তামিম যেখানে পিছিয়ে

হঠাৎ করে ডাউন দ্যা উইকেটে আসলো কেন, এটা নিয়ে তামিমকে এখন দোষারোপ করার কিছু নেই। গত তিন বছরে এটাই তামিমের খেলা। ডট দিতে দিতে প্রেশারে পড়ে যায়! ৮০ বলে ৫০ রানের মতো থাকে। তারপর ইনিংসের মাঝামাঝি কোন স্পিনার আসলে তাঁকে টার্গেট করে ডাউন দ্য উইকেটে এসে দুই-তিনটা চার-ছক্কা মারেন! স্ট্রাইক রেট একটু ভদ্রস্থ করেন। তারপর আবার আগের রূপে ফিরে যান।

যদি মনে থাকে, তাহলে বলি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়ার সাথে যে ম্যাচে ৯৫ রান করেছিলেন, সে ম্যাচে যখন অফ স্পিনার ট্রাভিস হেড বোলিংয়ে আসলেন তখনই তামিম ডাউন দ্য উইকেটে এসে তাঁকে টানা দুই বলে দুই ছক্কা মারলেন। তখন ঠিক আজকের মতোই তামিমের রান ছিল ৮০ বলে ৫৫!

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিরই প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের সাথে তামিমের রান ৭৭ বলে ৫২। ইনিংসের ২৫ তম ওভার। মঈন আলী বোলিংয়ে আসলেন। তামিমও ডাউন দ্য উইকেটে এসে ছক্কা মারলেন। চাপ কমালেন।

সেমি ফাইনালে ভারতের সাথে ৫০ পূর্ণ করলেন ৬৩ বলে। ২২ নম্বর ওভারে অশ্বিন আসলেন। অশ্বিনকে টানা ৩ বলে ৩টা চার মারলেন। রান ৬৬ বলে ৬২ হয়ে গেলো। তারপর আবার খোলসের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

গত বছর তামিম শ্রীলঙ্কার সাথে যে ম্যাচে ১৪২ বলে ১২৭ করেছিলেন। সেটাতে এক পর্যায়ে তাঁর রান ছিল ৯৩ বলে ৬১! একেবারেই আজকের মতো, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ম্যাচের মতো। তারপর অফ স্পিনার গুনাথিলাকা বোলিংয়ে আসলেন। তামিম ওই ওভারে তিন চার মেরে চাপ কমালেন।

আমরা সাধারণ দর্শক হয়ে খেলা দেখে দেখে এইসব জিনিস মনে করতে পারি। আর বিপক্ষ দলের যেসব এনালিস্ট তামিমের খেলা বিশ্লেষণ করেন তাঁরা এই জিনিস লক্ষ্য করে নাই? আজকেও উনি সেটাই করতে চেয়েছিলেন। বিশুকে উড়িয়ে মেরে স্ট্রাইক রেটটাকে একটু ভদ্র বানাতেন। আজকে ভাগ্য খারাপ। ব্যাটে বলে হয়নি।

২০১৫ বিশ্বকাপের পরে তামিম ইকবাল সারা বিশ্বের সেরা গড়ের অধিকারী ওপেনার! তাঁর গড় ৬১.৩০! একইসাথে শীর্ষ ছয়ের লিস্টে তাঁর স্ট্রাইক রেট সবচেয়ে কম। অন্যদের যেখানে ন্যূনতম ৯২ করে স্ট্রাইক রেট, সেখানে তামিমের স্ট্রাইক রেট ৮০!

তামিম মাঝে হঠাৎ করে একজন বোলার টার্গেট করে হঠাৎ যে রান এক্সেলারেট করেন, সেটা অনেকেই করেন। ব্যাটিংয়ে সেটা স্বাভাবিক। তবে অন্য ব্যাটসম্যানেরা এভাবে চাপ কমানোর জন্য বসে থাকেন না। তাঁরা সিঙ্গেলস নেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় তামিম টিকে থেকে রান করার সেরা কাজটাই করছেন। বড় ইনিংস খেলা বা টিকে থাকায় সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে, তামিমের ডট বল। যখন টিকে থাকার কাজটা করছেন, তখন গ্যাপ বের করে সিঙ্গেলস বের করার মানসিকতাটা খুব খুউব খুউউউব জরুরি! আগের ম্যাচে বারেবার বলেছি তামিমের ডট বলে মানসিকতা থেকে বের হতে হবে।

বুঝলাম, গায়ানার এই উইকেট গত দুই ম্যাচ ধরে ভয়াবহ স্লো। এখানে টিকে থেকে রান করতে হবে। কিন্তু আপনি তামিমের আগের বড় রানগুলো দেখেন। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি বা শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং স্বর্গে তাঁর সেঞ্চুরি ১২০-১২৫ বলে। এই স্লো উইকেটে তাই সেঞ্চুরি ১৪৬ বলে। আজকে ১৮ বলে ২৭ রান থেকে, ৫৪ রান করতে খেললেন ৮৫ বল! অর্থাৎ পরের ২৭ রান করতে খেলেছেন ৬৭ বল! জ্বি ৬৭ বল! ইনিংসে ৫৪টা ডট!

তাঁর ইনিংসগুলোতে যদি তিনি অর্ধেক, দুই-তৃতীয়াংশ ডট বলও খেলতেন, বাকিগুলোকে অন্তত সিঙ্গেলস বানাতেন, তাহলে ব্যাটিং স্বর্গে সেঞ্চুরি গুলো হতো ৯০-১০০ বলে। স্লো উইকেটে তখন ১২০-১২৫ বলে সেঞ্চুরি হতো। সেটা নিয়ে অভিযোগও থাকতো না।

তাঁর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ব্যাটিং, টিকে থাকার মানসিকতা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। হঠাৎ করে মাথা গরম আগের মতো করেন না। হার্ড হিটিংয়ের দরকার নেই। ৮০ বলে ৫০ রান থাকা অবস্থায় রানরেট বাড়ানোর ইনিংসের মাঝামাঝি কোন স্পিনার টার্গেট করা তখন আবশ্যকীয় হবে না যদি তিনি কেবল টিকে থাকার সময়েই সিঙ্গেলস বের করার দিকে মনোযোগী হন! বিরাট কোহলি, বাবর আজম, রোহিত শর্মা, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনরা ঠিক এই জায়গাটাতেই এগিয়ে। তাঁরা কেবল সিঙ্গেলসটা বের করে নিতে জানেন। ডট দেন না।

তামিমের নিজের জন্য, বাংলাদেশের ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য, তামিমের এই সিঙ্গেলস বের করার মানসিকতাটা বিল্ড আপ করা খুব জরুরি, খুউব জরুরী!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।