আমি শুধু বাবার স্বপ্নের পিছনে ছুটেছি: তামিম ইকবাল

খুব কম মানুষই আছেন যারা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে তামিম ইকবালের চাইতে ভালো বুঝেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় তারকাদের মধ্যে তামিম ইকবাল একজন যিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দেশের জার্সি গায়ে খেলছেন। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই এই দেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান তাঁর। এবং সাকিব আল হাসান ছাড়া তিনিই একমাত্র বাংলাদেশী যিনি দশ হাজার রানের মাইলফলক পার করেছেন।

তামিম ইকবাল বাংলাদেশ দলের উত্থান পতন দেখেছেন এই দলের মধ্যে থেকেই। তাঁর নিজের ক্যারিয়ারেও পার করেছেন অনেক চড়াই উতরাই। তবে ২০১৫ থেকে যেন নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বাংলাদেশ দলের ড্যাশিং ওপেনার। তাঁর নিজের গড় যেমন বেড়েছে, তাঁর দলও ক্রিকেটবিশ্বে নতুন শক্তি হয়ে উঠছে।

এই বাঁহাতি ওপেনারের খেলায় কীভাবে এবং কেন এই বড় পরিবর্তন এসেছে, এবং কারা তাঁকে সাহায্য করেছেন সব কিছু নিয়ে কথা বলেছেন ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যম ক্রিকবাজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। কথা বলেছেন তাঁর বাবার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা, বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া কোচদের সম্পর্কে এবং বিরাট কোহলির প্রতি তাঁর ভালোলাগা নিয়েও।

যে পরিবারের দু’জন সদস্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন সেই পরিবারে বেড়ে উঠার সময়ে প্রত্যাশা কেমন ছিল? আপনার বাবাও একজন জনপ্রিয় ফুটবল তারকা ছিলেন, সেটিও নিশ্চয়ই প্রভাব ফেলেছে কিছুটা?

– আমার জন্য ক্রিকেট কে বেছে নেয়া খুবই সহজাত ছিল। কারণ সেই সময়টাতে ক্রিকেটটা বেশ বড় বিষয় ছিল । সেই সময়ে (১৯৯৭ সালে) আমরা আইসিসি কোয়ালিফাইয়ার জিতেছি। খুব ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আমার ঝোঁকটাই বেশি ছিল। খুব সম্ভবত আমার চাচার কারণে, যিনি তখন খেলছিলেন সবজায়গায় আর সবাই তাঁকে নিয়ে মেতে ছিল। আমার বড় ভাইও খেলছিল তখন। তাই ক্রিকেটে আসা আমার জন্য কোন চমকপ্রদ বিষয় নয়। চট্টগ্রামে আসলে দেখতে পারবেন , পুরোনো টেস্ট ভেন্যুটি আমাদের বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে।

আমার বাবা সবসময়ই চাইতেন আমি ক্রিকেট খেলি। এক অসুস্থতায় নিজের পা হারিয়েছিলেন বাবা। কৃত্রিম পা নিয়েই তিনি আম্পায়ারিং করতেন আর আমি যেন ব্যাটিং চালিয়ে যাই সেদিকে লক্ষ্য রাখতেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমি যেন বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলি। আমি আমার বাবার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম । সাধারণত ছেলেরা মায়েদের সাথেই বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকে তবে আমি ছিলাম বাবার ভক্ত।

সম্ভবত আমার অনূর্দ্ধ ১৩ দলের হয়ে খেলার কথা ছিল যেদিন আমার বাবা মারা যান। তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। যখন তিনি অ্যাম্বুলেন্সে উঠছিলেন আমার উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ কথা ছিল, ‘ঘুমোতে যাও। আমি কাল এসে তোমার খেলা দেখব।’

এরপর আমি বড় হয়ে নিজের খেলা চালিয়ে যাই।

আমি শুধু আমার বাবার স্বপ্নের পিছনে ছুটেছি। এটিই আমার ক্রিকেট খেলার পিছে সবচাইতে বড় অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করে। দুর্ভাগ্যবশত , আমার বাবা আমাকে বা আমার ভাই কে কখনই দেশের হয়ে খেলতে দেখে যেতে পারেন নি। তবে আমার বিশ্বাস তিনি আমাদের সাথেই আছেন, এবং ওপার থেকে আমাদের দেখছেন।

আপনার পরিবার ভোজনরসিক হিসেবেই খ্যাত। খাবারের প্রতি এই ভালবাসা কে ছেড়ে দেয়া কতটুকু কঠিন ছিল আপনার জন্য? কীভাবে এই সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য সচেতনতা এল আপনার মধ্যে? কেউ কি আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?

– ভিরাট কোহলি – তিনি যা করছেন তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি যদি পারতাম তবে তার মত করেই করার চেষ্টা করতাম। আমার মনে হয় পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে আমি তার ধারে কাছেও নেই। এই বিষয়ে যদি কাউকে অনসরণ করতে হয়, তবে আমি মনে করি নিঃসন্দেহে সেটি কোহলি।

আমার জন্য বিষয়টি ভিন্ন। আমার পরিবার চট্টগ্রামে ক্রীড়া পরিবারের সাথে সাথে ভোজনরসিক পরিবার হিসেবেও বেশ খ্যাত। আমার বাবা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রথমেই লোকে বলবে তিনি খেতে ভালবাসতেন। আমরা যৌথ পরিবারে থাকি, এবং সবাই কম বেশি খেতে ভালবাসি।

