দু:স্বপ্নটা ভুলতে হবে

এক বন্ধু জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা ভারতের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়া যে ওয়ানডে সিরিজ জিতলো; সেখানে তো পাকিস্তানী বংশোদ্ভতো উসমান খাজার অবদান বেশি। এখন এই অস্ট্রেলিয়ানটা বন্দুক চালানোর আগে কি এই কথা ভেবেছিল? অজিরা যে দশ বছর পর ভারতের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজ জিতলো, সেখানে একজন এশিয়ানে মুসলিমের অবদান আছে? এতো জ্বললে তো তার আগে ওদেশের সরকারের কাছে আবেদন করার কথা, খাজার সেঞ্চুরি ও ম্যাচ সেরার ঘটনাগুলো মুছে ফেলার জন্য!

হকচকায়ে গিয়েছি। যুক্তিটা হেভিওয়েট না লাইট ওয়েট এটা বোঝার জন্য।

বর্ণবাদ পুরনো সমস্যা। পৃথিবীর আদি অবস্থা থেকেই আছে। ক্লিওপেট্রা যখন মিশরের রানি ছিলেন তখন সে দেশে কৃষ্ণাঙ্গদের ধরা হত আভিজাত্যের প্রতীক। ক্লিও’র গায়ের রংও কাল-ই ছিল কি না!

আর্যদের দলে দলে পশুর পাল নিয়ে আমাদের দ্রাবিড়িয়ান ভূ-খন্ডে আসার আগে আমরা বাদামী কালতেই মগ্ন ছিলাম।

বর্ণের নামে, ধর্মের নামে যত মানুষ মারা যায়, সেটা অন্য দেশ অধিগ্রহণেও হয় না। বর্ণবাদ কি শুধুই সাদা কালোতে হয়? আফ্রিকাতে কাল কালতে অনেক গোত্র। সেখানে প্রায়ই এ ঘটনায় মারামারি ও গৃহযুদ্ধ হয়ে থাকে। তাতে বোঝাই যাচ্ছে গায়ের রং এক হলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়।

এই যে মাইগ্রেশন সমস্যা ও মুসলিম উদ্বাস্তু নিয়ে এতো হইচই, এখন যদি আমেরিকার ইন্ডিয়ান আদিবাসীরা যদি বলে, তোমরা কারা?

এই ব্রিটিশ কলোনির সাদারা কি উত্তর দেবে?

অস্ট্রেলিয়ান খুনীটার আদি পুরুষ কি ওই ভূ-খন্ডে কত শত বছর ধরে আছেন? তার আগে ওখানে কারা ছিল? এসব ভন্ডামিতে লেখা একটা রক্তাক্ত ক্রাইস্টচার্চ। যা ভাগ্যের হাত ধরে বাঁচিয়ে দিয়েছে তামিম-মুশফিকদের। সৌম্য-নাইমদের সামাজিক অবস্থায় অনেক সমস্যা থাকতে পারে। তবে এখনো পর্যন্ত মানুষ এমন পাখির মত মারতে তারা নিজেদের দেশে দেখে নাই। অথচ দ্বিতীয় সুখী দেশ হিসেবে খ্যাত নিউজিল্যান্ডে সেটা হল।

২০১৫ সালের বিশ্বকাপ করতে আমি ক্রাইস্টচার্চে দুইদিন ছিলাম। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত জায়গাটা ঘুরে এসেছি বিকেলে। নিউজিল্যান্ডের মানুষ অদ্ভুত রকম বিনয়ী। যেটা অস্ট্রেলিয়ানরা নয়। কারো সাতে পাঁচে নেই। বললে একগাল হেসে উত্তর দিচ্ছে। সহযোগিতা মনোভাব সেখানে এতোটাই বেশি যে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ছাড়া ও দেশটার মানুষগুলোকে আমার বেশি ভাল লেগে গেল!

রাত আটটার পর কি ক্রাইস্টচার্চ, কি নেপিয়ার বা নেলসন, ভূতের শহর মনে হয়। ও দেশের মানুষদের নিয়ে ধারনাটা উঁচুই।

কিন্তু যাদের নিরাপত্তা বোধ এতো ঠুনকো তাদের কিভাবে আস্থায় আর রাখি। খুনিগুলো প্রায় ৫০ পাতার ই-মেইল, ফেসবুক পোস্ট করার পরও তাদের প্রশাসন পুরোটাই হালকাভাবে নিয়েছে। যার মাশুল ৫০ টিরও বেশি প্রাণের অসময়ে ঝরে যাওয়া। অন্যতম ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। তাদের মানসিকভাবে যে ধাক্কা দিয়েছে, এর জন্য অবশ্যই নিউজিল্যান্ডকে একটা কৈফিয়ত দিতে হবে।

বিশ্বকাপ সামনে। তার ওপর আছে ত্রিদেশীয় সিরিজ। এই রক্তাক্ত ঘটনায় আরো রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া দলটি দেশে ফিরে পরিবারের সাথে সময় কাটাক কয়েকটা দিন। তারপর তাদের নিয়ে বিসিবি’র উচিত কাউন্সিলিং করা। দরকার হলে বিদেশ থেকে কাউকে নিয়ে আসা হোক। কিন্তু মনোবিদের সঙ্গে এখনই বসানো উচিত। সবার মানসিক স্থিতি এক নয়। সবার নিতে পারার ক্ষমতা এক নয়। কিন্তু এই ভয়ঙ্কর ঘটনা এক জায়গায় নিয়ে এসেছে সব ক্রিকেটারকে। দু:স্বপ্নটা ভুলতে হবে। ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা ইতোমধ্যে ব্যাপারটা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে শুনতে পেয়েছি। মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে জীবনের স্বাভাবিকতার জন্য এই কাউন্সেলিংটা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

১৫ মার্চ অনেক কিছু বদলে গেছে। কি হতে পারতো, কি হল এসব অংক করার জন্য বহু সময় আছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, ছেলেগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তাদের জন্যই। ক্রিকেট ২২ গজের খেলা। কিন্তু জীবনের যাত্রায় এর অংশীদারিত্ব খুব অল্পই মাত্র। যারা অস্ত্র নিয়ে খেলে তাদের কাছে সেটাও খেলনা বটে। পার্থক্য হলো একটা মানুষ মরে, আরেকটায় মানুষের স্বপ্ন বাঁচে।

বর্ণবাদ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদ যে যার মত ট্যাগ লাগিয়ে মনের ক্ষোভ মেটাতে পারে। কিন্তু উসমানের শতক যেমন অস্ট্রেলিয়াকে জিতিয়ে দেয়, তেমনি সামির ডেলিভারিতে ভারতও জেতে। বা সৌম্যর ব্যাটে বাংলাদেশ জিতেছে। ধর্মের রংয়ে রক্ত রাঙানো যাদের অভ্যাস, তারা মানুষের এই ক্রিকেটিয় শক্তিটা দেখে না। সৌন্দর্যটা দেখে না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।