যে ভুলের গভীরে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসছে

গত বিশ্বকাপের আগে লিখেছিলাম, ‘আশা করি, ২০২৩ বিশ্বকাপে ইডেন বা ওয়াংখেড়েতে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন সাকিব আল হাসান।’ সেই আশা আমার এখনও আছে। সাকিব ফিরবেন, নিজেকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাবেন, দেশের ক্রিকেটকে পরের ধাপে নিয়ে যাবেন। সেই বিশ্বাস প্রবলভাবেই আছে।

তবে ভবিষ্যতের মতো বর্তমানকেও আমার বিশ্বাস করতে হবে। সেই বিশ্বাস বলছে, সাকিব ভুল করেছেন। বড় ভুল। সেই ভুলের গভীরে গেলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

আইসিসির অফিসিয়াল মেইল দেখে বড় ধাক্কা খেয়েছি। অ্যাপ্রোচের কথা তিনবার রিপোর্ট করতে ভুলে গেছেন সাকিব, তিনবার! আমি বারবার পড়েছি। পাশের কয়েকজনকে দেখিয়েছি। তিনবারই তো? ঠিক দেখছি?

একবার ভুলে যেতে পারি। দুই বার গুরুত্ব না দিতে পারি। তিনবার! সেটাও এক-দেড় বছরের মধ্যে হলে বুঝতাম অনেক ব্যবধান বলে ভুলে গেছেন। কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই তিনবার, ভুলে যাওয়া যায় কিংবা গুরুত্ব না দেওয়া যায়!

আইসিসির মেইলে বিস্তারিত প্রেক্ষাপট দেখে আরও বেশি শকড হয়েছি। হুটহাট টুকটাক কথা নয়, সাকিব ওই লোকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছেন। ‘এই সিরিজেই কিছু হবে নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব?’, ‘ব্রো, এই সিরিজে কিছু হবে?’ ইঙ্গিত তো স্পষ্ট। সাকিবের না বোঝার কারণ নেই। তবু রিপোর্ট করলেন না?

আইপিএলের ম্যাচে একজন ক্রিকেটার একাদশে আছেন কিনা, এটি জানতে চাওয়া, ভেতরের তথ্য জানতে চাওয়া, সেসবেও ইঙ্গিত স্পষ্ট। তবু রিপোর্ট করেননি।

তবু ধরে নিয়েছি তিনি ভুলে গেছেন। পাত্তা দেননি। গুরুত্বই দেননি। কিন্তু বিটকয়েন, সাকিবের ডলার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত জানতে চাওয়া, এসব দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছি। সাকিব বোঝেননি এসব?

বেশ কিছু ম্যাসেজ সাকিব মুছে দিয়েছেন। কেন? কেন মুছলেন? কেন!

সাকিব জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন, ওই লোককে বুকি বলে তার সন্দেহ হয়েছিল। অথচ ওই লোকের সঙ্গে তিনি দেখা করতে চেয়েছিলেন। দেখা করতে চাওয়া অংশটুকু দেখে প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টের আগে, প্রায় প্রতিটি সিরিজের আগে, প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টের আগে আকসু ক্রিকেটারদের পইপই করে বলে দেয় এইসব সম্পর্কে। কিভাবে অ্যাপ্রোচ করা হতে পারে, কিভাবে তারা এগোতে পারে, কোন ধরনের টোপ দেওয়া হয়, কেমন ভাষা ব্যবহার করা হয়, সব বিস্তারিত বলা হয়। ড্রেসিং রুমের সামনে লেখা থাকে। অনেক জুয়াড়ির ফোন নম্বর, ছবি ক্রিকেটারদের দেখানো-জানানো হয়।