তবে আমি ক্রিকেটের মধ্যে ছিলাম এবং পরিবার থেকে দূরে ছিলাম লম্বা সময়ের জন্য। বিষয়টি আমাকে সাহায্য করেছে। ২০১৩-১৪ এমনকি ২০১০-১২  সময়ের মধ্যে দেখলে দেখা যাবে সে সময়ের তুলনায় এখন আমার মধ্যে বিশাল একটা পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপের পর থেকে আমার স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসে বেশ পরিবর্তন এসেছে যেখানে আমি কোচ চণ্ডিকা হাতুড়েসিংহের সাথে এ বিষয়ে বেশ লম্বা সময় ধরে কথা বলেছি। তিনি এবং আমার বর্তমান ট্রেইনার মারিও আমাকে এ ব্যপারে সাহায্য করেছেন। বিশ্বকাপ ট্যুরটি আমার জন্য ভালো ছিল না এবং ভারতের সাথে শেষ ম্যাচের পর আমি হাতুড়েসিংহের কাছে যাই এবং তাকে জিজ্ঞেস করি আমার কি করা উচিত। তিনি আমার দক্ষতার উপর কখনও কোন সন্দেহ করেন নি তবে আমার স্বাস্থ্যের প্রতি তিনি সবসময়ই অখুশি ছিলেন। সে সময় টাতেই আমি নিজেকে পরিবর্তন করি। আমি মনে করিনা আমি নিখুঁত, স্বাস্থ্যের দিক থেকে অথবা ডায়েটের ক্ষেত্রে আমাকে আরও অনেক কাজ করতে হবে। ২০১৫ সাল হতে এখন পর্যন্ত আমার ওজন ৮ কেজি কমেছে। এটি আমার জন্য বিশাল পরিবর্তন। আমার মনে হয় আমি এর থেকেও ভালো কিছু করতে পারবো।

বিরাট কোহলি এক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুসরণীয় , তবে আমাদের দলেও এরকম উদাহরণ আছে। যেমন মুশফিকুর রহিম। সে যেভাবে নিজেকে বজায় রাখে, যেভাবে অনুশীলন করে, তার খাদ্যাভ্যাস সবকিছুই। দলে এরকম একজন থাকাতে আমার খুব বেশি দূরে অনুপ্রেরণা খোঁজার প্রয়োজন হয়না।

সামনের বছর গুলোতে আমার স্বাস্থ্য ও ডায়েট ভালো থাকলে আমার পারফর্ম্যান্সও আরও ভাল হবে আশা করি।

এখন আমরা আমাদের মান উঁচুতে নিয়ে গেছি , আমরা নিয়মিতভাবে বড় দলগুলোকে হারাচ্ছি, কিন্তু এটি ২০১৫ সালের আগে খুব বিরল ছিল । যখন দলের পরিবর্তন হয়,তখন নিজের মধ্যেও অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হয় এবং আমি ভাল খেলতে পারছিলাম না তাই ঘরেও আমার সমালোচনা করা হয়েছিল , এমন কিছু ছিল যা আমি ভুল করছিলাম । আমি মনে করি না ফিটনেস আপনাকে রান স্কোর করিয়ে দিবে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি ফিটনেস আপনাকে রান স্কোর করতে সাহায্য করবে। একেই এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছি ।

(চান্দিকা) হাতুরুসিংহের মত মারিও (ভিল্লাভারায়ন) আমাকে বলেছেন, ‘আপনার ফিটনেসে ভালো করার চেষ্টা করুন এবং আপনার ব্যাটিংয়ের পার্থক্যটি দেখুন।’ সেই সময়ে, আমার সবকিছুই হারাতে হয়েছিল কারণ দলের মধ্যে আমার অবস্থান নিয়েও সংশয় ছিল, তাই আমাকে এমন কিছু করতে হত যা আমি আগে কখনোই করিনি।

আমি বিশ্বকাপ থেকে ফিরে আসার পর সত্যিই কঠোর পরিশ্রম করেছিলাম। পাকিস্তান সিরিজ এর আগে আমি এক মাস বন্ধ পেয়েছি যা কাজে লাগিয়েছিলাম। এবং আমি সেই সিরিজে বিশাল সাফল্য পেয়েছিলাম যেখানে আমি ওয়ানডেতে পর পর ২টি শতক এবং টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি পেলাম। এটাও খুব সাহায্য করেছিল । ত্রিদেশীয় সিরিজে আমি দুটি শতক ও একটি হাফ সেঞ্চুরি করেছি। এটি সাহায্য করেছে যে আমি খুব দ্রুত সাফল্য পেয়েছিলাম। এটা আমাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে আমার কঠোর পরিশ্রম ধরে রাখা উচিত এবং আরও বেশি ফিট থাকা উচিত। কখনও কখনও আপনি এত বেশি খেলবেন,যে এটি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে কিন্তু পরবর্তী ধাপে আমাকে সেটিই শিখতে হবে।

এখন আপনার ব্যাটিং পদ্ধতিতে সচেতন পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয়। আগে, আপনি নেটে প্রচুর সময় ব্যয় করতেন, তবে এখন আপনি খুব কমই সময় কাটাচ্ছেন সেখানে কিভাবে এই পরিবর্তন ঘটেছে?

– আমার ব্যাটিং পরামর্শক ছিলেন জেমি সিডন্স, সেই সময় তিনি আমাদের দলের কোচ ছিলেন, তিনি ছিলেন আমার পাওয়া সবচেয়ে ভাল ব্যাটিং কোচ। আমি মনে আছে তিনি তার সময়ে আমাকে কি বলতেন।  ২0১৫ সালের সময় টায় আমি আমার নিজের এক পদ্ধতিতে লম্বা বা দীর্ঘ সময় ব্যাপী ব্যাটিং করতাম , তবে সেটি আমার পারফরম্যান্স ধারাবাহিক করতে সাহায্য করত না । আমি যে ধরনের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স পাচ্ছি এখন, সেটি তখন হত না । সুতরাং যখন আমি সিডন্সের কাছে গিয়েছিলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি আমাকে একটা পরিকল্পনা দিতে পারেন এবং আমি সেই পরিকল্পনাটি অনুসরণ করব এবং দেখি এটা আমার জন্য কাজ করে কিনা?’  তিনি আমাকে এই পরিকল্পনা দিয়েছেন যে ব্যাটিং এবং প্রশিক্ষণ সময়ের উপর নির্ভর করে না, এটি তীব্রতা এবং উদ্দেশ্য এর উপর নির্ভর করে । যখন আপনি নেটে যান, আপনার একটি উদ্দেশ্য থাকা প্রয়োজন, আপনি কি করছেন তা জানতে হবে, আপনাকে জানতে হবে আপনি সেই নির্দিষ্ট সেশন থেকে কি অর্জন করতে চান।

