স্টারডমের আড়ালে থাকা একজন গ্ল্যাডিয়েটর

ক্যারিয়ারের ‍শুরুটা যেভাবে হয়েছিল তাতে তাইজুল ইসলামের এখন স্টারডমের চূড়ায় থাকারই কথা ছিল। ঘরোয়া ক্রিকেটের গণ্ডী পেরিয়ে যখন জাতীয় দলের টিকেট পান তখন তাঁর সাথে রীতিমত মোহাম্মদ রফিকেরও তুলনা হতে থাকে।

তাইজুলের শুরুটাও ভাল ছিল। কিংস্টনে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট ইনিংসেই পেয়েছিলেন পাঁচ উইকেট।

২০১৪ সালের ডিসেম্বরেই ওয়ানডে অভিষেক। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই নিজের অভিষেক ওয়ানডে ম্যাচে রীতিমত হ্যাটট্রিকই করে ফেলেছিলেন বাঁ-হাতি এই স্পিনার। সেই সিরিজেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে এক ইনিংসে মাত্র ৩৯ রান দিয়ে তিনি নিয়েছিলেন আট উইকেট। টেস্টের ইতিহাসে সেটাই বাংলাদেশের সেরা বোলিং ফিগার।

স্টারডম পাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল সূচনা আর হতেই পারে না। তবুও, এর পর থেকে তাইজুল একটু একটু করে পড়ে গেলেন আড়ালে। সাকিব আল হাসানের মত স্পিনার দলে আছেন। এর সাথে ২০১৬ সাল থেকে টেস্টে স্পিনে বড় ভরসার নাম মেহেদী হাসান মিরাজ। এমনকি দেশের মাটিতে এই সময়ে আব্দুর রাজ্জাককেও খেলানো হয়েছে।

এত কিছুর ভিড়ে তাইজুলের একক নায়ক হওয়ার সুযোগ আর কোথায়। তাইজুল একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগটা পেলেন নিজের প্রিয় প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

প্রথম ইনিংসের মত তাই দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের বোলিংয়ের নায়ক তাইজুল ইসলাম। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট পাওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও তিনি পেলেন পাঁচ উইকেট। দুই ইনিংস মিলে পেলেন ১১ টি উইকেট।

ক্যারিয়ারে এবারই প্রথমবারের মত টেস্টে ১০ কিংবা তাঁর চেয়ে বেশি সংখ্যক উইকেট নিলেন তাইজুল। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ বোলার হিসেবে ম্যাচে দশ বা ততোধিক উইকেট নিলেন এই বাঁ-হাতি স্পিনার। আগের তিনজন হলেন এনামুল হক জুনিয়র, সাকিব আল হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ। এর মধ্যে সাকিব আল হাসান এই কীর্তি গড়েছেন দু’বার। তিনবারই এই ১০ উইকেট নেওয়া রেকর্ড হয়েছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। কাকতালীয় ব্যাপার হল, পাঁচবারই এই কীর্তি গড়া প্রত্যেকেই স্পিনার।

সিলেটে তৃতীয় দিনে চা বিরতির পর অল আউট হওয়ার আগে জিম্বাবুয়ে করতে পারে ১৮১ রান। জিম্বাবুয়েকে আটকে ফেলার মূল কৃতিত্বটা তাইজুলের। ৬২ রানের বিনিময়ে পাঁচ উইকেট পেয়েছেন তিনি। সাজঘরে পাঠিয়েছেন ব্রেন্ডন টেলর, শন উইলিয়ামস, সিকান্দার রাজা, পিটার মুর ও টেন্ডাই চাতারাকে।

প্রথম ইনিংসে ১০৮ রান দিয়ে ছয় উইকেট নেন তিনি। এর অর্থ হল ১৭০ রানে ১১ উইকেট নিয়েছেন তিনি। এক টেস্টে এটা বাংলাদেশের তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগার।

২০১৬ সালের অক্টোবরে ঢাকার মিরপুরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং পরিসংখ্যান ছিল ডান হাতি স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজের। ঐ ম্যাচে ১৫৯ রানে ১২ উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের পক্ষে সেরা বোলিং করেছিলেন এই ডানহাতি স্পিনার।

মিরাজের পরই আছেন এনামুল হক জুনিয়র। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২০০ রানে ১২ উইকেট নেন এনামুল। ২০ টি টেস্টের ৩৬ টি ইনিংস শেষে তাইজুল ইসলাম এখন ৮০ টি উইকেট বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী বোলার। তার আগে আছেন কেবল সাকিব আল হাসান (১৯৬) ও মোহাম্মদ রফিক (১০০)। গতকালকেই তিনি ৭৮ উইকেট নেওয়া মাশরাফি বিন মুর্তজাকে ছাড়িয়ে গেছেন।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত পাঁচ কিংবা তাঁর বেশি সংখ্যক উইকেট পেলেন। আর একবার করে পেয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে।

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এখন চার ম্যাচের আট ইনিংস শেষে তাইজুলের উইকেট সংখ্যা এখন ২৮ টি। তিনি আর কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিপক্ষে এত বেশি সংখ্যক উইকেট পাননি তিনি। জিম্বাবুয়ের মত অন্য দলগুলোর বিপক্ষে উইকেট পাওয়া শুরু করলে নিশ্চয়ই স্টারডমের আক্ষেপটা ঘুঁচবে তাইজুলের।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।