জলে দাঁড়িয়ে ডাঙার হিসাব মিলবে না

মৃত্যু বেদনার, কষ্টের। কারো কাছে মুক্তির নিয়ম। কারো কাছে এভারেস্টের চূড়ার মতো ভয়ংকর সুন্দর। তবে মৃত্যু অনেক কিছুর উপলক্ষও। ইদানিং মৃত্যুগুলো আনুষ্ঠানিকতা, উপলক্ষ হয়ে ধরা দেয়। ‘আমাদের’ একটা শোক দেখানো আবহ, মর্মাহত হওয়ার চেষ্টা চলে শব্দে শব্দে, ছবিতে ছবিতে।

বিষন্নতা, একাকীত্ব, নিজের প্রতি বিরক্তি এসে যাওয়া, নিজেকে ভালোবাসতে না পারা, কথা বলার জায়গা না পাওয়া, থেকেও সেই জায়গাটা না থাকা, এসবই ডিপ্রেশন। এসবই ডিপ্রেশনের এলিমেন্ট। এসবই একেকটা বালুকণা, গড়ে তোলে হতাশার একটা সৈকত। যেখানে খাবি খাই অনেকেই।

মোটিভেশন। দুনিয়ার বাজারে এটাও আরেক বড়সড় ধান্দা। সবচেয়ে বড় ভুলটা কোথায় জানেন? এই মোটিভেশনের নামে একেকটা ডিপ্রেসড মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয়, ‘তুমি ব্যর্থ’। মোটিভেশনের মানে দাঁড়িয়েছে হাত ধরে টেনে তোলা।

আমার এক বড় ভাই বলেন, ‘যদি কোনো কিছু বা কাউকে ভুলতে চাও তো ভুলার চেষ্টা করো না।’

মুভ অন করো, বাদ দাও, এই চিন্তা দূরে রাখো, এটা ভুলার জন্য ওটা করো; এই শব্দগুলোর আড়ালে বাজে অক্ষমতার বিউগল। বারবার মনে করিয়ে দেয়া হয় তুমি ব্যর্থ।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে, মৃত্যু কেবল মানুষকেই নিয়ে যায় না চিরতরে। সাথে দিয়ে যায় কিছু ট্রেন্ডিং ইস্যু। চেস্টার চলে গেলেন দুই বছর আগে। মিম পেজগুলোতে ভাইব বদলে গেল, ‘ইফ ইউ এভার ফিল ডাউন, নক মি, উই উইল টক’।

প্রায়ই খবর আসে, টগবগে ছেলেমেয়েগুলো ডেথ নোট লিখে আত্মহত্যা করে। তখনও এসব দেখি।

এটাকে আমার কাছে স্রেফ ট্রেন্ড মেশানো করুনা, দয়া দাক্ষিণ্য মনে হয়। যদি এত সহজেই বলা যেত সব, বললেই যদি সব ঠিক হয়ে যেত, তাহলে কার্ট কোবেইন, চেস্টার, মেরিলিন মনরোরা এভাবে চলে যেতেন না হয়তো। তাহলে সমাধানটা কোথায়? আমার জানা নেই। জলে দাঁড়িয়ে ডাঙার হিসাব যে মিলবে না।

চাপা কষ্টগুলো একটু ছড়িয়ে দিলে সাময়িক হালকা লাগে, কিন্তু কষ্টের দাগ ঠিকই রয়ে যায়। কাছের কিংবা দূরের মানুষ, কথা শোনার ধৈর্য নেই ম্যাক্সিমামেরই। আগে দেয়া চাই মতামত, যেকোনো ইস্যুতেই।

‘এই রাস্তায় একসাথে হাঁটি চলো, দেখি কত কাঁটা বিছানো আছে। লেটস রাইড টুগেদার।’

বি এ লিসেনার। ইট মাইট হেল্প।

সিনেমায় কতকিছুই হয়। অনিরুদ্ধরা বাঁচতে শেখান, মাহীরা শেষ ট্রেনটায় চেপে বসে ভাগ্য বদলান, মনসুর খানরা ধর্মের বেড়াটা ডিঙিয়ে যান অনায়াসে, ইশানরা রাঙিয়ে দেন, আলী হাশমিদের জীবনের ক্যানভাস। ওসব কেবল রিলের ঘূর্ণণে, রুপালি পর্দার আলো আঁধারির খেলাতেই হয়।

তবে বদলায় না কোবেইন, চেস্টার, সুশান্ত, আমার, আপনার, আমাদের আশেপাশে, চোখের সামনের, আড়ালের, অলক্ষ্যের, দুনিয়ার অন্য এক প্রান্তের মানুষের গল্প। সময়ের স্রোতে টিকতে না পেরে কেউ খরচা হয়ে যায় খুচরা পয়সার মতো। কেউ টিকে থাকে, টিকে থাকতে হয় বলে।

‘ছিচোড়ে’ সিনেমাতে সুশান্ত বলেছিলেন, ‘জীবনের যদি কোনো কিছু ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে থাকে…সেটা হচ্ছে জীবন।’

কই মিলল না তো!

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।