এর আগে  এটি ছিল কত জোরে  বল আঘাত করা যায় , কোন কিছু উদ্দেশ্য নিয়ে নয় কিন্তু সে আমার খেলার মধ্যে এই উদ্দেশ্য নিয়ে আসে। আমি এখন ১৫-২০ মিনিটের বেশি ব্যাট করি না কিন্তু আমার তীব্রতা খুব বেশি থাকে, সম্ভবত ম্যাচ-এর তীব্রতার মত প্রায় এবং আমি আমার দুর্বলতার উপর কাজ করি এবং আমার শক্তির বিষয়গুলোর উপর নয়। কারণ নেটে প্রবেশ করা এবং সেই ড্রাইভগুলি চালানো সহজ। আপনার শরীরের মধ্যে বোলিং করছে এমন ব্যক্তিরা আছে এবং বাউন্স আউট করার চেষ্টা করছে, যেখানে আমি খেলতে পছন্দ করি না, এমন এলাকা গুলোতেই আমি আরও মনোযোগ দিচ্ছি। আপনি একটি খেলার আগে এটি বুঝতে পারেন যে আপনার বিরুদ্ধে কি পরিকল্পনা হতে পারে , প্রত্যেক ক্রিকেটার বুঝতে পারেন বিপক্ষ দল কি করতে পারে। আমি সেই অঞ্চলে অনুশীলন করি যেখানে মনে হয় বিরোধী দল আমাকে আক্রমণ করতে পারে । এইসব পরিবর্তন আমি করেছি।

আপনাকে মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের কাছে বারবার ফিরে যেতে দেখা যায়।  একজন ক্রিকেটার হিসেবে তিনি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করেছেন?

সালাহউদ্দিন এমন একজন ব্যক্তি, যখনই আমি বিপদে পড়েছি, তখনই আমি তাঁর কাছেই যাই। তিনি একজন স্থানীয় কোচ এবং ২০০৭ সাল থেকে আমাকে দেখেছেন যখন আমি প্রথম জাতীয় দলের হয়ে খেলেছি। প্রকৃতপক্ষে, তিনি আমাকে আগে থেকেই দেখেছিলেন যখন আমি অনূর্ধ ১৫ এবং অনূর্ধ ১৭ দলের হয়ে খেলছিলাম। তিনি ২০০৭ সালে জাতীয় দলের অংশ ছিলেন, ব্যাট করার সময় তিনি আমাকে অনেক বল ছুড়েছেন , তিনি আমার ব্যাটিং সম্পর্কে সবকিছুই জানেন। তিনি অনেক বড় প্রভাবক আমার ব্যাটিং এ, বিশেষ করে স্পিনের বিরুদ্ধে ব্যাট হাতে আমি তাঁর থেকে অনেক বেশি কিছু শিখেছি। এমন অনেক শট আমি খেলি যা তিনি আমাকে শিখিয়েছেন বা শিখতে বলেছেন।  আমি সবসময় বলে থাকি যে আমার ক্যারিয়ারে জেমি , সালাহউদ্দিন এবং হাতুরুসিংহের গভীর অবদান আছে।

কোন ম্যাচ কে আপনি আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ভাবেন?

– আমি বলব না যে খুলনার টেস্টটা আমার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আমি মনে করি পাকিস্তানের বিপক্ষে আমরা প্রথম ম্যাচ যেই ম্যাচ জিতি, সেখানে আমি ১৩২  রানের একটি ইনিংস খেলেছি, আমার মনে হয়, এটিই আমার খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছে, কারণ সেই খেলার আগেও আমি নিশ্চিত ছিলাম না আমি একাদশে থাকব কিনা। আমি প্রচুর চাপে  ছিলাম, সম্ভবত আমাকে সেই চাপ দেওয়া হয়নি কিন্তু আমি নিজেই সেই চাপটি তৈরি করে নিয়েছিলাম । সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এবং অন্য সবজায়গায় আলোচনা হচ্ছিল … এই জিনিসগুলো সাধারণত ঘটেই থাকে।

দল ও কোচিং স্টাফের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সহায়তা পেয়েছি, কারণ সেই সময়ে আমি চাপের মধ্যে ছিলাম এবং আমি ভাবছিলাম যে দলে আমার জায়গাটা হুমকির মুখে পড়বে। আমি খেলাটা খেলেছি এবং একটি ম্যাচ বিজয়ী শতক হাঁকিয়েছি, আমি মনে করি যেটি অনেক কিছু পরিবর্তন করে দিয়েছিল ।

তবে কি আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোকে খুব গুরুত্বের সাথে নেন? যেমনটি বলছিলেন অতীতে আপনাকে একারণে অনেক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?

– সেই সময়ে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সংবাদ মাধ্যম গুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতাম আর নিজের উপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতাম। পরবর্তীতে এগুলো মজা হিসেবেই নিতে শুরু করলাম। সামাজিক মাধ্যম গুলো তেমন অনুসরণ করিনা ! বলবো না যে একেবারে সব ধরণের আর্টিকেল বা সংবাদপত্র পড়া বাদ দিয়েছি তবে সেগুলোও খুব বেশি নয়। যদি ভালো কিছু করি তবে অবশ্যই পড়ি , খারাপ কিছু করে থাকলে আমি বুঝতে পারি আমাকে নিয়ে কি কি লেখা হতে পারে এবং গণমাধ্যমগুলোর দিক থেকে সেগুলো যুক্তিযুক্ত কারণ বিষয় টি সবসময় এমনই। এখন আর এসব কে বেশি গুরুত্ব দেই না এবং এটি আমার মধ্যে বড় একটি পরিবর্তন।

