টেন্ডুলকারের কালো চশমা || ছোটগল্প

চশমাটাকে ঠিক কালো বলা যায় না। লাল রংটা অতি গাঢ় বলে দূর থেকে কালো মনে হয়।

খেলোয়াড়ী জীবনে মাঠে খুব একটা রোদ চশমা পরতেন না শচীন টেন্ডুলকার। টেস্টে ফিল্ডিং করার সময় মাঝে মাঝে দেখা যেতো চশমা পরা। তবে অবসর নেওয়ার পর সুট-টাইয়ের সাথে এই রোদ চশমাটা তার সঙ্গী হয়ে উঠেছিলো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই চশমাটা পরা টেন্ডুলকারকে আগেও দেখেছে রবিন।

পাইলট শেপের একটা চশমা। খুব দামী কোনো ব্র্যান্ডের হবে। রবিন এতো ব্র্যান্ডের খবর রাখে না। তবে পাভেল চশমাটা একবার দেখেই বললো, ‘এটা তো রেব্যানের চশমা। অনেক দাম রে।’

সে কোনো ব্র্যান্ড না হলেও রবিনের কাছে এটার অনেক দাম। চশমাটা খোদ টেন্ডুলকার নিজের চোখ থেকে খুলে দিয়েছেন।

টেন্ডুলকারের সাথে রবিনের এমন কোনো খাতির ছিলো না। তাই এই চশমাটা তার পাওয়ার কথা না। কিন্তু এটা পেয়ে গেছে সে টেন্ডুলকারকে বোল্ড করে।

সত্যি বলছি। টেন্ডুলকারকে সেদিন বোল্ড করেছিলো রবিন।

এই ঢাকায় একটা ক্রিকেট দলের জার্সি আর লোগো উন্মোচন করতে এসেছিলেন টেন্ডুলকার। ফাইভ স্টার একটা হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছিলো। সেই অনুষ্ঠান টিভিতে দেখেছিলো রবিন। ওর বাবা-মামা কেউ এমন কোনো বড়লোক বা কিছু না যে, ওকে এই অনুষ্ঠানে নিয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানটা দেখতে দেখতে রবিনের মনে হচ্ছিলো, একবার এই লোকটাকে সামনে থেকে দেখতে পেতাম!

রবিনের কথা মনে হয় বিধাতা শুনেছিলেন। পরদিন নাঈম স্যার বললেন, শুধু দেখা না, টেন্ডুলকারের সাথে খেলতেও পারবে রবিনরা।

রবিন ধানমন্ডির একটা ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং করে। গত বছর অনুর্ধ্ব-১৬ দলের জন্য ট্রায়াল দিয়েছিলো; হয়নি। তবে স্যাররা বলছেন, ওর অনুর্ধ্ব-১৮ টিমে চান্স হয়ে যাবে। খুব ভালো লেগস্পিন করে। নাঈম স্যার এ জন্য ওকে একটু বেশীই পছন্দ করেন। সেদিনও বলছিলেন, ‘শোন রবিন, মন দিয়ে প্র্যাকটিস কর। টপ লেভেলে ভালো কোনো লেগস্পিনার নাই। তোর একটা ভালো চান্স আছে।’

রবিনের বাবা একটা স্কুলে মাস্টারি করেন। সে দিয়ে বেশী টাকা আয় হয় না। সংসারের অভাবটা এখন বুঝতে পারে রবিন। তাই এই অ্যাকাডেমিতে মাসে মাসে এক গাদা টাকা খরচ করতে নিজেরই খারাপ লাগে। তারপরও চান্সের স্বপ্নে খেলাটা চালিয়ে যায়।

অবশ্য বাবাকে এই গত সপ্তাহে বলেছিলো, ‘বাবা, আমার আর অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং করার দরকার নেই।’

‘ক্যানো?’

‘আমি ওর চেয়ে পাড়ার মাঠে একটা একটা ট্রেনিং করলে ভালো করতে পারবো।’

বাবা খুব অবাক হয়েছিলো, ‘এটা কী বলিস! তোকে নিয়ে সবাই কতো স্বপ্ন দেখছে।’

‘স্বপ্ন তো থাকবেই। আমি সে জন্য কষ্ট করবো।’

‘কিন্তু অ্যাকাডেমি ছাড়বি কেনো?’

‘অনেক টাকা চলে যাচ্ছে ওখানে।’

বাবা ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘টাকার কথা তোকে ভাবতে হবে না। নিজের কাজ কর।’

মা পাশ থেকে হেসে বলেছিলেন, ‘এরপর খেলে যখন আয় করবি। আমাদের টাকা ফেরত দিয়ে দিস।’

অমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখতে খুব ভালো লাগে।

রবিনের স্বপ্ন দুটো – বড় বড় খেলোয়াড়দের অটোগ্রাফ নেওয়া এবং একদিন নিজে বড় খেলোয়াড় হওয়া।

নাঈম স্যারকে তাই আজ বলছিলো, ‘স্যার, টেন্ডুলকারের একটা অটোগ্রাফ নেওয়া যায় না?’