এই যে বিশ্বকাপ গেল, সব দলের সঙ্গে একজন আকসু কর্মকর্তা ছিলেন। এমনকি অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদেরও এখন এসব ক্লাস করানো হয়। সাকিব এত বছর বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন, ক্রিকেট বিশ্ব জুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলে বেড়াচ্ছেন, তার এসব মুখস্থ হয়ে যাওয়ার কথা। আকসুর অন্তত ২৫-৩০টি ক্লাস তিনি করেছেন তো বটেই। তার পরও রিপোর্ট না করার গুরুত্ব বুঝবেন না? আকসুর জিজ্ঞাসাবাদে সাকিব স্বীকার করেছেন, তিনি জানতেন, রিপোর্ট না করা মানে বিধি ভঙ্গ করা।

তার পরও কেন করেননি রিপোর্ট? কেন দেখা করতে চেয়েছিলেন? কেন বেশ কিছু ম্যাসেজ মুছলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে দম আরও আটকে আসে। তাই খুঁজতে যাচ্ছি না। সমীকরণ মেলাতেও চাই না।

সাকিব আকসুর কাছে দাবি করেছেন, রিপোর্ট না করলেও, তিনি ওই জুয়াড়িকে দলের ভেতরের কোনো তথ্য দেননি। কোনো অর্থ বা উপঢৌকন নেননি। আমি সেটাই বিশ্বাস করছি।

পাশাপাশি এই বিশ্বাসে যেন আর কখনও চোট না লাগে, সেই দাবিও করছি তার কাছে। সাকিব ফিরবেন নিশ্চিতভাবেই। ফিরবেন আরও ভালোভাবে, ক্রিকেটের আঙিনায় আরও ভালো কিছু করতে, আরও আলো ছড়াতে। তার ক্রিকেটীয় কীর্তিতে আমরা আবার হাসব। ক্রিকেটীয় ব্যর্থতায় পাশে থাকব। তাকে নিয়ে গর্ব করব। আবারও দেশের বাইরে গিয়ে বুক ফুলিয়ে বলব, আমি সাকিব আল হাসানের দেশের মানুষ। কিন্তু এমন কিছু ভবিষ্যতে জানতে, দেখতে, পড়তে চাই না, যা বুকের ভেতর দুমড়ে-মুচড়ে ফেলবে।

নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো শুধু এই ব্যাপারটির গুরুত্ব হালকা করেই তুলবে। সাকিবকে, এই দেশের ক্রিকেটকে, দেশের ক্রিকেট অনুসারীদের আরও হাস্যকর করে তুলবে (আরও হাস্যকর বলছি, কারণ ক্রিকেট অনুসারী হিসেবে আমরা আগে থেকেই বাইরের দেশে হাস্যকর)।

একটা কথা মনে রাখলেই চলে, সাকিব নিজে এই শাস্তি মেনে নিয়েছেন। সাকিব যে ধরণের চরিত্র, এত বড় কিছুতে বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকলেও তিনি শাস্তি মানতেন না। আপিল করার চান্স নিতেন। কিন্তু তিনি নিশ্চয়ই তার ভুলের মাত্রা জানেন। তাই শাস্তি একদম মেনে নিয়েছেন। এখন আমরা যদি না মানতে চাই, তাহলে বলতে হয় সাকিবের বোধেও আমাদের আস্থা নেই।

সাকিবকে শাস্তি দিলে জুয়াড়িকে কেন শাস্তি দিচ্ছে না আইসিসি, এই প্রশ্ন করছেন অনেকে। তাতেই বোঝা যাচ্ছে, আসলে ক্রিকেট অনুসারী হিসেবে আমরা এখনও প্রাইমারী পাশ করতে পারিনি। আইসিসি তো পুলিশ নয়। আর্মি নয়। তারা স্রেফ পারে, এই লোককে মাঠ থেকে বহিষ্কার করতে। মাঠে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে। তার তথ্য পুলিশকে দিতে। বাকিটা পুলিশের দায়িত্ব। এসব বিষয়ে একেক দেশের আইনও একেকরকম।

