বিশ্বকাপের খাতা খুলবে ক্রিকেটের আঁতুরঘর!

২০১৫ বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর ইংল্যান্ড দল এখন একেবারেই পাল্টে যাওয়া একটি দল। সদ্য শেষ হওয়া পাকিস্তানের বিপক্ষে সীমিত ওভারের সিরিজে তাঁরা প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে এখন অবধি ৮৭ টি ওয়ানডের মধ্যে ৫৭ টিই জিতেছে ইংলিশরা। আর পরিচিত কন্ডিশনের কারণে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট ইয়ন মরগ্যানের ইংল্যান্ড।

  • দলের শক্তিমত্তা

ওয়ার্ল্ড ক্লাস ব্যাটিং লাইনআপ থ্রি লায়ন্সদের মূল শক্তি। টপ অর্ডার থেকে শুরু করে একদম টেল এন্ড অব্দি সবাই একশো স্ট্রাইক রেট রেখে ব্যাট চালাতে পারে। তারওপর আবার পরিচিত ইংলিশ কন্ডিশন। ৩০০ রান করা যেনো তাদের কাছে ডালভাত, গত তিন/চার বছরে তারা নিয়মিত ৩৫০+ রান তুলেছে এবং তাড়াও করেছে। বিগত চার বছরে ওয়ানডেতে তাদের দলীয় গড় স্ট্রাইক রেট প্রায় ১০০, যেখানে বিশ্বের কোনো দলের ৯৫+ গড় স্ট্রাইক রেট নেই। ওয়ানডেতে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ৪৮১ রানের সংগ্রাহক সেই ইংলিশরা।

যে ইংলিশদের অতীতে সবসময় রক্ষণশীল কৌশলে ব্যাট করতে দেখা গেছে, সবশেষ বিশ্বকাপের পর তারা যেনো উল্টো নীতি প্রয়োগ করলো! ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো বিশ্বের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং লাইনআপ। এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে এই ব্যাটিং লাইনআপ সব প্রতিপক্ষের জন্য মাথাব্যথার কারণ।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি তাদের ফিল্ডিং ও দূর্দান্ত। সবার ফিটনেস লেভেল ঠিকঠাক। চমৎকার সব ফিল্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ২৫-৩০ রান কমাতে সক্ষম তারা।

  • অভিজ্ঞতা

দলে অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান দু’টি ভিন্ন দেশের হয়ে (ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড) সর্বোচ্চ তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন, আয়ারল্যান্ডের হয়ে এক‌টি এবং ইংল্যান্ডের হয়ে দুইটি। এছাড়া সহ অধিনায়ক জশ বাটলার, মঈন আলি, লিয়াম প্লাঙ্কেট, ক্রিস ওকস এবং জো রুট এক‌টি করে বিশ্বকাপ খেলেছেন। বাকি নয় জনের সবাই প্রথমবারের মতো এবার বিশ্বমঞ্চে পা রাখবেন।

  • তুরূপের তাস

ইংল্যান্ড স্কোয়াডে বর্তমানে একাধিক ম্যাচ উইনার আছে, যারা যেকোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ওপেনিং এ জেসন রয়, জনি বেয়ার্স্টো অথবা জস বাটলার, ওয়ান ডাউনে জো রুট; এরা সবাই বড় ইনিংস খেলায় এক্সপার্ট। টপ অর্ডারে সবার গড় চল্লিশের ওপরে, জো রুটের গড় তো ঈর্ষণীয় (৫০.৪৭)! মিডল অর্ডারে রয়েছে মরগান, স্টোকস, মইন আলী; লেট মিডল অর্ডারে রয়েছে ডওসন, আর্চার, ওকস, আদিল রশিদেরা।

এদের সবার ওয়ানডে স্ট্রাইক রেট ১০০’র কাছাকাছি, সবাই উইকেটে এসে বিস্ফোরণ ছড়ায়। কেউ একজন ফ্লাইং স্টার্ট দিতে পারলে মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যানরা সেটাকে খুব সহজেই পাহাড়সম স্কোর করে ফেলে। প্রথমে ব্যাটিং অপেক্ষা রান তাড়া করার ক্ষেত্রে এই স্ট্র্যাটেজি বেশি কাজে লাগে। আর যদি কোনো কারণে খেলা ডি/এল মেথডে গড়ায়, গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় রান চেইজে এদের সাথে কেউ পারবেনা। এরা এই সেক্টরের হেডমাস্টার!