‘শুধু অটোগ্রাফ নিবি? খেলবি না তার সাথে?’

রবিন ভেবেছিলো, স্যার দুষ্টুমি করছেন। তাই হেসে বললো, ‘উনি খেলা ছেড়ে না দিলে ওনাকে বল করতাম।’

এবার নাঈম স্যার সিরিয়াস হয়ে বললেন, ‘শোন, আগামীকাল টেন্ডুলকারকে বল করবি তুই।’

‘আমি!’ – চিৎকার করে উঠেছিলো রবিন।

নাঈম স্যার ধমক দিয়ে বললেন, ‘তুই একা না। আমাদের পাচ জন বোলার রেডি থাকবে। উনি যার যার বল খেলেন আর কী।’

কিন্তু ব্যাপারটা কী, কিছুতেই বুঝতে পারছিলো না রবিনরা।

নাঈম স্যার অবশেষে বুঝিয়ে বললেন। যে ক্লাবটা টেন্ডুলকারকে এনেছে, ওরা কাল ধানমন্ডি মাঠে নিয়ে আসবে ওনাকে। উনি এখানে এসে বাচ্চাদের সাথে একটু ক্রিকেট খেলবেন। আর ইউনিসেফ না কাদের একটা অনুষ্ঠানে যাবেন। সেই অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে যতটুকু সময় পান।
সারাটা রাত রবিনের ঘুম হলো না।

সে কী লেগ স্পিন করবে, নাকি একটা গুগলি মেরে দেবে? স্যারকে জিজ্ঞেস করতে হবে একটা টপস্পিনার করলে কেমন হয়!

ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে পড়লো। বাবা মাত্রই নাম পড়ে এসেছেন। রবিনকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘এখনই উঠে পড়েছিস?’

রবিন একটু লজ্জা পেয়ে বললো, ‘সকাল সকাল মাঠে যেতে হবে তো।’

রবিনের সাথে ওর মা-বাবাও এলেন। কিন্তু বেলা গড়িয়ে যায়, টেন্ডুলকারের আর কোনো দেখা নেই। অবশেষে ১১টার দিকে মাঠের পাশে হুম হুম করে কয়েকটা কালো গাড়ি থামলো। একটা থেকে নেমে এলেন শচীন রমেশ টেন্ডুলকার।

টিভিতে দেখতে লোকটাকে খুব বেটে মনে হয়। আসলে কিন্তু অতোটা বেটে নন। প্রায় নাঈম স্যারের মতোই লম্বা। কালো সুট-টাই পরা, ভেতরে একটা স্ট্রাইপ শাট এবং চোখে গাড় লাল সেই চশমাটা। দেখে বুকটা ধক করে উঠলো রবিনের।

টেন্ডুলকার এসে সবার সাথে হাত মেলালেন। রবিনের শরীরটা কেপে উঠলো। এরপর পাশে একটা লোককে কী যেনো বললেন। সেই লোকটা বললো,
‘শোনো বাচ্চারা, তোমাদের সাথে স্যার এখন খেলবেন। তোমরা ফিল্ডিং সাজিয়ে ফেলো। স্যার পাচ জন বোলারের একটা করে বল খেলবেন।’

ও মা! এক ওভার পাওয়া যাবে না?

রবিনের একটু মনটা খারাপ হলো। তারপরও নাঈম স্যারকে জিজ্ঞেস করলো, ‘স্যার, আমি এক বল পাবো?’

‘অবশ্যই পাবি।’

একটু ভালো লাগলো। স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ডেলিভারি করবি?’

‘স্যার, টপ স্পিন করি?’

‘নাহ। গুগলি মার।’

‘ঠিক আছে স্যার।’

রবিনের পালা এলো চার নম্বরে। ততোক্ষণে হাসতে হাসতে টেন্ডুলকার একটা চারও মেরে দিয়েছেন।

রবিন বল হাতে নিয়ে রানআপটা মেপে নিলো। নিজের বুকে একটা ফু দিয়ে নিলো। একবার বাবা-মায়ের দিকে তাকারো। তারপর দৌড়ে এসে জোরের ওপর উল্টো ঘুরানো একটা ডেলিভারি করলো – টেন্ডুলকার খেলতেই পারলেন না। বল চলে গেলো কিপারের হাতে।

ইস!

আরেকটু কম টার্ন করলে বোল্ড হয়ে যেতো। রবিন ফিরে আসছিলো। তখনই টেন্ডুলকার ডাক দিলেন, ‘এই বাচ্চা। তোমার নাম কী?’

‘রবিন, স্যার।’

‘আরেকটা বল করো। এবার গুগলি না। লেগস্পিন করো।’

রবিন উত্তেজনায় কাপতে থাকলো। আবারও একই অ্যাকশনে দৌড়ে এসে জেনুইন টার্ন করালো বলটা। লেগস্ট্যাম্পের বাইরে পড়ে ছোবল দিয়ে ভেতরে চলে এলো – বোল্ড!

