নির্মাতা তৌকির আহমেদের সমস্যাটা কোথায়!

চলচ্চিত্রকার তৌকির আহমেদকে নিয়া আমি কনফিউজড। এই কনফিউশন হতাশামূলক।

তার পরিচালিত ৬টা চলচ্চিত্রের মধ্যে চারটাই আমি দেখে ফেলছি, এগুলা যথাক্রমে জয়যাত্রা, অজ্ঞাতনামা, হালদা ও ফাগুন হাওয়া। বাকী দুইটার মধ্যে দারুচিনি দ্বীপ দেখার ইচ্ছা কখনো হয় নাই, আর রূপকথার গল্প দেখছি কিনা মনে নাই।

তৌকিরের পরিচালনাগুলাতে সিনেমা হয়ে ওঠার সকল উপাদান ঠিকঠাক পাওয়া যাবে। জয়যাত্রার ছাড়া সবগুলা ছবির সিনেমাটোগ্রাফি প্রশংসা করার মতো। এডিটিং দুর্দান্ত। চরিত্রগুলার অভিনয়েও কোন দুর্বলতা খুঁজে পাইলাম না। গল্পটাও বলতে পারেন সফলভাবে। কিন্তু তারপরও কেন জানি তার বেশিরভাগ ছবিই টোটাল ফিল্ম হয়ে উঠতেছে না। এই ‘কেন জানি’র উত্তর কী?

তুলনামূলক আলোচনা করতে গেলে জয়যাত্রা এবং হালদা মোটামুটি কিছুটা চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারছে। এই দুইটা কেন পারছে আর বাকীগুলা কেন পারে নাই তা পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম রিভিউ করতে গেলে ঠিকঠাক বলা যাবে, যা এইখানে করতেছি না। বরং ডিরেক্টর তৌকির আহমেদকে নিয়া কথা বলা যাক।

তৌকিরের ডেব্যু ফিল্ম জয়যাত্রা ২০০৪ সালে মুক্তি পায়। তার অল্প কিছুদিন আগেই হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শ্যামল ছায়া ছবিটা বাজারে আসে। দুইটা ছবির স্টোরিলাইন হুবহু এক; যুদ্ধের সময় কিছু লোক নৌকায় করে পালানোর চেস্টা করতেছিল। পার্থক্য শুধু হুমায়ূনের নৌকা ছিল ইঞ্জিনচালিত আর তৌকিরের নৌকা হস্তচালিত।

কাছাকাছি সময়ে একই গল্প নিয়া দুইটা ছবি মুক্তি পাওয়ার কারনে পরে মুক্তি পাওয়া ছবিটার স্ক্রিপ্ট নির্বাচনে দুর্বলতা আছে এমন ভাবনা ভাবা যায়।

তৌকির সম্পর্কে এমন ভাবনা নিশ্চিত করলো তার পরের ছবি অজ্ঞাতনামা। সেলিম আল দ্বীন বিরচিত নাটক চাকা থেকে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত চাকা সিনেমাটার স্টোরিলাইন আর তৌকিরের অজ্ঞাতনামা সিনেমার স্টোরিলাইন একজন সমালোচকের আলাদা করতে কস্ট হয়ে যাবে। মোরশেদুল ইসলাম অজ্ঞাতপরিচয় লাশের শেষকৃত্য নিয়া একটা হিন্দু মুসলমান সঙ্কট রূপায়ন করছিলেন তার ফিল্মে, যা মূল নাটকে ছিল না। তৌকিরের অজ্ঞাতনামাও একটা অজ্ঞাত লাশ; তার শেষকৃত্য নিয়া একই সঙ্কট দেখা যাবে।

ফলে বোঝা গেল, পরিচালক তৌকির আহমেদের স্ক্রিপ্ট নির্বাচনে আসলেই ঝামেলা আছে।

হালদা সিনেমাটা এত সুন্দর ভিজ্যুয়াল, আমি সিনেপ্লেক্সের স্ক্রীনে বেশ আনন্দ নিয়া দেখতেছিলাম। ছবিটা মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন আগে কামার আহমেদ সাইমন পরিচালিত ‘শুনতে কী পাও’ ডকুমেন্টারিটা দেখে আসছি। ছবিশেষে বোঝা গেল, এই দুইটা ছবির স্টোরিলাইনও মোটাদাগে একই।

এইটা তৌকিরের ব্যাডলাক নাকি তিনি ইচ্ছা করেই এইরকম স্ক্রীপ্টগুলা নির্বাচন করেন সেই ভাবনা নিয়া দেখতে বসলাম তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ফাগুন হাওয়া। ছবিটা দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম, আমার সকল অনুমান ব্যর্থ করার জন্য এই ছবির স্ক্রীপ্টের কোন পূর্বসূরি তিনি রাখেন নাই। এই ছবির গল্প পুরোপুরি মৌলিক।

কিন্তু হতাশার বিষয় এই ছবির স্টোরিটেলিং। কয়েকবছর আগে মুক্তি পাওয়া রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত আন্ডার কন্সট্রাকশনের স্টোরিটেলিঙকে হুবহু ফলো করছেন নির্মাতা তৌকির। দুইটা ছবিতে স্ক্রীপ্ট দুইরকমের, কিন্তু স্টোরিটেলিঙের টেকনিকটা ছিল একটা থিয়েটার শো কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রকার গল্প বলে যাওয়া। এইটা এমন কোন বড় বড় অভিযোগ না, বাট এজ এ ফিল্মমেকার তৌকিরকে জানতে চাইলে সমালোচক নিশ্চয়ই এই প্রশ্নগুলা হাজির করবেন।

আমি জানি না তৌকির আহমেদের সমস্যাটা কোথায়। তারে একজন পটেনশিয়াল ফিল্মমেকার বলে মনে হয়। নিয়মিত কাজ করতেছেন, প্রতিটা ছবিতেই আগের ছবির চেয়ে উন্নতি করতেছেন বোঝা যায়। কিন্তু যদি তার প্রতিটা সিনেমার টাইটেল বোর্ড আর পোস্টারে প্রচুর বানান ভুল থাকে, তাইলে নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যাবে ফিল্মমেকার হিসেবে তার সিরিয়াসনেসে ঘাটতি আছে।

কামনা করি, তৌকির আহমেদ পরিচালক হিসেবে আরেকটু সিরিয়াস হয়ে উঠুক।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।