এটি আমার নিজস্ব উপলব্ধি নয়। মাশরাফি বিন মর্তুজা এতে বড় একটি ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৫ সালে আমি খুবই হতাশ ছিলাম এবং সবজায়গায় সমালোচিত হচ্ছিলাম। মাশরাফি ভাই আমার বড় হলেও আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতন। তিনি আমাকে সামাজিক গণমাধ্যমগুলো অনুসরণ করতে না করলেন। আমি তার কথা অনুসরণ করে ফল পেয়েছি।

আমি আর অপ্রয়োজনীয় চাপ নেই না। আমি খারাপ সময়গুলোতে শিখেছি যে যখন আপনি খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যান এবং যখন লোকেরা আপনার সমালোচনা শুরু করে, তখন আপনি মনে করেন যে, ‘আমি তাদের দেখাবো আমি কে, ইত্যাদি’। আমি কখনোই বুঝতে পারি নি যে আসলে অন্য কাউকে ভুল প্রমাণ করার চেষ্টা করে আমি নিজেকে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রাখছিলাম। আমি এই একটা জিনিস শিখেছি যে , আমি আমার ভবিষ্যতে আবার একটি খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে গেলে , আমার কারো কাছে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন হবে মনে করি না। মানুষ জানে আমি বাংলাদেশের জন্য কী করেছি, কত রান করেছি, সুতরাং যখন এই ধরনের কিছু আবার ঘটবে, আমি এটি আরও ভালভাবে সামলাতে পারব।

আপনি সবসময় খুব স্পষ্টভাষী ছিলেন এবং এর জন্যে অনেক সময়ে অনেক সমস্যার মধ্যে আপনি পড়েছেন। আপনি কি মনে করেন আপনাকে ভুল বোঝা হয়েছে? এবং এখন আপনি অনেক শান্ত হয়ে গেছেন। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে (নিদাহাস ট্রফিতে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ) যে ঘটনাটি ঘটেছে সেই পুরো সময়ে , আপনি কয়েকজনের মধ্যে একজন যার আবেগ নিয়ন্ত্রণে ছিল

– আমাকে অনেকবার ভুল বোঝা হয়েছে। আমি খুবই আবেগী একজন মানুষ। এবং আমার মনে হয় আমি যেই দলের হয়ে খেলছি যেকোন পরিস্থিতে সেই দলের হয়ে কথা বলার অধিকার আছে আমার।

যখন আমি বাংলাদেশের জন্য খেলছি এবং কিছু ভুল দেখেছি, তখন আমি কথা বলতে লজ্জা পাই না। জন্ম থেকে আমি যে ধরনের মানুষ, আমি অভিনয় করে অন্যরকম হতে পারি না। কখনো কখনো আমাকে সমস্যায় পড়তে হয় সে কারণে। তবে আমি যখনই কোন কথা বলেছি, আমার কোনও খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না, কেবল আমার আবেগের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। অনেকগুলি বিষয় আছে, বিপিএল এর ঘটনাগুলি ঘটেছে, কয়েকটি ঘরোয়া ক্রিকেটের ঘটনার ঘটনা ঘটেছে, আমি বলছি না যে আমি সেই ঘটনাগুলির সময়  শতাভাগ সঠিক ছিলাম এবং এমন কিছু বিষয় ছিল যা আমি কিছুটা ভিন্নভাবে বলতে পারতাম।

আমার জন্য, এটা যাই হোক না কেন, এটা জাল না, আমি মিথ্যা না । যদি আমি কিছু বলি, তবে তার পিছনে আমার নিজের যুক্তি আছে। আমি কাউকে আঘাত করার চেষ্টা করি না, আমি কাউকে বা কোনো দলকে নীচু দেখানোর চেষ্টা করি না, আসলে আমি যা অনুভব করি সেটাই বলি। কখনও কখনও আমি মনে করি আমি খুব খোলামেলা এবং সহজবোধ্য । যদি আপনি বি.পি.এল. ঘটনাটি দেখতে পান তবে এটি ২-৩ আগে মাস ছিল, আমি এই কয়েক মাসের মধ্যেই পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারিনা। আজকাল আমি চেষ্টা করি অপ্রয়োজনীয় সমস্যার মধ্যে নিজেকে না জড়াতে কিন্তু যদি আমি ভুল কিছু দেখি তবে আমি এখনও কথা বলব। এটা আমার মধ্যে, আমি এটা লুকাতে পারি না। মানুষ এটা পছন্দ করেন না। যারা আমাকে চিনে, তারা আমাকে বুঝে। এখনও এমন কোন ঘটনা খুঁজে পাবেন না যেখানে আপনি আমাকে নিজের জন্য কথা বলতে দেখবেন, সবসময়ই এটি অন্য একটি প্লেয়ার বা দল বা অন্য কোন বিষয় ছিল।

এমনকি যখন আপনি বাংলাদেশে আসবেন এবং মানুষের সাথে দেখা করবেন, তারা আপনাকে বলবে যে আমি খুবই অহংকারী। তবে আমি না। আমি খুব বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ কিন্তু আমার সমস্যা হল আমি যাদের চিনিনা তাদের সাথে কথা বলি না। এতে তাদের মনে হয় আমি খুব অহংকারী । দলের মধ্যে আমি যাদের সাথে ঘনিষ্ঠ তারা আপনাকে বলবে – আমি সবচেয়ে বেশি কথা বলি, আমি সবচেয়ে বেশি মজা করি। যেমন কোহলির মত কেউ, তার সম্পর্কে  মানুষের একটি নির্দিষ্ট মতামত আছে, কিন্তু তারা তাকে জানতে পারবে না। যখনই আমি তার সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি, আমার মনে হয়েছে সে অনেক ভালো । যদি আমি কখনও কোন উপদেশ চেয়েছি, তাহলে সে খুব সোজাসুজি ও ভদ্রভাবে আমাকে সাহায্য করেছে। কিন্তু মানুষের তার সম্পর্কে যেই একটি মতামত আছে, আমি তার মাঝে সেই ধরনের কোন ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাইনি। এখন, আমি সচেতনভাবে নিশ্চিত হয়ে নেই যে কারো সাথে কথা বলার সময় বা প্রেসকে কিছু বলার সময় যেন আমি যা বলছি তা কেউ আঘাত না করে। একজন ব্যক্তি হিসাবে উন্নতি করার জন্য অনেক জায়গা আছে এবং আমি এখন সেটিই চেষ্টা করছি।

এটা অবশ্যই সেই সময়ে পৌঁছেছে যে, চান্দিকা হাতুরুসিংহে এবং তার প্রস্থান সম্পর্কিত প্রশ্নগুলির উত্তর দেয়া ক্রমাগত বাংলাদেশ খেলোয়াড়দের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে তবে নিশ্চয়ই দলের জন্যে তিনি অনেক ভালো কিছু করেছেন। আপনার ক্ষেত্রে সেটি কেমন ছিল?

