সুশান্তের ‘খুনী’!

সুশান্ত সিং রাজপুত খুব বিরল অভিনেতাদের একজন, যারা নিজের জন্য পথটা নিজেই বানিয়েছেন। নিজের পরিশ্রম আর প্রতিভা দিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, এরপর চির বিদায় নিয়েছেন।

জীবনের শেষ অধ্যায়ে সুশান্ত তীব্র মনোকষ্টে ভুগেছেন। হেয়ারস্টাইলিস্ট ও সুশান্তের বন্ধু স্বপ্না ভবানীর মতে, ‘এটা মোটেও গোপন কিছু নয় যে গেল কয়েকটা বছর খুব কঠিন ছিল সুশান্তের জন্য। ইন্ডাস্ট্রির কেউ ওর পাশে এসে দাঁড়ায়নি, সাহায্যের হাত বাড়ায়নি। আজ ওকে নিয়ে টুইটের শেষ নেই, এতেই প্রমাণ হয় যে এই ইন্ডাস্ট্রির বাস্তবতাটা কেমন। এখানে কেউ কারো বন্ধু নয়।’

অথচ, আজ মৃত্যুর পর টুইটারে তাঁর পাশে সবাই আছেন, যখন আর কিছুই বাকি নেই। এমনকি টুইটারে সেই আলিয়া ভাটও শোক প্রকাশ করেছেন, যিনি ‘কফি ‍উইদ করন’ শো-তে এসে সুশান্তের নাম শুনে বলেছিলেন – ‘সুশান্ত হু?’

আলিয়ার সেই কথাটাকে সেদিন হেসে উড়িয়ে দেওয়া করন জোহরও বলছেন, ‘সুশান্তের চলে যাওয়া বলিউডের জন্য ঘুম ভাঙার ডাক…’। এই প্রসঙ্গে সময়ের সেরা তারকাদের একজন আয়ুষ্মান খোড়ানা’র ‘বই ক্র্যাকিং দ্য কোড: মাই জার্নি ইন বলিউড’-এর কয়েকটা লাইন না বললেই নয়।

ক্যারিয়ারের শুরুর সাফল্যের পর আকাশে ‍উড়তে থাকা আয়ুষ্মান ভেবেছিলেন, এবার হয়তো ধর্ম প্রোডাকশন হাউজের সাথে ছবি করার সুযোগ হবে তাঁর। আগ বাড়িয়ে ফোন করেছিলেন। প্রথমদিন ফোন করে ‍শুনলেন করন জোহর অফিসে নেই, পরদিন শুনলেন করন জোহর ব্যস্ত, এরপরদিন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না আয়ুষ্মান। ধর্ম প্রোডাকশন থেকে বলা হয়, ‘আমরা শুধু তারকাদের সাথে কাজ করি, তোমার সাথে আমরা কাজ করতে পারবো না।’

এই প্রত্যাখ্যানের গল্পটা সুশান্তের ক্ষেত্রে আরো বেশি খাটে। শোনা যায় ‘ছিচোড়ে’র আকাশচুম্বি সাফল্যের পরের ছয় মাসে সাতটি ছবি হাতছাড়া হয় সুশান্তের। পার্থক্য এটুকুই যে, মানসিক দৃঢ়তায় আয়ুষ্মানের চেয়ে সুশান্ত পিছিয়ে ছিলেন। তাই, হয়তো জীবনটাকে অসহ্য ঠেকছিল।

বলিউডের অন্দরমহল চুপচাপ একটা প্রতিভাকে শেষ হতে যেতে দিয়েছে। নির্মাতা শেখর কাপুরের বহুল আলোচিত ‘পানি’ ছবিতে এক মাস শ্যুটিং করেন সুশান্ত। শেখর কাপুরের ভাষ্যমতে, ‘আমি জানতাম কি কষ্টের মধ্য দিয়ে তুমি যাচ্ছো। আমি সেই সব মানুষের গল্প জানি যারা তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। যেটা ঘটেছে, সেটার জন্য তারাই দায়ী।’

বোঝা গেল, সুশান্তের খুনী কে? বন্ধুহীন বলিউডের নেপোটিজমের সংস্কৃতি নয়তো!

নিজের পরিনতিটা সুশান্ত আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। মজা করে একবার টুইটারে লিখেছিলেন, ‘আমাকে একদিন ওরা বলিউড থেকে ছুড়ে ফেলবে। আমার কোনো গডফাদার নেই।’ কে বুঝেছিল, সেই মজার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এতগুলো বছরের না পাওয়ার কষ্ট!’

সবচেয়ে মোক্ষম ব্যাখ্যাটা দিলেন অভিনেত্রী কঙ্গনা রনৌত। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘ বলা হচ্ছে মানসিক ভাবে দুর্বল ব্যক্তিরাই অবসাদে ভোগেন, আত্মহত্যা করেন। কিন্তু যে ছেলেটা স্ট্যানফোর্ডের স্কলারশিপ পায়, ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষায় সপ্তম হয়, সে মানসিক ভাবে ভঙ্গুর হয় কি করে? সোশ্যাল মিডিয়ায় সুশান্তের শেষদিককার পোস্ট দেখুন, ছেলেটা আকুতি করে বলছে, আমার ছবি দেখুন। আমার কোনও গডফাদার নেই। ছবি না চললে ইন্ডাস্ট্রি থেকে বের করে দেওয়া হবে আমাকে। অনেক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ করেছে, ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে আপন করে নিচ্ছে না। ওর মৃত্যুর সাথে এর কোনো সংযোগ নেই তো?’

বরাবরের মত আবারো পক্ষপাতিত্ব ও নেপোটিজমের ভিত নাড়িয়ে দিলেন কঙ্গনা। বললেন, ‘অভিষেক ছবি কাই পো চে-র জন্য কোনো স্বীকৃতিই ও পায়নি। এম এস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি, কেদারনাথ, ছিচোড়ের জন্যও না। গালি বয়ের মতো বাজে ছবি এক গাদা পুরস্কার পায়, অথচ বছরের সেরা ছবি ছিচোড়ে পুরস্কারহীন থাকে। এক শ্রেণির সাংবাদিকরা অন্ধ। ওদের চোখে সুশান্ত মানসিক রোগী, নেশাগ্রস্থ। আবার সঞ্জয় দত্ত নেশা করলে সেটা খুব সুন্দর।’

এত কিছু বলা পর এখন এই কঙ্গনার কথাটাকেই সবচেয়ে সত্য বলে মনে হচ্ছে – ‘এটা আত্মহত্যা নয়, খুন!’

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।