টেন্ডুলকার অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। ব্যাটটা এক জনের হাতে দিয়ে হেটে এগিয়ে এসে বললেন, ‘ওর কোচ কে?’

নাঈম স্যার এগিয়ে গেলেন,

‘স্যার, আমি।’

‘খুব ভালো প্রতিভা। দেখে রাখবেন।’

এরপর রবিনের দিকে ফিরে বললেন, ‘বলো, তোমার কী গিফট চাই?’

রবিন লজ্জা পেয়ে গেলো, ‘না, স্যার। গিফট চাই না। আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেন।’

‘বলটা নিয়ে এসো। ওটাতে অটোগ্রাফ দেই।’

রবিন লাফ দিয়ে উঠলো। এটা খুব দাবী গিফট হলো। কিন্তু টেন্ডুলকার সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। গাড়িতে ওঠার আগে আবার রবিনকে ডাক দিলেন। চোখ থেকে চশমাটা খুলে বাড়িয়ে দিলেন, ‘এটা তুমি নাও।’

‘স্যার, না। দরকার নেই।’

‘নাও। তুমি যখন জাতীয় দলে খেলবে, এটা পরে খেলো। আমি তোমাকে টিভিতে দেখতে চিনতে পারবো।’

রবিনের চোখ দুটো কেনো যেনো পানিতে ভরে এলো।

টেন্ডুলকার চলে যেতেই সবাইকে ওকে ঘিরে ধরলো। ওকে মাথার ওপরে নিয়ে সবার কী হইচই। স্বয়ং টেন্ডুলকারের কাপছ থেকে দুটো গিফট পেয়েছে। তার একটা আবার কালো চশমা!

বাবা একটা চশমার সুন্দর খাপ এনে দিলো দোকান থেকে। রবিন ওটা পরে না। এখন পরলেও অবশ্য বেখাপ্পা লাগে। যত্ন করে তাই তুলে দিয়েছে শোকেসে।

রবিনের এখন অবশ্য চশমা নিয়ে ভাবার সময় মেলে না। একটার পর একটা খেলা। আজ রংপুর, কাল সিলেট; অনুর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপ হচ্ছে। ঢাকা মেট্রো দলের হয়ে সারা দেশে খেলে বেড়াচ্ছে। এবার এই লিগটায় ভালো করতে পারলে অনুর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যেতে পারে।

এর মধ্যে ১৩ ম্যাচে ৩৬ উইকেট পেয়ে গেছে রবিন। সবাই বলছে, এখন জাতীয় দলে খেলাটা সময়ের ব্যাপার। রবিনও মোটামুটি জাতীয় দলে ডাক পেলে কী করবে, ঠিক করে ফেলেছে।

সেদিন বাসে বসে বসে সেই কথাই ভাবছিলো।

ওরা রাজশাহী থেকে ফিরছে ঢাকায়। রাজশাহী দলের বিপক্ষে খেলা ছিলো। রবিন ৫ উইকেট পেয়েছে। এবার চ্যাম্পিয়নশিপে ওর প্রথম ৫ উইকেট। এখন বলা যায়, রবিন জাতীয় দল দেখতে পাচ্ছে।

পাভেল বললো, ‘কী রে, ঘুমিয়ে গেছিস নাকি?

‘নাহ। বাসায় গিয়ে ঘুমাবো।’

‘সামনের বছর নিউজিল্যান্ডে আন্ডার নাইনটিন ওয়ার্ল্ড কাপ। তুই তো খেলে ফেলবি মনে হচ্ছে।’

রবিন একটু হেসে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়লো।

হঠাৎ কী একটা বোমা ফাটার মতো আওয়াজ, মুখ পুড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতিতে ঘুম ভেঙে গেলো। শুধু পাভেলের চিৎকার শুনতে পেলো, ‘অ্যাক্সিডেন্ট…’।

__________

মুম্বাইতে একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট উদ্বোধন করতে এসেছেন শচীন টেন্ডুলকার। বাংলাদেশ থেকে আসা দলটার একটা ছেলেকে দেখে চেনা চেনা লাগলো। চশমাটার দিকে ভালো করে তাকালেন। এই চশমাটা তিনি চেনেন। কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমাকে কী আমি চিনি?’

‘জ্বি, স্যার। আমি রবিন। আমাকে এই চশমাটা আপনি দিয়েছিলেন।’

টেন্ডুলকার হতভম্ব হয়ে ছেলেটার দিকে চেয়ে রইলেন। ছেলেটা হাসলো, ‘স্যার এখন আপনার চশমাটা আমার সত্যিই কাজে লাগছে।’

টেন্ডুলকার বললেন, ‘কিন্তু…’

‘আপনি বলেছিলেন না, জাতীয় দলে খেললে চিনতে পারবেন। আমি এখন ব্লাইন্ড ক্রিকেটের জাতীয় দলে খেলি।’

রবিনের চোখে চকচক করছে রেব্যানের রোদ চশমাটা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।