– দলের একজন হিসেবে আমি মনে করি তাঁর বাংলাদেশ দলে নিয়ে আসা সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল কৌশলগত। আমি মনে করি দক্ষতার দিক থেকে আমরা খুব ভাল, আমরা অন্য যেকোনো দল এর মতনই ভাল। আমাদের সবসময় কৌশলগত সমস্যা ছিল – কিভাবে ঐ দক্ষতার ব্যবহার সঠিকভাবে করতে হয়। আমি মনে করি তিনি বাংলাদেশ সেটআপে এনেছেন এমন পরিবর্তন এবং তাই আমরা ভালো ফলাফল পেতে শুরু করেছি। পৃথকভাবে, তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়কে অনেক আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, আমি উইকেট থেকে বেরিয়ে এসে কভারের উপর দিয়ে মারি , তাই যদি আমি সেই শটটি খেলি এবং আউট হয়ে যাই , তিনি কখনোই আমার কাছে আসেননি এবং বলেন নি, ‘এটা কি ছিল?’ এমনকি যখন আমার সেই শটটি খেলার প্রয়োজন ছিলনা তবুও সেটি খেলে আউট হয়ে গেছি, তখনও তিনি আমার কাছে আসেননি এবং এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন নি। কারণ তিনি জানতেন আমি এই শটটি খেলেই অনেক রান পেয়েছি। তিনি এমনকি বলতেন, যদি ৫০ রানে ৩টি উইকেটও পড়ে যায়, এবং যদি তুমি মনে করো যে এই বলটি হিট করা যাবে, তবে এটি হিট করো, মনে কোরো না যে তুমি ৫০ রানে ৩উইকেট হারিয়েছ। এটা তোমার শট, এটি দিয়েই ৬ করো। এই ধরনের পরিবর্তন তিনি দলের মধ্যে এনেছেন।

মানুষ তার চারপাশে খোলাখুলি আলোচনা করতে স্বস্তি পেত। এক সময় ছিল যখন ৬০ রানের ৪ উইকেট পড়ে গেলে ব্যাটসম্যানরা মনে করতেন, ‘আমি এই বোলারকে মারতে পারি কিন্তু আমি মারব না কারণ আমরা ৪উইকেটে ৬০ রান করেছি, আমি আউট হয়ে গেলে আর রক্ষে নেই।’ এটা এখন পরিবর্তিত হয়েছে। সেরা উদাহরণ আমি আগে ওডিআই এর ওভারের প্রথম বল ছয় পেটাতাম, এখন টেস্টের ওভারের শেষ বলেও ছয় পেটাই। পাঁচ বছর আগেও আপনি এটি দেখেন নি। আমি টেস্টের শেষ বল ছয় পেটাতে পারি কারণ আমি জানি আমার কোচ আমার সাথে আছেন, তিনি জানেন যে এটি আমার শট। তিনি প্রত্যেকটি খেলোয়াড়কে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা প্রদান করেন।

তিনি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন করেছিলেন যে তিনি  ২৫-৩০ বছর বয়সী খেলোয়াড়দের নিয়েই চার বছর ধরে ছিলেন।  তাই তিনি প্রায় ৫০-৬০ জন খেলোয়াড় না খেলিয়ে সেসব খেলোয়াড়দের সুযোগ দিয়েছেন যারা তিনি জানতেন যে এই খেলোয়াড়রা ভাল করতে যাচ্ছেন। তিনি কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়ে এসেছেন যারা ব্যক্তিগতভাবে আমি ভাবিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটি এত তাড়াতাড়ি খেলবে, সম্ভবত পরে। যেমন সৌম্য সরকার , সে অবিলম্বে সাফল্য পেয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে, আমি মনে করি না যে জাতীয় দলের জন্য খেলতে সে ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক ভালো কিছু খেলেছে কিন্তু হাতুরুসিংহে এমন কিছু দেখেছিলেন যা আমরা দেখিনি এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন যে সে যেন সঠিক সুযোগ পায়।

এমনকি মুস্তাফিজও…এখানে খালেদ মাহমুদও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এবং হাতুরুসিংহেই মুস্তাফিজকে খুঁজে এনেছিলেন। ফিজ যখন নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে, আমি তাঁকে নেটে কখনও খেলিনি, এমনকি আমি জীবনে তাকে কখনও দেখিই নি। সে একদম নতুন এল এবং খেলল। এধরণের কিছু কাজ হাতুড়েসিংহ করেছেন।

সাধারণত একটি উন্নয়নশীল ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রে, তারা টেস্ট ওয়ানডে থেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে সহজতর বলে মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি ভিন্ন। আপনি এর পিছনে কারণ কি মনে করেন?