বোলিংয়ে এই দলে সবচেয়ে বেশি ইফেক্টিভ লেগ স্পিনার আদিল রশিদ। ৮৭ ম্যাচ খেলে যার পকেটে ১৩০ উইকেট আছে। দুই সিম বোলার লিয়াম প্লাঙ্কেট এবং ক্রিস ওকস বেশ ভালো কার্যকরী বল করে থাকেন। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তাদের উইকেট সংখ্যা যথাক্রমে ১২৩ এবং ১২১ টি।

এছাড়া জোফরা আর্চারের মতো আরেকজন অভিষিক্ত প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছে এই টিমে। বিগত কয়েকবছর ধরে সারা দুনিয়ার টুয়েন্টি ওভারের ম্যাচে ব্যাটে-বলে ছড়ি ঘুরিয়ে আসছেন। এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে তিনিও হতে পারেন ইংলিশদের জন্য এক্স-ফ্যাক্টর।

  • দলের দুর্বলতা

এই দলের প্রধানতম দুর্বলতা হলো, বোলিংয়ে ইকোনমি মেইন্টেইন না করা। বিগত তিন/চার বছরে ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান খরচা করেছে ইংলিশ বোলারেরা। প্লাঙ্কেট, ওকস, আদিল রশিদেরা যেমন উইকেট নিতে পারেন, তেমনি দেদারছে মারও খেতে পারেন।

অবশ্য তাদের ব্যাটসম্যানরা এতোটাই মেরে খেলে, বোলিংয়ের এই দূর্বলতাটি সবসময় দৃশ্যমান হয়না। তবে মাঝেমধ্যে ব্যতিক্রম হয়। কয়েকমাস আগে স্কটিশদের কাছে ব্রিটিশদের হেরে যাওয়া এর এক‌টি উদাহরণ, যে ম্যাচে স্কটিশরা ৩৭২ রানের পাহাড় দাঁড় করিয়েছিল এবং ইংল্যান্ড সেই রান তাড়া করতে ব্যর্থ হয়।

বর্তমান ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপের মধ্যে ধরে খেলা বা ঠুকে খেলা ব্যাটসম্যানের যথেষ্ট অভাব আছে, এক জো রুট ছাড়া তেমন কাউকেই বিগ হিট বাদ দিয়ে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলতে দেখা যায় না। ক্রিকেট বড্ড অনিশ্চয়তার খেলা, কোনো কারণে প্রেসার সিচ্যুয়েশনে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার ভেঙে গেলে, তখন ম্যাচে কিংবা টুর্নামেন্টে টিকে থাকা তাদের জন্য বেশ কঠিন হবে। কয়েক মাস আগে উইন্ডিজের কাছে ১২১ রানে প্যাকেট হওয়া এরকম এক‌টি উদাহরণ।

  • প্রেডিকশন

অজি কোচ ট্রেভর বেলিজের ছায়াতলে এগিয়ে চলা ইংল্যান্ড বর্তমান ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে সেরা দল। ইয়ন মরগ্যান আজকের ইংল্যান্ড দলকে দাঁড় করানোর পেছনে বহু পরিশ্রম করেছেন। বিগত ১১ টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজে তারা অপরাজিত। যদিও ওয়ার্ল্ড কাপ এবং দ্বিপাক্ষিক সিরিজের মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ, তবুও এই ওয়ার্ল্ড কাপে তারা হট ফেবারিট হয়েই ঘরের মাঠে সবার সাথে খেলতে নামবে।

ওয়ার্ল্ড কাপের রাউন্ড রবিন লিগে ইংল্যান্ড এবারের সব দলের জনই ভয়ংকর প্রতিপক্ষ। সবাই ইংল্যান্ড বধ করার মিশনে ভিন্ন ভিন্ন রসদ তৈরী করছে। বিশ্বকাপ না বলে যদি “ইংল্যান্ড বনাম রেস্ট অফ ওয়ার্ল্ড” বলা হয়, সেটাও মন্দ হবে না!

তবে ইংল্যান্ডের সাথে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং নিউজিল্যান্ড বেশ ভালো ফাইট দিবে। এদের সাথে জেতা ইংল্যান্ডের জন্য বেশ কঠিন হবে, চাপে পড়ে হেরেও বসতে পারে। এছাড়া আফগানিস্তানের স্পিন ত্রয়ৗর কাছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। তবে চেনা কন্ডিশন হওয়ায় সেমি পর্যন্ত যেতে খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা না। ১৯৯২ সালের পর তারা আর কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা ডিঙাতে পারেনি, এবার না পারলে আর কবে পারবে?

  • ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াড

জেসন রয়, জেমস ভিন্স, ইয়ন মরগ্যান (অধিনায়ক), জস বাটলার (উইকেটরক্ষক), জনি বেয়ার্স্টো (উইকেটরক্ষক), জো রুট, বেন স্টোকস, মঈন আলি, আদিল রশিদ, ক্রিস ওকস, জোফরা আর্চার, লিয়াম ডওসন, টম কুর‌্যান, মার্ক উড ও লিয়াম প্লাঙ্কেট।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।