইন্ডিয়া স্রেফ দু’টো ম্যাচ হেরেছে। জি হ্যাঁ, মাত্র দুইটা। ২০১১ এর বিশ্বকাপে তারা হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন, ২০১৫ সালে বাদ পড়ে সেমিফাইনাল থেকে।

এবারও ভারতীয় টিম হট ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে। টুর্নামেন্টের বাকি সব টিমের জন্যই ভারতকে মোকাবেলা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে ভারতের জন্য লড়াই করাটা এতোটা সহজও হবে না! অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, উইন্ডিজের সাথে জিততে হলে ভারতকে তার সর্বোচ্চটা দিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। এশিয়ার দুই প্রতিনিধি বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান ভারতের দূর্বল দিক খুব ভালো করে জানে ও বোঝে, সবশেষ এশিয়া কাপে এই দুই দল ভারতকে বেশ ভুগিয়েছে। এবারও তারা ছেড়ে কথা বলবে না, চেপে ধরে নাকের জল-চোখের জল এক করে দিতে পারে।

ভারতের বিশ্বকাপ মিশন শুরু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, পাঁচ জুন। সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনায় ভারত অন্তত সেমিফাইনাল খেলার যোগ্য দাবিদার। সেটা না হলে তাকে ‘অঘটন’ই বলতে হবে। বাকিটা টুর্নামেন্টের পারফরমেন্সের ওপর নির্ভরশীল। মাস্টারমাইন্ড ধোনির শেষ বিশ্বকাপ, ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক বলা হয় তাকে। কোহলি তো চাইবেন-ই নিজ নেতৃত্বে একটি বিশ্বকাপ উপহার দিতে। একই সাথে তাঁর অধিনায়কত্বের বড় একটা পরীক্ষাও হবে এই বিশ্বকাপ!

  • ভারতের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

শিখর ধাওয়ান, রহিত শর্মা, বিরাট কোহলি (অধিনায়ক, লোকেশ রাহুল, মহেন্দ্র সিং ধোনি (উইকেটরক্ষক), দিনেশ কার্তিক (উইকেটরক্ষক), হার্দিক পান্ডিয়া, বিজয় শঙ্কর, কেদার যাদব, রবীন্দ্র জাদেজা, মোহাম্মদ শামি, ভুবনেশ্বর কুমার, জাসপ্রীত বুমরাহ, যুজবেন্দ্র চাহাল ও কুলদীপ যাদব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।