সাফল্যের জাহাজে তাল হারানো নাবিক

বাংলাদেশ জাতীয় দলের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হওয়ার আগেই যে ‘নাটক’ করেছেন খালেদ মাহমুদ সুজন, তা নিদেনপক্ষে কোচ না হলে টের পাওয়া দুষ্কর। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর একজন কোচ কিন্তু পদের নাম আলাদা। চান্দিকা হাতুরুসিংহের নাটকীয় পদত্যাগের পর মুর্তজা-সাকিবদের দায়িত্ব দেওয়া হলো সুজনকে, কিন্তু প্রথম সিরিজেই খেলেন ধাক্কা। অভিজ্ঞ কোচরা সহজে কাবু হন না। কিন্তু তিনি পারলেন না। ব্যর্থতা লুকোতে গিয়ে ক্ষেপে উঠলেন গণমাধ্যমের উপর। ২২ গজে না খেলেও, অপরাধী বনে গেল বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিকরা।

সুজন বুঝিয়ে দিলেন, সাম্রাজ্য একটাই। কিন্তু রাজা হওয়ার যোগ্যতা সবার থাকতে নেই, থাকলেও সেটা ধরে রাখার মতো সঙ্গতি সবার থাকেও না। তিনি নিজেই তার প্রমাণ।

১.

প্রবাদে আছে, মা দূর্গার দশ হাত। কিন্তু স্থান, কাল ভেদে এই হাতের সংখ্যা বেড়ে যায়। যেমন ২০১৬ সালেই তো, কলকাতায় এক হাজার হাতের দূর্গা প্রতিমা বানানো হয়েছিলো। কল্পনায় বিরক্তি আসতে পারে। দূর্গার সাথে সুজনের সদ্ভাব কিংবা সখ্যতা কোথায়। আছে। ভাবুন তো, একজন জলজ্যান্ত মানুষ। একই সঙ্গে আবাহনী লিমিটেডের ক্রিকেট কোচ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক, টেকনিক্যাল ডিরেক্টর, নির্বাচক প্যানেলের সদস্য, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) ঢাকা ডায়নামাইটসের কোচ, একটা অ্যাকাডেমিতে কাজ করেন সঙ্গে আছে বেক্সিমকোর চাকরি। মিল খুঁজে পাওয়া গেল? বোধ হয়।

টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করেছেন জাতীয় দলের ম্যানেজার হিসেবে। হারুতুরিংহে যখন কোচের দায়িত্ব ছাড়লেন, তখন সুজনকে বলা হলো এ যাত্রা কোচের দায়িত্বটা যেন তিনি কাঁধে তুলে নেন। বিদেশি কোচ পেলে আবারও আগের পদে ফিরে যাবেন। অভিমান হলো সাবেক অধিনায়কের। ফলাও করে বললেন, অসম্ভব। কোচ হলে তিনি স্থায়ীভাবেই হবেন। না হলে নয়। দুয়েকদিনের জন্য তিনি কোচ হতে নারাজ। অথচ এই সুজনই, হাজার বার গণমাধ্যমে বলে এসেছেন বাংলাদেশের কোচ হওয়া তার স্বপ্ন, কোচ তিনি হবেন। হতে চান।

হাতি পাঁকে পড়লে নাকি ব্যাঙেও লাথি মারে। তাই হলো বিসিবির। তখন ক্রিকেট পাড়ায় চলছে বিপিএলের ডামাডোল। তার মধ্যেই চলছে বিদেশি কোচের খোঁজ। দেশে এলেন রিচার্ড পাইবাস, যিনি আগেও বাংলাদেশের কোচ ছিলেন। এলেন উইন্ডিজের সাবেক কোচ ফিল সিমন্স। দুজনেরই সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো আয়োজন করে। কিন্তু দায়িত্ব দেওয়া হলো না কাউকেই। পাইবাসেও সমস্যা, সিমন্সের তো আরও বেশি সমস্যা। তিনি নাকি ক্রিকেটারদের স্বার্থ বোঝেন, বোর্ডের না। তাহলে তাকে কেন নেবে বোর্ড! হাতে ধরে কেউ বিপদ ঘরে তোলে?

শেষ পর্যন্ত আবারও সুজনের শরণাপন্ন হতে হল। বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজিও করা হলো। তবে তা পদের ভিন্নতায়। হেড কোচ নয়, টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের পদে। আর বিসিবি বোর্ড সভাপতি বলে দিলেন, ‘কোচ ছাড়ায় জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজ ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ।’ বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আয়োজন করে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে মিশনে নামলেন সুজন। বাকিটা? অপেক্ষায় থাকুন।

২.

