সুমিতা দেবী: হারানো দিনের ‘অবমূল্যায়িত’ নায়িকা

ঢাকার ছবির জগতে প্রথম দিককার নায়িকা হলেন সুমিতা দেবী। সুমিতা দেবী অভিনীত ‘আকাশ আর মাটি’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৯ সালের ২৪ জুলাই। এই ছবিটি তাঁর অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির মধ্যে প্রথম।

তবে তিনি ‘আসিয়া’ ছবিতে প্রথম অভিনয় শুরু করেছিলেন। ‘আসিয়া’ ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শহীদ। কিন্তু ছবির কাহিনী অনুযায়ী – সুমিতা দেবীর বিয়ে হয়েছিল প্রেমিকের চাচা কাজী খালেকের সঙ্গে।

সুমিতা দেবী তাঁর অভিনয় জীবনে আনুমানিক পনেরোটির মতো ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছিলেন। পার্শ্ব-চরিত্রেও তিনি একসময় বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।

চলচ্চিত্রে যোগ দেয়ার পর তাঁর নাম হয়েছিল সুমিতা দেবী। তাঁর আসল নাম হেনা। ১৯৩৬ সালের দুই ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম মানিকগঞ্জে। ১৯৪৪ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে হেনা ঢাকায় চলে আসেন। এসেই বাংলাবাজার গার্লস স্কুলে ভর্তি হন।

এদিকে ১৯৫১ সালে ঢাকায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে হেনা বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতায় চলে গেলেন।

পশ্চিম বাংলার বর্ধমানে কিছুদিন ছিলেন, এরপর কলকাতায় ফিরে আসতেই হেনার বিয়ে হয়ে গেল বামপন্থী পার্টির নেতা অতুল লাহিড়ীর সঙ্গে। ওদের এ বিয়ে বেশিদিন টিকলো না।

সুমিতা দেবী আবার ফিরে এলেন ঢাকায়। ১৯৫৭ সালে এ জে কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছবিতে তাঁর নায়িকা হিসেবে অভিনয় করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয় নি। কারণ, তখন তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। পরে তাঁর পাওয়া চরিত্রটি করেছিলেন তৃপ্তি মিত্র।

জহির রায়হান ও সুমিতা দেবী। তখন তারা স্বামী-স্ত্রী।

‘আকাশ আর মাটি’ এবং ‘আসিয়া’ ছবির পরে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছিলেন এ দেশ তোমার আমার, কখনো আসেনি, সোনার কাজল, সঙ্গম, কাঁচের দেয়াল, এই তো জীবন, দুই দিগন্ত – প্রভৃতি ছবিতে। ছবিগুলো  ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে মুক্তি পেয়েছিল।

১৯৫৯ সালের শেষদিকে ‘কখনো আসেনি’ ছবিতে কাজ করতে গিয়ে জহির রায়হানের নজরে পড়লেন তিনি।

দিলীপ কুমারের সাথে সুমিতা দেবী

এক সময় সুমিতা দেবীরও ভালো লেগে গেলো জহির রায়হানকে। তারপর মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে নিলুফার বেগম নামে আত্মপ্রকাশ করেন। জহির রায়হানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

তাঁদের সুখের সংসার টিকে ছিল মাত্র আট বছর। এরপর জহির রায়হান আবার বিয়ে করলেন নায়িকা সুচন্দাকে। অত:পর সুমিতা দেবীর জীবনে আবার একাকিত্ব নেমে এলো।

সুমিতা দেবী কয়েকটি ছবিও প্রযোজনা করেছিলেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছবি হলো মায়ার সংসার, আদর্শ ছাপাখানা, নতুন প্রভাত, আগুন নিয়ে খেলা, মোমের আলো – ইত্যাদি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সুমিতা দেবী তখন তাঁর কোলের দুই সন্তান অনল-বিপুলকে নিয়ে কলকাতায় চলে যান। কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে সুমিতা দেবী উত্তম কুমারের বিপরীতে ‘শ্রী শ্রী সত্য শাহী বাবা’ নামে একটি ছবিতে অভিনয় করা শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ৮০ ভাগ শ্যুটিং শেষে ছবির কাজ আর এগোলো না। সুমিতা দেবী জীবদ্দশায় এ কথা তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর অবদান ছিল। দেশে যতদিন ছিলেন এফডিসিতে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখভালের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। কলকাতায় বাংলাদেশি শিল্পীদের সংগঠনের ব্যানারে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মিছিল-মানববন্ধন করেছেন, তহবিল সংগ্রহ করেছেন।

সুমিতা দেবী মারা যান ২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি, ঢাকাতেই।

নায়িকা হিসেবে সুমিতা দেবী অভিনীত উল্লেখযোগ্য ছবি

  • ১৯৫৯ সালে – আকাশ আর মাটি। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আমিন ও প্রবীর কুমার। এ দেশ তোমার আমার। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনিস।
  • ১৯৬০ সালে – আসিয়া। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শহীদ।
  • ১৯৬১ সালে – কখনো আসেনি। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনিস।
  • ১৯৬২ সালে – সোনার কাজল। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – খলিল।
  • ১৯৬৩ সালে – কাঁচের দেয়াল। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনোয়ার হোসেন।
  • সঙ্গম। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – খলিল।
  • ১৯৬৪ সালে – এই তো জীবন। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – রহমান। দুই দিগন্ত। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আনোয়ার হোসেন। ধূপছাঁও। এটি ছিল লাহোরের ছবি। তাঁর নায়ক ছিলেন – এজাজ। এজাজ হলেন বিখ্যাত নায়িকা – গায়িকা নূরজাহানের দ্বিতীয় স্বামী।
  • ১৯৬৮ সালে – জনম জনম কি পিয়াসী। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হায়দার শফি। অভিশাপ। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – শওকত আকবর ও আনোয়ার হোসেন। অশান্ত প্রেম। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – হায়দার শফি।

সুমিতা দেবী অভিনীত ছবির সংখ্যা আনুমানিক দুই শতাধিক। ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বেতার ও টেলিভিশনের নাটকেও নিয়মিত ভাবে অভিনয় করেছিলেন। সুমিতা দেবী অভিনীত আরো কয়েকটা উল্লেখযোগ্য ছবি হল – বেহুলা, ওরা ১১ জন, আমার জন্মভূমি, বউ কথা কও, সমাধান, নতুন প্রভাত, মনিমালা, রংবাজ, স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা, সুজন সখী, অভাগী, এপার ওপার, ডাক পিওন, গরমিল, দস্যু বনহুর, গুন্ডা, আগুন, সূর্যকন্যা, জননী, অলঙ্কার, সোনার হরিণ, লাল সবুজের পালা, জন্ম থেকে জ্বলছি, লাল কাজল, নাত বউ, দুই পয়সার আলতা ইত্যাদি।

এত কিছুর পরও আজকের দিনে তাঁর মূল্যায়ন নেই বললেই চলে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।