তামিম মাঠে নামা মাত্রই বাংলাদেশের জয় লেখা হয়ে গেছে

তামিমকে নিয়ে জীবনে কম লিখিনি। কোনো একজন ক্রিকেটারের কথা বললে, পেশার জায়গা আর নিজের জায়গা (ফেসবুক আইডি) মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছি তাকে নিয়েই। আজকে কি লিখব, বুঝে উঠতে পারছি না। এতটাই চমকে গেছি। এতটাই মোহাবিষ্ট হয়ে আছি।

এডি পেইন্টারের গল্প পড়েছি। সেই বডিলাইন সিরিজে। টন্সিল নিয়ে ব্রিজবেনের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দলের তাকে প্রয়োজন। হাসপাতাল থেকে গ্যাবায় গিয়ে ৮৩ রানের চোয়ালবদ্ধ ইনিংস খেলে লিড এনে দিলেন। দিন শেষে হাসপাতালে। পরে আবার হাসপাতাল থেকে ফিরেই করলেন জয়সূচক রান।

ম্যালকম মার্শালের ভিডিওটা কতবার দেখেছি? সেঞ্চুরি হয়েছে নিশ্চিত। অনেকের মতে সর্বকালের সেরা পেসার তিনি। তাকে মনে করা হয় ইতিহাসের সবচেয়ে কমপ্লিট ফাস্ট বোলার। কিন্তু শতবার ভিডিও দেখেছি ব্যাটিংয়ের। এক হাতে চোট পেয়ে ব্যাট করেছেন আরেক হাতে। ক্রিকেটের যে কোনো বীরত্বগাথার আলোচনায় শুরুর দিকে থাকেন মার্শাল।

অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান রিক ম্যাককস্কারের কথা প্রথম জেনেছিলাম এরকম বীরোচিত কীর্তির কারণেই। বব উইলিসের বাউন্সারে চোয়াল ভাঙল, রক্ত পড়ল পিচে। সেই ম্যাককস্কার পরে চোয়ালে ঘাড়ে ব্যান্ডেজ বেধে ব্যাট করতে নেমেছিলেন ১০ নম্বরে। ক্রিকেট ক্যারিয়ার এমন কিছু ছিল না। তবু অমর হয়ে আছেন ম্যাককস্কার।

অনিল কুম্বলের ছবিটাও আইকনিক। মাথা থেকে চোয়াল জুড়ে ব্যান্ডেজ! মার্ভিন ডিলনের বাউন্সারে ভেঙে গিয়েছিল চোয়াল। দেশে ফিরে যাবেন। কিন্তু যতক্ষণ মাঠে আছেন, অবদান কেন রাখবেন না? ব্যান্ডেজ নিয়ে নামলেন। ব্রায়ান লারার উইকেট নিলেন। ম্যাচ ড্র হয়েছে। কিছু যায়-আসেনি। কুম্বলে জিতে গেছেন আগেই।

মিচেল জনসনের বলের ছোবলে ক্রিজ ছেড়েছিলেন গ্রায়েম স্মিথ। আবার যখন ফিরলেন ব্যাটিংয়ে, সিডনির গ্যালারিতে তখন বিস্ময় আর বাহবার স্রোত। ৯ ওভারের মতো বাকি ছিল ম্যাচে, ঠেকাতে পারলেও ড্র। শুরুতে চোট পাওয়া স্মিথ নেমে গেলেন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে। সেই জনসনের গোলা সামলাতেই। ৩ ওভারের মতো বাকি থাকতে ম্যাচটা হেরে গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের ফল কজনের মনে আছে? সবার মনে ঢুকে গিয়েছিলেন স্মিথ। সবার তাই মনে আছে, সেদিন জিতেছিলেন স্মিথ।

এই বীরোচিত আখ্যানগুলোয় এখন থেকে যোগ হবে তামিমের গল্প। বাংলাদেশের তামিম। ভাবতেই ভালো লাগায় মনটা ভরে যাচ্ছে। অদ্ভূত ভাবে, কেমন জানি, দেশটাকে নিয়ে গর্ব হচ্ছে ভীষণ। এরকম মুহূর্ত তো খুব বেশি আসে না আমাদের! তামিম দেশকে গর্বিত করেছেন। ক্রিকেট বিশ্বে আমাদের মাথা উঁচু করে দিয়েছেন। ক্রিকেটীয় আখ্যানে, ক্রিকেটীয় রূপকথায়, ক্রিকেটের ইতিহাসে একটা জায়গায় বাংলাদেশকে দারুণ সম্মানের আসনে বসিয়েছেন। প্রতিপক্ষের কাছ থেকে চূড়ান্ত সম্মান খুব সহসা পাওয়া যায় না। তামিম আদায় করেছেন, বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছেন। দেশপ্রেম, সাহসিকতা, নিবেদনের চিরস্থায়ী দলিল রচনা করেছেন। এই তামিমকে কোন শব্দে কিভাবে ফুটিয়ে তুলব!

