বিশ্বকাপে তামিম-রিয়াদে ‘আপত্তি’ ছিল সাকিবের!

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সময় নিশ্চিতভাবে ফুরিয়ে আসছে। বিপাকে আছেন তামিম ইকবালও। তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী বাজে ফর্ম মাঝের ওভারগুলোতে ক্রমাগত বাংলাদেশকে ভোগাচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপেও খুব একটা ভালো করতে পারেননি এই দুই সিনিয়র ক্রিকেটার।

ঠিক এই মুহূর্তে যখন দলের সিনিয়রদের মত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল তখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চলতি ওয়ানডে সিরিজে রিযাদ খেলেছেন ৩ ও ৬ রানের দুটি ইনিংস। অন্যদিকে তামিম তো প্রথম ওয়ানডেতে রানের খাতাই খুলতে পারেননি। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ভাল সূচনা করলেও, আউট হয়েছেন বাজে ভাবে।

এখানেই শেষ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দলের দুর্বল ফিল্ডিংয়ের সাথে তাল মিলিয়ে কলম্বোতে প্রথম ওয়ানডেতে একটি ক্যাচও ফেলেছেন মাহমুদউল্লাহ এবং বল হাতে কোন অবদান পর্যন্ত রাখতে পারেননি। দলের সংকটময় মুহূর্তে জুটি ভাঙার কাজে দক্ষ হিসেবেই তিনি পরিচিত। কিন্তু বছরের শুরুতেই নিউজিল্যান্ড সফরে কাঁধের চোটের শিকার হয়ে বল করা থেকে বিরত থাকতে হয় এই ৩৩ বছর বয়সী অলরাউন্ডারকে। এ চোটের কারণে পুরো সিরিজে বল করতে পারেননি তিনি। এমনকি এ চোট বহন করেই তিনি পুরো বিশ্বকাপ খেলেন এবং সাজঘরে কিছুটা সমর্থন হারান বলেও মনে হচ্ছে।

বিশ্বস্তসূত্র থেকে ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যম ক্রিকবাজ জানতে পারে, বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহর ৪১ বলে ২৮ রানের নিষ্প্রভ ইনিংসটি সাজঘরে বিভেদ সৃষ্টি করে। কার্ডিফে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অমন হারের পরেও একাদশ থেকে রিয়াদকে বাদ দিতে চাননি মাশরাফি বিন মুর্তজা। যদিও, সাকিব চাইছিলেন রিয়াদকে বসিয়ে রেখে সাব্বির রহমান রুম্মানকে খেলাতে। মাশরাফি তাতে সায় দেননি। এরপর সাকিব সাফ জানিয়ে দেন, আর একাদশ পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কথাই বলবেন না তিনি। এই অচলাবস্থা চলে বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত।

সূত্রটি বলে, ‘সাকিবের মতে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের তৃতীয় ম্যাচে ৪১ বলে ২৮ রান করা মাহমুদউল্লাহ কোন ইতিবাচক উদ্দেশ্যই দেখাতে পারেননি যখন জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল সম্ভবত ২০ ওভারে ১৯০ রানের মত। ওই সময়টায় সাজঘরের ভেতরে সবার বিশ্বাস ছিল যে এই রান তাড়া করা খুবই সম্ভব। কিন্তু মাহমুদউল্লাহ অ্যাপ্রোচ ঠিক ওই অভিমুখে ছিল বলে মনে হয়নি যা খুব ভালভাবে নিতে পারেননি সাকিব।’ এমনকি রিয়াদের ফিটনেস নিয়েও সন্তুষ্ট ছিলেন না সাকিব।

এখানেই শেষ নয়, বিশ্বস্ত আরেকটি সূত্রের দাবী বিশ্বকাপের সময় তামিমের ব্যাটিংয়ের ধরণ নিয়েও বিরক্ত ছিলেন সদ্য শেষ হওয়ার বিশ্বকাপের সেরা এই অলরাউন্ডার। কারণ, টপ অর্ডারের ব্যর্থতার চাপটা বেশি পড়তো সাকিবের ওপরই। কোনো একটা দলীয় বৈঠককে সাকিব নাকি বলেছিলেন, ‘অন্য দল প্রথম ১০ ওভারে করে ৬০-৭০ রান। আর আমাদের ৪০ রানই ঠিক মত করতে পারি না।’ তামিম ইকবাল বরাবরই শুরুর দিকে ধীরে খেলায় বিশ্বাসী। সাকিব এই কৌশলের বিরোধী ছিলেন।