ত্রিদেশীয় সিরিজে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু করলেন সুজন। সবার আগে পেসারদের ব্যাটিং অনুশীলনে মনোযোগী করলেন। তার ফলও পেলেন। জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শুরুতেই জয় তুলে নিলো বাংলাদেশ। আর কে পায় সুজনকে! সুজন পেয়ে গেলেন নিজের পথ। এত দিনের ক্রিকেটীয় অভিজ্ঞতা আর কোচিংয়ের অভিজ্ঞতার মিশেলে দল নিয়ে ভালোই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু প্রথম ধাক্কাটা খেলেন ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে। চান্দিকা হাতুরুসিংহের দলের সামনে ফাইনালে হেরে গেল বাংলাদেশ।

এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে হারতে হারতে ড্র হলো। সমালোচনার মুখ থেকে বেঁচে গেলেন। তবে টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে আব্দুর রাজ্জাককে ৪ বছর পর জাতীয় দলে যোগ করেও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ‘নবিশ’ সানজামুল ইসলামের অভিষেক করানোটা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলো। সেটা টেরও পেয়েছিলেন সুজন।

সংবাদ সম্মেলনে তাই বলেছিলেন, ‘রাজ্জাক হয়তো ইন্টারন্যাশনাল ফিগার, কিন্তু আামাদের সাথে ছিল না। অনেক দিন জাতীয় সেট আপেই ছিল না। যদিও রাজ্জাকের অভিজ্ঞতা নিয়ে কারো কথা বলার কিছু নেই। আমাদের জন্য দারুণ অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। আমাদের বিশ্বাস হয়ত সানজামুলের প্রতি বেশি ছিল।’

সেই বিশ্বাসের মর্যাদা সানজামুল দিতে পারেননি। সে কথা যাক। ঢাকায় এসে তো অবস্থা আরও খারাপ। স্পিন উইকেটে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশ হেরেছে ২১৫ রানের ব্যবধানে। দল হারবে, দল জিতবে। তাতে কোচ কিংবা নির্দিষ্ট ক্রিকেটাররা সমালোচনার মুখে পড়বেন, কখনও বা পুরো দল ধরেই সমালোচনা হবে। সেটা মেনে নেওয়ার মধ্যেই কিনা ক্রিকেটীয় আভিজাত্য। কিন্তু তাতে ব্যর্থ সুজন।

প্রথমত, ঢাকার মিরপুর টেস্টের আগে হুট করে দলের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে। সেখানে ফেরানো হয়েছে সাব্বির রহমানকে। সৈকত চট্টগ্রামে ভাল করেননি বটে। দুই ইনিংসে ৮ রান করে মোট তুলেছিলেন কেবল ১৬। কিন্তু নিঃসন্দেহে টেস্টের জন্য তিনি সম্ভাবনাময়। সাব্বিরও পরীক্ষিত। তাই বলে যাকে ভাবনাতেই রাখা হয়নি, তাকে ফেরানোর কারণ কি? পর্দার আড়ালে গুঞ্জন চলছিলো নেতিবাচক কিছুর। চলছে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল)। সেখানে সৈকত খেলছেন আবাহনীর হয়ে। তাহলে কি ক্লাবের স্বার্থের জন্যই জাতীয় দল থেকে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলানো সৈকতকে? শুনলে হাস্যকর মনে হয়।

এ কথা কানে যেতে সময় লাগেনি সুজনের। ক্ষেপেছেন চরম। কিন্ত দায়টা দিয়েছেন গণমাধ্যমকে। আবেগ আপ্লুত হয়ে বাংলাদেশ দলের দায়িত্বও ছেড়ে দিতে চেয়েছেন তিনি! জায়গাটাকে অভিহিত করেছেন ‘নোংরা’ হিসেবে!

৩.

খালেদ মাহমুদ সুজন ক্রিকেট নিয়ে কতটা অন্তঃপ্রাণ, তা শত্রুরাও জানে। এ জায়গায় তাকে টলানো দুস্কর। দিন শেষে তার কাছে ‘নিজের দলের’ ক্রিকেট স্বার্থ বরাবরই আগে। এমনও শোনা যায়, ক্রিকেটের জন্য তিনি সব করতে পারেন। ২০০০ সালের আগে ও পরের সময়ে যে মানুষগুলো দেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করার জন্য লড়ে গিয়েছে ২২ গজে, তাদের মধ্যে সুজনের নাম আসবেই। তা নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশই নেই।

কিন্তু মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টেস্টের আগে যেন অন্য কোনো সুজনকে পাওয়া গেল! দল নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা, রণপরিকল্পনার এক ফাঁকে বলে দিলেন, এই ‘নোংরা’ জায়গায় কাজ করবেন না। ক্রিকেটের এত চাপ সহ্য করে এসে তার মুখে এমন কথা যেন এক কথায় অস্বাভাবিক।
বললেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি আর আগ্রহী না। আমার আসলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গেই কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। আমার আসলে নোংরা লাগছে সত্য কথা বলতে গেলে। এত বছর বাংলাদেশ ক্রিকেটের সঙ্গে কাজ করছি, বাংলাদেশের উন্নতির জন্যই কাজ করছি। এখানে আমার কোনো স্বার্থ নাই। আমি আর আগ্রহী না।’

