অপরাধের স্বর্গ মুম্বাই: বর্বর আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিস্ময়কর দুনিয়া

মুম্বাই হল জাদুর শহর। তাজ হোটেল, জুহু সৈকত – এদের অপার্থিব সৌন্দর্য মুগ্ধ করবে যেকোন কাউকেই। অচেনা এক ছেলের রাতারাতি বলিউড পাড়ার হিরো হয়ে যাওয়া কিংবা বস্তি থেকে উঠে আসা এক সাধারণ ছেলের শহর কাপানো ‘মাফিয়া’ হয়ে যাওয়া সবকিছুর পিছনেই থাকে এই স্বপ্নময়ী শহর মুম্বাই।

এই শহরের রন্ধ্রে বইছে মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য। বলিউড কাপানো সেরা অনেক ছবির মূল কাহিনী ছিলো এই মাফিয়া সাম্রাজ্য। নায়কদের হিরোগিরিতে রুপালি পর্দায় ডনদের উপস্থিতি যদিও ভিলেন হিসেবে কিন্তু বাস্তবতা বলছে অন্য কথা।

মুম্বাই শহরের রাস্তা কাপিয়ে, গলি মহল্লা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাফিয়ারা। তাদের এই আধিপত্যের গোড়া পত্তনের ইতিহাস সেই সাথে তাদের এই সাম্রাজ্য ধরে রাখার পিছনের কারণগুলোই আজ তুলে ধরব আপনাদের সামনে।

  • শক্তিশালী নিয়মনিষ্ঠ অবকাঠামো

মুম্বাইতে মাফিয়াদের শক্তিশালী আধিপত্যের পিছনের মূল কারণটি হল তারা সাংগঠনিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের সাংগঠনিক দক্ষতা এতটাই শক্ত যে তারা ভারত সরকারের যেকোন প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক বেশি নিয়মনিষ্ঠ দক্ষতা প্রদর্শন করে।

  • টাকা উপার্জনের যত কৌশল

মাফিয়াদের অর্থ উপার্জনের জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করাটা এই শহরে অনেক বেশি প্রচলিত। ছোটখাটো হুমকি থেকে অপহরণ, চাঁদাবাজি কিংবা খুন সবকিছুই ছিলো তাদের অর্থ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তবে স্মাগলিং তথা চোরাচালান তাদের প্রধান অর্থ উপার্জন ক্ষেত্র, এই ‘ধান্ধা’ বন্ধ হয়ে গেলে মুম্বাইয়ের মাফিয়াদের পতন ঘটবে নিমিষেই।

  • একটি ‘প্রশংসনীয়’ পুরাতন সংঘটন

ঠিক কবে থেকে মুম্বাইতে মাফিয়াদের রাজত্ব শুরু হয়েছে তা সঠিকভাবে বলাটা কষ্টসাধ্য। তবে যতটুকু জানা যায়, মূলত ৪০-এর দশকে এই শহরে জুয়া আর চোরাচালানের সূত্রপাত ঘটে। মূলত সেই থেকেই এই শহর মাফিয়াদের রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পায়।

  • আপনারা কি আইয়ুব লালাকে চিনেন?

শুরু থেকেই মুম্বাইতে অসংখ্য মাফিয়াদের উত্থান পতন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সব থেকে বেশি আলোচিত ও মাফিয়া সাম্রাজ্যের প্রথমদিকের নায়ক বলা হয় আব্দুল করিম শের খানকে। তিনি আইয়ুব লালা বা করিম লালা নামেও পরিচিত ছিলেন।

  • তিনিই হলেন এই রাজ্যের অধিপতি

প্রায় ১৩০০০ আফগানি নিয়ে গড়ে উঠা এই সংঘটনের মূল নায়ক ছিলেন আইয়ুব লালা। এই মাফিয়ার বদৌলতে মুম্বাই শহরের সব বার এবং নাইটক্লাব এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন আইয়ুব লালা যা কিনা আগে গুজরাটি, মারোয়াড়িদের এক চেটিয়া ব্যবসার উৎস ছিলো।এইভাবেই আইয়ুব লালা মুম্বাই শহরের সকল নিষিদ্ধ জগতের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেয়।