একটা ক্রিকেট দল বড় হয়ে ওঠে পারফরম্যান্সে যেমন, তেমনি আচরণেও। শরীরী ভাষায়। মাঠে নিজেদের উপস্থাপন করায়। নজীর গড়ায়। তামিম বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিলেন। কত ধাপ? হিসেব করছি না। এটা হিসেব করা যায় না। অনুভব করা যায়। আজ থেকে অনেক বছর পর, যুগ যুগ পর, তামিমের উত্তরসূরীরা, আমার-আপনার উত্তরসূরীরা অনুভব করবে।

আজকে কেন জানি একটু নিজের গীত গাইতে ইচ্ছে করছে। আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আজকে নিজেকে সংবরণ করতে পারছি না।

২০১১ সালের কথা মনে পড়ছে। ব্রায়ান ভিটরিকে অর্ডিনারি বলেছিলেন তামিম। ব্যাপারটা ছিল সাইকোলজিক্যাল গেম। অথচ আমাদের দেশেই তামিমকে শূলে চড়ানো হয়েছিল। ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে পত্রিকায় লিখেছিলাম, ‘তামিমের মুখেই মানায়।’ কেন মানায়, লেখায় ব্যখ্যা করেছিলাম। হাসাহাসি দেখেছিলাম। গালি খেয়েছিলাম।

আরও কত কত বার লিখেছি! ভালো সময়ে কম, খারাপ সময়েই বেশি। ২০১৪ আর ২০১৫ বিশ্বকাপ পর্যন্ত সময়টাতেই সবচেয়ে বেশি ট্রল হয়েছে ওকে নিয়ে। নুডুলসসহ আরও কত ট্রল! মাঝরাতে তার বউকে ফোন করে কাঁদিয়েছে লোকে। আয়েশা ক্রিকেটের কিছু বুঝতেন না। তবু শুরুতে কিছু বলেননি তামিমকে। একদিন না পেরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিশ্বকাপের সময় প্রচণ্ড বাজে সময়ে পাশে থেকেছি। সেজন্য তাচ্ছিল্যের শিকার কম হইনি। দালাল তকমা পাওয়া ছিল তো হরহামেশা। অনেকে ভালো বলেছে। তবে আরও অনেকে কি কি বলেছে, অনেকটুকুই মনে পড়ে।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে তামিমের ব্যাট এমন ভাবে কথা বলতে শুরু করল, তার পর আর আমার ও আমাদের কথা বলার দরকার হয়নি। সেই ট্রল করা, গালি দেওয়া লোকগুলোই তামিমের ব্যাটের সুরে কথা বলেছে। হেসেছে। নেচেছে।

আজ এত কথা লিখছি, কারণ ক্যারিয়ার জুড়ে তামিমের প্রতিটি দু:সময়ে পাশে থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি গর্ব হচ্ছে আজই। কোনো চোখধাঁধানো সেঞ্চুরি আর ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্সেও এতটা হয়নি।

না, সমালোচনাকারীদের জবাব দেননি তিনি। ট্রলকারীদের মুখে ঝামা ঘষে দেননি। নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন করাদেরও দেখিয়ে দিতে চাননি। তিনি যা মনে করেছেন, অনুভব করেছেন, সেটাই করেছেন। প্র্যাকটিস করার জন্য গত রোজার ঈদে বাড়ি যাননি। এবার কুরবানীর ঈদে গিয়েছিলেন কেবল দুদিনের জন্য। ক্যাম্প ছিল আরও পরে, চাইলে থাকতে পারতেন। কিন্তু তাদের বাড়িতে খাওয়া দাওয়ার যে আয়োজন, যে পরিবেশ, নিজেকে ধরে রাখা কঠিন। তাই চলে এসেছেন, একা একা প্র্যাকটিস করেছেন।