একটা উদাহরণ দেই। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সিরিজে বা বিপিএলে প্রতি ম্যাচেই বেশ কজন করে দর্শককে জুয়াড়ি সন্দেহে বের করে দেওয়া হয়। প্রবল সন্দেহ থাকলে পুলিশে দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশ তাদের আটকে রাখতে পারে না। আইনের ফাঁক গলে বের হয়ে যায়। এখানে বিসিবি কি করবে? তাঁদের দায়িত্ব ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের নিয়ে। তেমনি আইসিসিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে ক্রিকেটারদের।

আমির-আসিফদের ফিক্সিং কাণ্ডে নিষিদ্ধ করেছিল আইসিসি। ইংল্যান্ডের আইন অনুযায়ী প্রতারণার মামলায় তাঁদেরকে জেলে পাঠিয়েছিল সেদেশের পুলিশ। আশরাফুলকে নিষিদ্ধ করেছিল বিসিবির গড়া ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশে তেমন কোনো আইন নেই বলে তাঁকে জেলে যেতে হয়নি।

হ্যাঁ, তার পরও আইসিসির আরও অনেক কিছু করার আছে। আরও অনেক সন্দেহভাজন আছে। আরও অনেককে নিয়ে প্রশ্ন আছে। আরও জোরদার ভূমিকা তারা রাখতে পারে। অমুককে করে নাই কেন, তমুককে ধরে নাই কেন, এই প্রশ্নও উঠতে পারে। কিন্তু তাতে সাকিবের ভুলটা চাপা পড়ছে না। সাকিব ভুল করেছেন। সেটির শাস্তি পাচ্ছেন। অন্য আরও অনেকে, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক ভুল বা অন্যায়কারীকে আইসিসি শাস্তি দিক, এই আশা বা দাবি আমরা করতে পারি। এই তো।

নিষেধাজ্ঞার পেছনে বিসিবি সভাপতির ভূমিকা নিয়েও চর্চা হচ্ছে। তাকে ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের ক্রিকেটের যাবতীয় সঙ্কটে তাকে ধুয়ে দেওয়ার অনেক কারণ আছে। কিন্তু সামান্যতম বিবেচনাবোধ থাকলেও বলতে হবে, এই ঘটনায় বিসিবির বা তার করার কিছু ছিল না। এভাবে বলা ঠিক কিনা জানি না, তবু স্রেফ বাস্তবতার খাতিরে বলছি, গত কয়েক বছরে সরাসরি তার নাম ধরে, তাকে মেনশন করে আমার চেয়ে বেশি সমালোচনা আর কেউ করেছে বলে মনে হয় না।

আমার ফেসবুকের টাইমলাইন, আমার কাজের জায়গা সেসবের স্বাক্ষী। কদিন আগে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের সময়ও বিসিবি প্রধানকে এক ইঞ্চি ছাড় দেইনি। কিন্তু এই আমিই পাশাপাশি এটা বলছি, আকসুর বিষয়ে তার কিছু করতে পারার কথা নয়। আকসু আইসিসির অংশ হলেও পুরোপুরি আলাদা কাজ করে। তাদের তদন্তের ব্যাপারে অনেক সময় আইসিসির দু-একজন শীর্ষ কর্তা বাদে অন্যরাও জানে না। বিসিবি কোত্থেকে জানবে?

আমরা সাংবাদিকদের অনেকে যতটুকু জানি, কিছুদিন আগে আইসিসি সভায় গিয়ে বিসিবি সভাপতি জানতে পেরেছেন যে এমন একটি ঘটনা হতে যাচ্ছে। তবে শাস্তি কত বড় বা কেমন নিষেধাজ্ঞা, সেটি তখনও তাদের জানানো হয়নি। নিষিদ্ধ হচ্ছেন সাকিব, এটি জেনে এসেছেন বলেই হয়তো ধর্মঘটের সময় প্রেস কনফারেন্সে বিসিবি প্রধান মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন যে ‘ফিক্সিংয়ের ঘটনা আসছে।’ এটুকু বললাম ধারণা থেকে। আবার কালকে তিনি কেন বললেন যে আগে কিছুই জানতেন না, এটা আমরাও জানি না। উত্তর তিনিই দিতে পারবেন। তবে নরম্যালি, আকসুর তদন্তের ঘটনা আগেভাগে জানার কোনো কারণ তার নেই।

