অথচ ব্রাত্য সুপ্রিয়া দেবী

|| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে ||

সুপ্রিয়া দেবী জাতীয় পুরস্কার মঞ্চেও ব্রাত্য রয়ে গেলেন। কেন? তিনি একজন আঞ্চলিক ছায়াছবির নায়িকা বলে? নাকি তিনি সমাজের চোখে চিরবাড়তি বলে?

যেখানে ভারতবর্ষের সবগুলি ভাষার ছবিকে পুরস্কার প্রদান করা হয়, সেখানে সুপ্রিয়া দেবীর প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই কেন?

যেখানে মরণোত্তর দাদাসাহেব পুরস্কারে বিনোদ খান্নাকে ভূষিত করা হল। অথচ বছরের আরেক মহাতারকা নায়িকা অভিনেত্রীকে ব্রাত্য করে দেওয়া হল।

দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার যদি দিতেই হল যৌথ ভাবে সুপ্রিয়া দেবী ও বিনোদ খান্নাকে দেওয়া যেত।

এটুকু সম্মান প্রাপ্য সুপ্রিয়া দেবীর ছিল। নায়িকা পেলেন গান স্যালুট কিন্তু দহিত বহ্নিত হলেন সারাজীবন।প্রয়াণের পরও দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার তাঁর জুটলনা।

প্রথমত বিনোদ খান্নাকে সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত করলেও তাঁর অসুস্থতার সময় কেউ খবর রাখতেননা। একটা বিনোদ খান্নার অসুস্থ ছবি ভাইরাল হওয়ায় সকলে জানল। কিন্তু নিজেরা তো কেউ খোঁজ নেয়নি।

যাই হোক, বিনোদজীর চেয়েও সুপ্রিয়া দেবী অনেক সিনিয়র তবু তাঁকে ভুলে গেল কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রপতিজী। বেণুদির হাঁটু অপারেশনের জন্য যদিও আগের সরকারের মনমোহনজী টাকা পাঠিয়েছিলেন।কিন্তু এভাবে একজন মহাতারকাকে বাদ দিল কিভাবে আজকের স্মৃতিতর্পণ থেকে ?

দ্বিতীয়ত সুপ্রিয়া দেবী বিনোদ খান্নার চেয়েও উন্নতমানের অভিনেত্রী। যাঁর অভিনয় ছিল ডিএনএ তে। নইলে ক্যারিয়ারের শুরুতেই ঋত্বিক ঘটকের মতো পরিচালকের চরিত্র ‘নীতা’ এবং ‘অনসূয়া’র মতো কালাতিক্রম্য চরিত্র করতে পারেন?

বিনোদের চেয়ে সুপ্রিয়া দেবীর ফিল্মোগ্রাফ অনেক সমৃদ্ধ। যা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত হবার মতো।

যদি, আবেদন ধরা হয় তবে বিনোদকে বলিউডে প্রথম সারির আবেদনময় নায়কের কাতারে রাখতে হবে। যার অভিনয়ের চেয়েও আবেদনে চোখ সরেনা। ঠিক তেমনি সুপ্রিয়ারও আবেদন কম ছিল না। তিনি সে সেসব করতে গিয়ে রীতিমত নতুন যুগের সূচনা করেছিলে।

তিনি সুচিত্রা সেনের অপাপবিদ্ধতার পাশে নিজের সাহসী লাস্যের ট্রেন্ডসেটার। সুচিত্রা সেনকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে নির্বাচিত করা হয়। সুচিত্রা নয়াদিল্লি গিয়ে ভারতের অত্যন্ত সম্মানজনক দাদাসাহেব ফালকে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এ সম্মাননা প্রত্যাখ্যানকারী একমাত্র মহাতারকা তিনি।

সুচিত্রা সেনের সুললিত সৌন্দর্যের কাছে বাঙালি সুপ্রিয়া দেবীকে একটু পিছিয়ে রাখলেও সুপ্রিয়া অভিনয় দাপট ও সাহসীকতায় বাঙালি মিথ একের পর এক ভেঙেছেন। মূলধারার ছবিতেও সমান সফল। বলিউডে যিনি কিশোর কুমার নায়িকা। উত্তম কুমারের ছবি গুলির অনেকটা ভূমিকা যার প্রাপ্য। তাঁকে ভুলেই গেল জাতীয় পুরস্কার কর্তৃপক্ষ।

এত একজন জনপ্রিয় সফল নায়িকাকে কি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়া যেতনা? যেখানে মৃত্যুর জন্যই শ্রীদেবী বিনোদ খান্না অনেকটাই এগিয়ে যান পুরস্কার পাওনায়। বিনোদ খান্নার প্রয়ান না ঘটলে তাঁকে ফালকে পুরস্কার দিত কিনা সন্দেহ।

এদের তো মৃত্যুর পরই পুরস্কার দেবার কথা মনে পড়ে। তপন সিনহাকেও যখন ফালকে পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁর আর বোধ নেই।

সুপ্রিয়া দেবী অভিনয়ে অনেক অনেক এগিয়ে শুধু একজন আঞ্চলিক ছবির নায়িকা বলেই কি তাঁকে স্মরণ করা হলনা? পুরস্কার দেওয়া হলনা? তাহলে কি সাবিত্রীও পাবেননা এই পুরস্কার? যেহেতু তাঁর ঝুলিতে বড় পরিচালক নেই। কিন্তু বড় পরিচালকের বহু ছবির প্রযোজক তিনি ছিলেন বলেই আজ তাঁরা লেজেন্ডারি পরিচালক।

সাদাকালো কাব্যে নীতার বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত তাই কোথাও যেন মিশে যায় কাব্যধারার নায়িকা সংজ্ঞা। সেই কাব্য ধারার রূপ গন্ধকে নতুন করে পূরণ করেন সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়ার সঙ্গে আশ্চর্য মিল ছিল ইউরোপিয় জনপ্রিয় নায়িকাদের। তাই তিনি শুধুই আঞ্চলিক নায়িকা নন।

আর কোন ব্যাক্তিগত জীবনে রসের আলোচনার চাটনি খেয়ে একজন নায়িকার মূল্যায়ন হয়না। সুপ্রিয়া তাঁর ক্যারিয়ারের পিক সময়টা উত্তম সেবায় দিয়েছিলেন। আবার ওনার সফলতার পেছনে উত্তমকুমারের অবদানও কমনা। কিন্তু ট্যালেন্ট তো ছিল যা আবিস্কার করেন তারাশংকর থেকে ঋত্বিক।

পশ্চিমঙ্গের বাঙালি শিল্পীরা কলাকুশলীরা দর্শকরা আনন্দে আত্মহারা ঋদ্ধি সেন সেরা অভিনেতা হওয়ায়। কিন্তু ২০১৮ জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত করা হল প্রয়াত অভিনেতা বিনোদ খান্নাকে।

অথচ ব্রাত্য সুপ্রিয়া দেবী। তাঁকে শেষ প্রণাম টুকু জানালো না সর্বভারতীয় ছবির আসর। পেলেননা নতজানু শ্রদ্ধা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।