মাশরাফি ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর নি:সন্দেহে তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের অধিনায়ক হবেন সাকিব। তখন, তাঁর কাছ থেকে তামিম-রিয়াদের মত সিনিয়র ক্রিকেটাররা যে এক বিন্দুও ছাড় পাবেন না সেটা বোধগম্য হয়ে গেল।

চাঞ্চল্যকর ব্যাপার সাজঘরে দলের সতীর্থদের থেকে যে সমর্থন মাহমুদউল্লাহ পেয়েছেন বা সমর্থনে যে অপ্রতুলতা ছিল তাতে তিনি খুব একটা খুশি হতে পারেননি। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের পর গণমাধ্যমকে তাঁর এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্তটি ছিল একটি আগাম বার্তা। এমনকি বিশ্বকাপেও ছয় নাম্বারে নামানোতে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট ছিলেন তিনি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন তার যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে উপরে ব্যাট করার। এবং একবার সে জায়গা হারিয়ে ফেলার পর পুরো বিশ্বকাপজুড়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায়নি।

সূত্রটি বলে, ‘অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পর সাজঘরের ভিতরে মাহমুদউল্লাহর আচরণ ছিল এককথায় জঘন্য। আউট হয়ে সাজঘরে ফেরার পর তার চেষ্টাকে করতালির মাধ্যমে স্বীকৃতি না দেয়ায় সতীর্থদের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের অবতরণ ঘটান তিনি।’

চোট নিয়ে বিশ্বকাপ খেলার পর শ্রীলঙ্কা সফরে মাহমুদউল্লাহকে বিশ্রামে পাঠানো হবে বলে আশা করা হচ্ছিলো। কিন্তু সাকিব ও লিটন ব্যক্তিগত কারণে ছুটি নেয়ায় তাঁকে শ্রীলঙ্কা সফরে দলে রাখা হয়। চলতি সিরিজে আরেকটি লাইফলাইন পাওয়া মাহমুদউল্লাহ এখন পর্যন্ত পারফরম্যান্সের বিচারে হতাশাই ছড়িয়েছেন। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তার জন্য মঞ্চটা ছিল প্রস্তুত। তিনি ১৫তম ওভারের সময় উইকেটে আসেন যখন ৫২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুকছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই অতিরিক্ত শট খেলতে গিয়ে আকিলা ধনঞ্জয়ার কাছে নিজের উইকেটটি হারান তিনি।

বলা যায়, তামিমের চেয়ে একটু বেশিই সংকটে আছেন রিয়াদ। দলের চার সিনিয়র ক্রিকেটার – তামিম, মাশরাফি, মুশফিক এবং সাকিবের সমন্বয়ে যে ‘কোর’ গ্রুপটা রয়েছে তাতে মাহমুদুল্লাহর নাম প্রায়শই ওঠে আসে। তবে অন্যান্যরা যথাযথ পরিমাণে সাফল্য পেলেও মাহমুদউল্লাহর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি।

ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে সাকিব, তামিম, মুশফিকের কাতারেও তাকে দেখা যায় না। যেখানে তারা তিনজনের প্রত্যেকে ওয়ানডেতে ৬০০০ রান পূর্ণ করে ফেলেছেন সেখানে রিয়াদ এখনও ৪০০০ রান স্পর্শের অপেক্ষায়। এমনকি একজন বোলার হিসেবেও তিনি নিজের সামর্থ্যের পুরোটা মেলে ধরতে পারেননি। ১৮৩ ম্যাচে তাঁর উইকেটসংখ্যা কেবল ৭৬!

আর সব ছাপিয়ে বড় ব্যাপার হল, তামিমের সমস্যাটা কৌশলগত। তিনি একটা বিরতি দিয়ে কাজ করলে সেটা পাল্টে যেতেই পারে।অ্যাপ্রোচটা ঠিক করে নিলেই হল। অন্যদিকে রিয়াদের কৌশলের সাথে সাথে আচরণগত সমস্যাও প্রকট, যেটা দলের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে তরুণদের ওপর।

বেশিরভাগ দল বিশ্বকাপের পর একটা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায় এবং এটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হতে পারে। পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনায় রিয়াদ টিকে যান কিনা সেই প্রশ্নের উত্তরটা এখনও অজানা। দলটি শীঘ্রই নতুন নেতৃত্ব দলের অধীনে একটি নতুন যুগ শুরু করবে এবং মাঠ ও মাঠের বাইরে নিজের পারফরম্যান্স বহুলাংশে উন্নত করতে না পারলে সম্ভবত খুব বেশিদিন বাংলাদেশের সাজঘরে থাকতে পারবেন না রিয়াদ রিয়াদ। তামিমের ভাগ্যও একইরকম হয় কি না, সেই ব্যাপারেও নি:সন্দেহ হয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।