তবে বিসিবির কি কিছুই করার নেই এখন? সাকিবের নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে কিছু করার নেই। সাধারণত নিষিদ্ধ ক্রিকেটারদের ট্রেনিংয়ের সুবিধাও দেওয়া হয় না। বিসিবি সাকিবকে সেই সুবিধা দেবে বলে জানিয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বিসিবি করতে পারে, দিপক আগারওয়াল নামক জুয়াড়িকে যে ব্যক্তি সাকিবের নম্বর দিয়েছেন, বাংলাদেশের আরও ক্রিকেটারদের নম্বর দিয়েছেন, তাকে খুঁজে বের করুন। আইসিসির মেইলে আছে, সেই ব্যক্তি সাকিবের পরিচিত। তো খুঁজে বের করা খুব কঠিন? এরকম সবাইকে খুঁজে বের করুন। পুলিশে দিন। তাহলে ভবিষ্যতে আর কেউ এসব করতে ভয় পাবে। সেটা করতে না পারলে, ভবিষ্যতে তারা আরও অনেক ক্রিকেটারের সঙ্গে জুয়াড়িদের যোগাযোগের পথ করে দেবে।

বর্তমান ক্রিকেটারদের, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটারদের আরও সচেতন করুন। আরও শিক্ষিত করুন। আরও সতর্ক করুন।

ভারত সফরের আগেই কেন? বাংলাদেশ কি এতটাই শক্তিশালী দল হয়ে উঠল যে ভারতকে জয়ের জন্য চক্রান্ত করতে হবে? কবে হলো এত বড় দল? ভারতে গিয়ে এখন দুনিয়ার তাবত দল নাকানি চুবানি খায়। তারা আমাদের নিয়ে ষড়যন্ত্র করবে? বরং সাকিব না গেলে তাদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। কারণ, সাকিবই বাংলাদেশের বড় তারকা। ভারতে পরিচত। সে না থাকা মানে সিরিজের আকর্ষণ কমে যাওয়া। কমার্শিয়ালি অবশ্যই ক্ষতিকর।

আর সাকিব? মাঠের ক্রিকেটের কথা মনে হলেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আছে আপনা-আপনি। এত এত খেলা সামনে, দেশের বাইরে এত ম্যাচ, বিশেষ করে এত এত টেস্ট!

এক বছরে তার নিজের অনেক রান, অনেক সেঞ্চুরি, অনেক উইকেট, অনেক ম্যান অব দা ম্যাচ পারফরম্যান্স হারিয়ে গেল। তবে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হলো দেশের ক্রিকেটের।

এমনিতেই সাকিব না থাকা মানে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা এক লাফে অর্ধেক কমে যাওয়া। তার ওপর, তাকে ঘিরেই ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। দুই সংস্করণের অধিনায়ক, সামনে তিন সংস্করণেও হতেন। এই দল, এই দেশের ক্রিকেট নির্ভর করছিল তার ওপর। আপাতত সব থমকে গেল। অনিশ্চিত হয়ে গেল অনেক কিছু। সাকিব না থাকা মানে অন্যদের সুযোগ, নতুনদের মেলে ধরার সুযোগ, সবই সত্যি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে এসব কথা বাস্তবে কতটা সত্যি হবে, সেই সংশয় সবসময়ই থাকে। কাজেই সাকিব না থাকা মানে অপূরণীয় ক্ষতি।

সাকিব চ্যাম্পিয়ন পারফরমার। আবার চ্যাম্পিয়নের মতোই ফিরবেন। শুধু একটাই চাওয়া, এই এক বছরে দেশের ক্রিকেট এক যুগ পেছনে না গেলেই হয়।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।