– আমি মনে করি এই ফরম্যাটটি আমাদের ভাল করা উচিত কিন্তু আমরা ভাল করি নি, এখানে অনেক কিছু শেখার আছে। এই ফরম্যাট এ একজন ব্যাটসম্যান হিসাবে, একটি দল হিসাবে আমরা আত্মবিশ্বাসী নই । আমি, একজন ব্যাটসম্যান হিসাবে, আমি আমার ওয়ানডে ব্যাটিং সম্পর্কে খুব স্পষ্ট, আমার টেস্ট ব্যাটিং সম্পর্কেও, সম্ভবত আমি আমার টিটুয়েন্টি ব্যাটিং সম্পর্কে স্পষ্ট ছিলাম না। আমি কি প্রথম বল থেকেই মেরে খেলবো, বা আমার ইনিংস গড়ে তুলবো , আপনি মেরে খেলে কি ১৫ ওভার ব্যাট করার চেষ্টা করতে পারেন … একটি দল হিসেবে, এটি আমাদের একটি বড় প্রশ্ন  ছিল।

আমরা এই ফরম্যাটে খুব বেশি খেলিও না। তবে বিশেষ করে এই টুর্নামেন্টের পর, ছেলেরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাটিং বা বোলিং-সবকিছুতেই আত্মবিশ্বাস পেতে শুরু করেছে।  আমরা ২১৪ রান চেজ করলাম, আগে যদি আমরা স্কোরবোর্ডে এই স্কোর দেখতাম, অর্ধেক কাজ ইনিংসের বিরতিতেই শেষ হয়ে যেত। হতাশ হয়ে যেতাম কারণ আগে আমরা কখনোই এটি করিনি। আমরা আগামী ১০ ম্যাচেও হয়তো আবার ২০০ চেজ করে ফেলতে পারবো না কিন্তু পরিবর্তনটি হল আমরা জানি আমরা সেটা করতে পারি। আমরা জানি আমরা কীভাবে এটা করেছিলাম, আমরা জানি, আগামী ১০ টি-টোয়েন্টি তে আমাদের বিপক্ষে ২০০ রান করা হলে আমরা এর একটিতেও না জিততে পারি তবে এখন আমরা বিশ্বাস করি যে আমরা এটা করতে পারি। আগে, আমরা বিশ্বাস করি নি। আমি মনে করি যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, আমরা এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছি।

কিভাবে এবং কখন বিশ্বাস আসে যে আপনারা টেস্টেও ভাল জাতি? ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আপনার সাফল্যটি সাক্ষ্য দেয় এটির, এবং আপনার শ্রীলঙ্কার সফরও অসাধারণ ছিল

– টেস্টের জন্য, গত দুই বছরে যে সাফল্য আমরা পেয়েছি, তার অনেকটাই কৃতিত্ত্ব অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমের। সে যে ধরনের উইকেটে ঘরের মাঠে খেলতে চেয়েছিল, সেটি যথেষ্ট সাহসী ছিল। যদি আপনি দেখেন যে, আমরা আগে যে উইকেটগুলো ব্যবহার করতাম সেখানে কোন ফল আসতো না, চমৎকার উইকেট যা ফ্ল্যাট হবে, দলগুলি আসত … ৪০০, ৬০০ রান করত, আমরা ২০০-৩০০ রান পর্যন্ত ব্যাট করতাম এবং হেরে যেতাম। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, আমরা হয়তো হেরে যাব,যা আমরা এমনিতেও হেরে যেতাম, কিন্তু এমন কিছু তৈরি করি যা আমাদের শক্তির জায়গা এবং জয় করার চেষ্টা করি। যেহেতু আমরা এমনেই হারছিলাম, এটা সেখান থেকে খারাপ হতে পারেনা, তবে নতুন কিছু চেষ্টা করে দেখা যাক এবং কিছু পরিবর্তন আনা যাক যার জন্য ফলাফল আমাদের পক্ষে আসতে পারে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা যখন স্পিনিং ট্র্যাকটি তৈরি করেছিলাম তখন এটি সম্পূর্ণ মুশফিকুরের সিদ্ধান্ত ছিল। এমনকি আমি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করতে পারি যে আমি সহ-অধিনায়ক ছিলাম এবং আমি সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে খুশি ছিলাম না।

প্রকৃতপক্ষে, আমিই সেই উইকেটে সর্বাধিক রান করেছিলাম। [হাস্য] যখন আমি এই স্পিনিং ট্র্যাকের কথা সম্পর্কে প্রথম শুনেছিলাম, তখন আমি খুশি ছিলাম না। এই সিদ্ধান্তটি খুবই সাহসী ছিল এবং সেখানে থেকেই আমরা ঘরের মাঠে খুব ভাল টেস্ট দল হয়ে উঠেছি।

আমরা টেস্টে খুব কমই জয়ী হয়েছি, এবং যখন আমরা শ্রীলঙ্কাতে পৌঁছলাম, গ্রুপের প্রত্যেকেই সত্যিই ভাল করতে উৎসাহিত ছিল। গালিতে প্রথম টেস্ট আমরা হেরে যাওয়ার পর, আমরা একটি দল হিসেবে, শুধুমাত্র খেলোয়াড়রা, আমরা একটি আলোচনায় বসলাম এবং আলোচনা করলাম যে আমরা এতটাও খারাপ নই। আমরা আমাদের ধারণাগুলো একে অপরকে জানালাম, আমি মনে করি এই ধরণের মিটিংগুলি যেখানে মানুষ সত্যিই খোলামেলা কথা বলে সেগুলো খুব সাহায্য করে। বাংলাদেশিরা খুবই লাজুক, যখন বিদেশের কোচ সহ পাঁচজন বিদেশী কর্মী সামনে বসেন, তখন তারা লজ্জা পায় এবং প্রায়ই সমস্যাগুলো নিয়ে সরাসরি কথা বলে না। কিন্তু যখন আপনি নিজেদের মধ্যে থাকেন, আপনি সত্যিই খোলা হতে পারে। আমরা এই ধরনের মিটিংগুলি প্রায়ই করতে শুরু করেছি, এর অর্থ এই নয় যে আমরা যেকোনো মিটিং করলেই পরের ম্যাচটি জিতব, কিন্তু এটি একে অপরকে ভালভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

আইপিএলের দিকে আপনি কিভাবে ফিরে তাকান? কোনও অভিজ্ঞতা যা আপনি মনে করেন আপনাকে একজন ভাল ক্রিকেটার হিসেবে তৈরি করেছে?