প্রিয় খাবারগুলোর সঙ্গে আড়ি দিয়েছেন, সে তো অনেক দিন। অফ সিজনে তার ফিটনেস ট্রেনিং দেখে নিজে থেকেই মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ট্রেনার। আগে যে তামিম ফিটনেস ট্রেনিং থেকে নিজেকে লুকাতে চাইতেন, ট্রেনার এখন উদাহরণ দেন সেই তামিমকে দিয়েই। নিবেদন তার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তার পরও চমকে দিয়েছেন। কারণ আজ সেটির আরেকটি রূপ দেখালেন। কারণ আজ নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন। কারণ আজ তিনি আগের সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছেন।

একটু আগেও হাত ছিল স্লিংয়ে ঝোলানো। দলকে আরেকটু ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে সেই হাতকেই সোজা করে নেমে গেছেন। গ্লাভস কেটে হাত সেট করেছেন। দলের প্রতি নিবেদেনের কথা লিখবেন? তামিম চিরন্তন উদাহরণ হয়ে গেলেন।

তাৎক্ষনিক প্রভাবগুলোর কথা ভাবুন। তামিম যখন নামছেন, ড্রেসিং রুম তখন কেমন ছিল? মুহূর্তের আত্মবিশ্বের তুমুল স্রোত বয়ে যাওয়ার কথা ওই ড্রেসিং রুমে। সবার মনে গেঁথে যাওয়ার কথা, ‘এই ম্যাচ আমরা হারতে পারি না।’

দারুণ খেলতে থাকা মুশফিক একটু মিইয়ে গিয়েছিলেন তখন। তামিমকে দেখে কতটা উজ্জীবিত হলেন! যে উদ্দেশে গিয়েছিলেন তামিম, সেটি সফল হলো মুশফিকের ব্যাটে। তামিম মাঠে নামা মাত্রই বাংলাদেশের জয় লেখা হয়ে গেছে। সেটি প্রতীকী হিসেবে ধরতে পারেন। কিংবা প্র্যাকটিক্যালিও।

মুশফিকুর রহিমের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আজ তো সবচেয়ে বেশি লেখার কথা ছিল তার ব্যাটিং বীরত্বের কথাই। দলকে আগেও অনেকবার বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেছেন। লিমিটেড ওভারস-এ বাংলাদেশের সেরা ইনিংসগুলোর অনেকগুলো এসেছে তার ব্যাটে। তামিমকে আমি যেমন বলি দলের সেরা ব্যাটসম্যান, দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলি মুশফিককে। যেভাবে তিনি ব্যাট করেন, যতবার ম্যাচের মোড় পাল্টে দেওয়া কিংবা ভাগ্য গড়ে দেওয়া ইনিংস খেলেছেন, সে কারণেই বলি। আজ মুশফিক ছাড়িয়ে গেছেন নিজেকেও।

এই ছাড়িয়ে যাওয়া শুধু রান সংখ্যায় নয়। নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস বলেই নয়। নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন ব্যাটসম্যানশীপে। আজ তার শেষ পর্যন্ত থাকতে হতোই। থেকেছেন। দলকে টানতে হতোই। টেনেছেন। তামিম উইকেটে যাওয়ার পর তার নিবেদনকে সম্মান জানাতেই বিশেষ কিছু করতে হতো। শেষ জুটিতে সেটিও করেছেন মুশফিক।

খুব গভীরভাবে না ভেবেই বলে দিলাম, বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ইনিংস। গভীরভাবে ভাবলেও হয়ত সেরা দু-তিনটির মধ্যেই থাকবে।

মুশফিকও কিন্তু পাঁজরের ব্যথা নিয়ে খেলেছেন। খেয়াল করেছেন কিনা, কয়েকবারই শট খেলে হাত চেপে ধরেছেন পাঁজরে। নিবেদনের কথা যখন আসলেই, বাংলাদেশ দলে মুশফিকব বরাবরই নিবেদনের মূর্ত প্রতীক।

মুশফিককে টুপিখোলা অভিনন্দন। তামিমকে? ঠিক জানি না। তার কীর্তি তো স্রেফ আজকের ম্যাচ বা এই টুর্নামেন্টের জন্য নয়, শুধু বাংলাদেশের জন্যও নয়, জায়গা করে নিয়েছে ক্রিকেট নামক খেলাটির গভীরে। কে জানে, হয়ত ছাড়িয়ে গেছে ক্রিকেটের সীমানাও!

ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।