সুজনের দাবি, ভালো কোচিং করিয়েছেন এই দুটো সিরিজে। ফল যেমন পেয়েছে, ব্যর্থতাও এসেছে। কিন্তু তার ব্যর্থতাকেই বড় করে দেখা হচ্ছে। তার ভাষায়,  ‘অনেক বেটার কোচিং হয়েছে এবার। আমরা পারি নাই, বলতে হবে কোচরা মাঠে খেলে না। এই ছেলেরাই আগে ভালো খেলেছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি। যদি বলি, আমরা তো চিটাগংয়েও হারতে পারতাম। আমরা তো দুইটা উইকেট নিতে পারছিলাম না সাকিব ছিল না দেখে, তবে কাউকে ছোট করছি না।’

লোকমুখে শুনেছেন, তার এমন কোচিং আর সিদ্ধান্তের জন্য নাকি রাস্তায় বের হলে মার খেতে হতে পারে। এ নিয়ে দায় দিলেন গণমাধ্যমকে। তাদের ‘বাড়াবাড়ি’তেই এমন হাল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এই সংবাদমাধ্যমগুলো পিছনে টেনে রাখছে কিনা, তা নিয়ে তদন্তের দাবি তুলেছেন।

সুজন বলেছেন, ‘নোংরা বলতে মিডিয়াতে যেভাবে লেখা হয়। আমাদের ক্রিকেটের বড় অন্তরায় হচ্ছে মিডিয়ারও একটা ব্যাপার আছে যে আমরা এত ফিশি হয়ে যাচ্ছি আসলে। এখন মিডিয়া ফিশি। মিডিয়ার কারণে আমাদের ক্রিকেট আটকিয়ে আছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। ক্রিকেট আমরা এত বছর ধরে খেলতেছি। এখন এত গসিপিং । মিডিয়াতে ভাল খারাপ সবই হবে। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছি। ক্রিকেটের জন্য খুব কঠিন। একটে ছেলেকে তুলে নিয়ে আসা এত ইজি না।’

বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে চান্দিকা হাতুরুসিংহের আমলে কি ছিল, সেটা এখন সাধারণ সমর্থকরাও জানে। তার স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত, দলকে বেঁধে রাখা;সবকিছুই দৃষ্টিগোচর হয়েছিলো গণমাধ্যমের বরাতেই। কিন্তু সুজনের দাবি, হাতুরুসিংহে এসব ‘স্টাবলিশ’ করেছে গণমাধ্যম। এ কারণেই নাকি হাতুরুসিংহেকে চলে যেতে হয়েছে।
সুজন বলেন, ‘আপনারা এটা স্টাবলিশ করতে চান। চান্দিকা চলে গেল কেন। এটা স্টাবলিশ করানো হইছে।আমরা তো বাচ্চা খোকা না এখন। সবাই ত বড় হইছি। অনেক কিছু স্টাবলিশ করা হয়। আমার পিছনে যদি লেগে থাকা হয়, আমি কোনদিন ভালো করলেও ভালো হব না। এত বছর খালি ভাল করতে শুনিনি। এমনও শুনছি যে রাস্তায় গেলে আমাকে মার খাইতে হতে পারে। তো ক্রিকেট খেলার জন্য মার খেতে হলে এটা তো অকওয়ার্ড আসলে। কথার কথা বলছি।’

সেই ১৯৯৮ সালে, যখন বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটস পায়নি, তখন ওয়ানডে দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলে অভিষেক করেন খালেদ মাহমুদ সুজন। খেলেছেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত। ডানহাতি মিডিয়াম পেসার হিসেবে ১২ টেস্টে ১৩ উইকেটের সাথে ২৬৬ রান আর ৭৭ ওয়ানডেতে ৬৭ উইকেটের সাথে ৯৯১ রানের ক্যারিয়ার। খালেদ মাহমুদের এই পরিসংখ্যান দেখলে খুব সাদামাটা মনে হয়। বিদেশি সংবাদমাধ্যম তাই তাকে ফেলে, ‘বিশ্বের অযোগ্যদের একাদশ’ এ। তারপরও, তাদের হাতেই আজকের বাংলাদেশ। সেই তিনিই যখন গদি আঁকড়াতে গিয়ে ভরাডুবি করেন, তখন মিলিয়ে যায় আশার আলো।

টের পাওয়া যায়, সাম্রাজ্যের এই রাজাসন হয়তো খুব শক্ত। না হলে, সুজনের মতো মানুষ যে কিনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য সব করতে পারেন তিনি নিজের ব্যর্থতা লুকোতে গিয়ে পরের ঘাড়ে মই দেবেন!

হ্যাঁ, এই পদটাই এমন। হাতুরুসিংহেও ঘাট মেনেছেন, সুজনও হাঁটলেন একই পথে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।