– আইপিএলে আমি শূন্য অভিজ্ঞতা পেয়েছি, আমি এক বছরের জন্য পুণে দলটির সাথে থাকার মতন ভাগ্যবান ছিলাম , কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি একটিও খেলা পাইনি। প্রকৃতপক্ষে, এটা সত্যিই খারাপ লাগে কারণ সবাই আইপিএল খেলতে চায়। বিশেষ করে ২০১০ সালে, আমি খুব ভাল একটি বছর কাটিয়েছি।  ওয়ানডে, টেস্ট সব ফরম্যাটে রান করেছি, ভারত ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বত্র রান করেছি। সেই প্রথমবার আমি আসলেই ভেবেছিলাম যে আমি সুযোগ পাব, সেই সময়টাতে আমি সত্যিই খারাপ বোধ করতাম কারণ আমি সত্যিই আন্তর্জাতিকভাবে ভাল কাজ করছিলাম। ২০১২ সালে, আমাকে বদলি হিসেবে নেয়া হয়েছিল, এশিয়া কাপে আমি সেবার ভাল করেছিলাম, তাই আমি সেখানে গিয়েছিলাম। দুঃখজনকভাবে আইপিএলে কেবলমাত্র  অংশই পেতে অসুবিধা হয় কিন্তু একবার সুযোগ পেলে, আপনি পারফর্ম করে দলে টিকে থাকতে পারবেন। আমি পারফর্ম করার সুযোগই পাইনি, সেটা খারাপ লাগে। যদি আমি সেখানে সুযোগ পেয়ে ভাল না করতাম, তাহলে আমি বুঝতে পারতাম। কিন্তু আমি একটি সুযোগও পাইনি।  ২০১৪ এর পরে, আমি এ সম্পর্কে ভাবা বন্ধ করলাম।

আমি সবসময় নিলামের জন্য আমার নাম রাখি কিন্তু আমি আর খারাপ বোধ করিনা। আমি নিলাম দেখি বড় বড় তারকাদের জন্য, এটি আমার জন্য উত্তেজনাকর। এটি একটি চমত্কার টুর্নামেন্ট। গত দুই বছরে আমি যা কিছু করেছি তাতে সহজেই বলতে পারি, আমি আইপিএলে খেলার আশা করেছি, কিন্তু যদি তা না হয় তবে আমি আর এটির কথা ভাবি না। যদি তারা মনে করে যে আমি যথেষ্ট ভাল, তারা আমাকে বেছে নেবে, যদি না হয় তবে এটা ঘটবে না।

সৌরভ গাঙ্গুলি, মাইকেল ক্লার্ক, বাকি সব বিদেশি খেলোয়াড় … এই ৪০ দিন আমি দেখেছি, এরা কি করছে, কীভাবে তারা এত সফল। আমি অনেক জিনিস লক্ষ্য করেছি, অনেক কিছুই সনাক্ত করা কঠিন কিন্তু তাদের সবার মধ্যে বড় বড় খেলার সময়ও যেই শান্তভাব বিরাজ করে, এটি অবিশ্বাস্য। পরিস্থিতি কতটা কষ্টসাধ্য, খেলাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তা সত্ত্বেও তাদের যে প্রশান্তি থাকে তা শিখার মতন। যদি আপনি ৪০ দিনের জন্য তাদের সাথে থাকেন, আপনি বুঝতে শুরু করেন কিভাবে এইসব লোকরা ১০০০০-১৫০০০০ রান করেছেন। এটি একটি দুর্দান্ত টুর্নামেন্ট, কোনও তরুণ ক্রিকেটারের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা, এমনকী এমন দলের সাথে থাকা একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার এর জন্যও বিশেষ অভিজ্ঞতা।

শুধু ভাবুন কোন তরুণ বিরাট ও এবি’র সাথে আরসিবি খেলতে সুযোগ পায়, এমনকি যদি তারা একটি খেলাও না খেলে, তারপরও সেখান থেকে তার সংগ্রহ করা অভিজ্ঞতাটি হবে অবিশ্বাস্য। আমি মনে করি এটিই আইপিএলের সেরা জিনিস।

যদি আপনি সাকিবকে দেখেন, তবে তার যে  আত্মবিশ্বাস রয়েছে, আমি বিশ্বাস করি আইপিএল এর জন্যেই। সে নিয়মিত খেলে এবং নিয়মিতভাবে খেলা প্রথম বাংলাদেশি। তাই সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়ের সাথে পারফর্ম করছিল, সে এই বিশ্বাস টা জাতীয় দল এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়ে এসেছে। সে অনেক অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, সেরা কোচদের সাথে কাজ করে, সেরা বিশ্লেষক, সর্বোত্তম সহায়তা কর্মী। সুতরাং যখন আমরা এই টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে টিম মিটিং করেছি, সে অনেক ধারণা দিয়েছে। আমি মনে করি একজন খেলোয়াড় হিসাবে, এটি আপনাকে গড়ে তুলবে।

ধরুন তামিম ইকবাল অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেরন। তখন তিনি কার কাছে যাবেন?

-যদি আমি মানসিকভাবে কোন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাই, তবে একজন সাইকোলজিস্ট আছেন যিনি বাংলাদেশি এবং কানাডায় বসবাস করছেন, মি. আলি খান, তার কাছেই যাব। আমি তাকে ফোন করি এবং বলি একটা বিষয় নিয়ে অস্বস্তিতে আছি এবং আমি মনে করি এটা উচিত নয়, এটি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কিভাবে? তার কাছেই আমি যাই। তিনি চমত্কার, আমি ২০১৫ সাল থেকে তার সাথে কথা বলছি, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ডেলিভারি বা অন্য কিছু যা নিয়ে আমি খুশি নই, আমি তাকে ফোন করে বলি, ‘আমি কি একটি সেশন পেতে পারি?’ এটা আমার মানসিক অংশ।’

যতদূর আমার ক্রিকেটীয় ব্যাপার , আমি হাতুরুসিংহের উপর অনেকটা নির্ভর করি। তিনি আমাদের সাথে আর নেই, তাই কিছু সময় লাগবে বদলাতে কিন্তু যা কিছু তিনি আমাকে শিখিয়েছেন তা এখনও আমার মাথায় রয়েছে। তিনি আমাকে যা যা দেখিয়েছেন, আমি এখনও এটি অনুশীলন করছি। আমার সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এটা ভালো যে আমি সফল ছিলাম, কিন্তু যদি আমি একই জিনিসটি চালিয়ে যাই, তবে এই সাফল্যটি দীর্ঘদিন ধরে চলবে না। তাই আমাকে পরবর্তী স্তরে যেতে হবে, অন্য পদক্ষেপ নিতে হবে, হয়তো আরও ভাল ফল পেতে ভিন্ন কিছু করতে।

যদিও বিপিএল আপনার নিজেদের দেশি প্রতিভার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদানের জন্য পরিকল্পিত ছিল, তবে এটি সত্যিই খুব বেশি সাহায্য করেনি। আপনি একাদশে পাঁচটি বিদেশি সম্পর্কে কি মনে করেন?