  • ডি-কোম্পানি ও ‘ভাই’-এর উত্থান

 

আইয়ুব লালা সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে বহু বছর আগে। এখন মুম্বাই শহরে একছত্র অধিপতি বজায় রেখেছেন ডি-কোম্পানি। ডি-কোম্পানি হল মূলত দাউদ ইব্রাহীমের অন্যতম শক্তিশালী সংঘটন। এটি বাধা ধরা সন্ত্রাসী গ্রুপের পাশাপাশি নামকরা জঙ্গি সংঘটন হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে।

  • মাদক চোরাচালানের কেন্দ্রবিন্দু

মুম্বাইকে বলা হয় ‘গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া’ অর্থাৎ ভারতের প্রবেশদ্বার। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়ে মাদকচোরাচালানের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে মাফিয়া সংঘটন গুলো। ইউরোপ সহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে মাদক চোরাচালানের সকল কাজ এই শহর কেন্দ্রিক হয়ে থাকে।

  • কুখ্যাত হেরোইন ব্যবসা

ইন্ডিয়াকে বলা হয় আফিম উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্ডিয়ার মোট আফিমের ৫-৮% হেরোইনে রুপান্তর করা হয় এবং বিশ্বের সকল প্রান্তে এর সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। আর এই মাদক চোরাচালানের সকল গুরুদায়িত্ব ডি-কোম্পানির হাতেই ন্যস্ত।

  • বলিউডের আড়ালের নায়ক, নাকি খলনায়ক?
অভিনেত্রী মন্দাকিনির সাথে দাউদ ইব্রাহিম, ডি কোম্পানির প্রধান

বলিউডের সর্বেসর্বা বলা হয় দাউদ ইব্রাহীমকে। দাউদ কিংবা তার সঙ্গীদের দ্বারা আয়োজিত বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা পার্টিতে তাই বলিউডি হিরো হিরোইনদের আসা যাওয়া লেগেই থাকত।

  • তাদের কী ‘না’ করা যায়?

আচ্ছা ডি-কোম্পানি যদি আপনাকে তাদের কোন অনুষ্ঠানে চায় তবে আপনি কি তাদের কে না করতে পারবেন? উত্তর অবশ্যই না।দেখা যাক যারা না করেছেন তাদের কি অবস্থা হয়েছে। বিখ্যাত সুরকার গুলশান কুমারকে গুলি করে হত্যা করা হয় যখন সে আন্ধেরি স্টেট এর মন্দিরে যাচ্ছিলো। এমনকি, পরিচালক রাকেশ রোশন তাঁর ব্যবসাসফল সিনেমা ‘কাহো না প্যায়ার হ্যায় লভ্যাংশ ভাগাভাগি করতে, মানে চাঁদা দিতে অস্বীকৃত জানালে তাকেও গুলি করে জখম করা হয়।

সঙ্গীত পরিচালক জুটি নাদিম-শ্রাবনের সাথে গুলশান কুমার (মাঝে)।
  • চলমান উত্থান

মাফিয়াদের এই জৌলুসপূর্ন মাঠে নতুন সদস্যের উত্থান খুবই স্বাভাবিক। দাউদ ইব্রাহিমের পরে মুম্বাইয়ের মাফিয়া সাম্রাজ্যের দখল অনেকটাই এখন তার সহযোগী ছোটা রাজনের হাতে ন্যস্ত।

  • ধর্মীয় শত্রুতা? অসম্ভব!

এই মাফিয়া সাম্রাজ্য এমন একটি জায়গা যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ কোন ব্যাপার না। হিন্দু মুসলিম হাতে হাত রেখে কাজ করে।আজ পর্যন্ত ধর্মীয় ভেদাভেদের কারণে এই সাম্রাজ্যে কোন গণ্ডগোলের কথা শোনা যায়নি। আসলে সবার পেট চালানোর উপায় যখন একটাই তখন ভেদাভেদ ভুলে একসাথে পা চালানোটাই শ্রেয়।

দাউদ ও ছোটা রাজন

– টপইয়াপস অবলম্বনে


Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।