– আমি মনে করি পাঁচজন বিদেশি খেলানো সঠিক ছিল না এবং আমরা সবাই সেটি বুঝতে পেরেছি এবং চারজন বিদেশি নীতি ফিরে আসছে। প্রথম বছরে পাঁচজন বিদেশী ছিল, দ্বিতীয় এবং তৃতীয়টিতে ছিল চারজন বিদেশি এবং গত বছর এটি আবারও পাঁচজনে গিয়েছিল। বিশেষ করে আমাদের মত একটি দেশ, যেখানে আমরা তরুণ ক্রিকেটারদের বিকাশের চেষ্টা করছি, আমাদের চার থেকে অধিক বিদেশী খেলানো উচিত নয়। সবাই বুঝতে পেরেছে এবং আমি মনে করি বিসিবি এটি গুরুত্বের সাথে নিয়েছে, সংখ্যাটি চারে ফিরে আসবে বলেই আমি মনে করি।

বাংলাদেশ জাতীয় দল কীভাবে এগিয়ে যেতে পারে, তাতে বিপিএল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আইপিএল ভারতকে যেভাবে সাহায্য করেছে, ডেল স্টেইনের মতো কেউ ১৫০কিমি/ঘন্টা তে বোলিং করে, একজন স্থানীয় খেলোয়াড় তাকে খেলছে,  তাই যখন সেই স্থানীয় খেলোয়াড় জাতীয় দলে আসে, তখন তার মনে হয় না, ‘ওহ এই লোক, আমি কখনও তার মুখোমুখি হইনি’ – কারণ সে তাদের ঘরোয়া সার্কিটে এই বোলারের সম্মুখীন হয়েছে । স্থানীয়রা ভারতে ভাল করছে, এটি ভারতীয় ক্রিকেটে ব্যাপক পরিবর্তন করেছে। আমি বিশ্বাস করি যে আইপিএল পুরোপুরিভাবে ভারতীয় ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছে। একই জিনিস আমাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে, যদি আমরা সঠিক পথে যেতে পারি, আমার মনে হয় এটি আমাদের একটি বিশাল সুযোগ দিতে পারে।

ব্যাঙ্গালুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের কাছে হার নিয়ে যথেষ্ট কথা হয়েছে, এবং এমনকি যখন ২১৪ রান চেজ করে জিতেছেন তখনও বিষয়টি আবার উঠে এসেছে। ঘটনা টি মেনে নিতে কি খুব বেশি সময় লেগেছিল?

– আমি মনে করি ব্যাঙ্গালুরুর খেলা অবশ্যই সাহায্য করেছে। মুশফিকুরের ব্যাট থেকে আসা ২টি বাউন্ডারি আমাদের অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছিল। এমনকি আমি ড্রেসিংরুমের বাইরে দাড়িয়েছিলাম। আমিও কখনও ভাবিনি আমাদের ৩ বলে ২ রান লাগতো। আমরা এত খুশি ছিলাম যে আমরা ভাবছিলাম শুধু খেলা শেষ হবে এবং দৌড়ে উদযাপন করব। সম্ভবত, একই রকম অনুভূতি মুশফিকুরের মধ্যেও হয়েছে । সে এতটা উত্তেজিত ছিল যে সে কখনোই ভাবেনি যে আমরা বড় শট না খেলেও সহজেই জয় পেতে পারি।

সেটি আমাদের কে কড়া বাস্তবতা শিখায় যে শেষ বলটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ম্যাচ শেষ হয়না। একটি প্রধান উদাহরণ ছিল, যখন আমরা ২১৪ রান চেজ করেছিলাম, সে বড় শটের জন্য যেতে পারত যা সে করেনি, সে নিশ্চিত করেছে যে আমরা খেলা শেষ করব এবং তারপর উদযাপন শুরু করব। সেই ২০১২ সালে এশিয়া কাপ এর ফাইনাল, এখনো খুব কষ্ট হয় ভেবে। আজকাল, সবাই একটি বড় সময় এর ইউটিউব এর দর্শক, কিন্তু সেই ক্লিপটি যখন সামনে আসে, আমাদের কেউ এটা ক্লিক করেনা কারণ এটি এখনও প্রচণ্ড বেদনাদায়ক।

আমরা ব্যাঙ্গালোরের খেলা নিয়ে কখনও আলোচনা করিনি। আমাদের মেনে নিতে অনেক লম্বা সময় লেগেছে। শুধু আমাদের খেলোয়াড় নয়, দল, পরিবার, বন্ধু  … একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষ, ক্রিকেট দেখা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরা ছিটকে গিয়েছিলাম কিন্তু বিশ্বকাপ তখনও শেষ হয়নি, মানুষ ঐ খেলাগুলোও দেখেনি। মানুষ খুব হতাশ ছিল।

সেই ম্যাচটির পর আমরা নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি খেলা খেলেছি। আমরা তাদের ১৪০ রানে গুটিয়ে দিয়েছিলাম, (কিন্তু) আমরা খেলার মধ্যে ছিলাম না। মানসিকভাবে, আমরা সেখানে ছিলাম না। এটি মেনে নিতে আমাদের এটি একটি দীর্ঘ সময় লেগেছে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।