রূপবান কন্যা সুজাতা

১৯৬৫ সালে ঢাকায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘রূপবান’ ছবিটি ছিল গানে গানে পরিপূর্ণ।  এই ছবির নায়িকা ছিলেন সুজাতা। রূপবান নাম ভূমিকায় অভিনয় করে বাঙালির প্রিয় ‘রূপবান কন্যা’ হয়েছিলেন তিনি।

সুজাতা ‘রূপবান কন্যা’ নামে খ্যাত হতেই তাঁকে সরাসরি দেখার জন্য জনতা অস্থির হয়ে পড়েছিল। রূপবান ছবিতে ছিল ৩০ খানা গান – সেই সব গানগুলো তখন কত না মানুষ পথ চলতে গিয়ে গুনগুন করে গাইতো। ‘ও দাইমা কিসের বাদ্য বাজে রে’ – ঘরে ঘরে এই গান বাজতো।

সুজাতা অভিনীত ‘রূপবান’ আকাশচুম্বী খ্যাতি পেয়েছিল। সেই সাফল্য পরবর্তীতে কোন ছবি ভাঙতে অনেক সময় লাগে। বাংলাদেশের ঢাকার ছবির ইতিহাসে ব্যবসা সাফল্যের দিক দিয়ে ‘রূপবান’ এখনও শীর্ষে।

এরপরে ‘অবুঝ মন’ ও ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র কথা বলা যেতে পারে। ‘রূপবান’ মুক্তির পরে সর্বশ্রেণীর দর্শকদের অন্তরে ছিল সুজাতা নামটি।  যেন হৃদয়ের নাম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন আজ বিস্মৃত।

রূপবান ছবির একটা দৃশ্য

লোক কাহিনিভিত্তিক ছবি মানেই কয়েক মিনিট পর পর গান। এমন ধরনের ছবি – জরিনা সুন্দরী (১৯৬৬), কাঞ্চনমালা (১৯৬৬), সাইফুল মূলক বদিউজ্জামান (১৯৬৭), রাখাল বন্ধু (১৯৬৭), মধুমালা (১৯৬৭), স্বর্ণকমল প্রভৃতিরও নায়িকা ছিলেন সুজাতা। সুজাতাকে বলা হয় – রূপবান কন্যা, জরিনা সুন্দরী আর কাঞ্চনমালা।

সুজাতার জন্ম ১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া শহরে। সেই সময় তাঁর নাম ছিলো ‘তন্দ্রা মজুমদার’। তিনি খুব ভালো নাচতে জানতেন।

অবুঝ মন

১৯৬০ সালের দিকে কুষ্টিয়ায় হিন্দু – মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে সুজাতা তাঁর পরিবারের সঙ্গে চলে এলেন ঢাকায়। ঢাকায় বসবাস করে নাটক ও থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন।

সিনেমায় অভিনয় করার সুযোগ করে দিলেন চিত্র পরিচালক সালাহউদ্দিন। সালাহউদ্দিনই তাঁর তন্দ্রা নাম পাল্টে রাখলেন সুজাতা।

অবাঞ্ছিত

১৯৬৭ সালের জুলাই মাসে তিনি চিত্রনায়ক আজিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। সুজাতা ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ঢাকার চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় নায়িকাদের মধ্যে একজন ছিলেন।

পার্শ্ব-নায়িকা হিসেবে ‘ধারাপাত’ ছবিতে অভিনয় করার আগে ‘দুই দিগন্ত’ নামে একটি ছবিতে নৃত্য দৃশ্যে অংশ নিয়েছিলেন। উর্দূ ছবি ‘পয়েসে’তে তিনি পার্শ্ব-নায়িকার ভূমিকায় কাজ করার পরে কাজী খালেকের ‘মেঘ ভাঙা রোদ’ ছবিতে একক নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছিলেন।

এরপরই ‘রূপবান’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল। রূপবান মুক্তি পাওয়ার পর তৎকালীন পূর্ববাংলায় লাহোর, কলকাতা, বোম্বের ছবির একচেটিয়া রাজত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। রূপবান দিয়েই ঢাকার বাংলা ছবির জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল।

সুজাতা অভিনীত উল্লেখযোগ্য কিছু ছবি

  • ১৯৬৩ সালে – ধারাপাত। মুক্তির তারিখ – ২৭ ডিসেম্বর, ১৯৬৩।
  • ১৯৬৪ সালে – পয়েসে। মুক্তির তারিখ – ২৮ আগষ্ট ১৯৬৪। মেঘ ভাঙা রোদ। মুক্তির তারিখ – ২ অক্টোবর। ছবিতে তাঁর নায়ক ছিলেন – আজিম। রূপবান। মুক্তির তারিখ – ৫ নভেম্বর।
  • ১৯৬৫ সালে – মালা। মুক্তির তারিখ – ২৬ নভেম্বর।
  • ১৯৬৬ সালে – রাজা সন্ন্যাসী। মুক্তির তারিখ – ২৫ মার্চ। তাঁর নায়ক ছিলেন – আনোয়ার হোসেন। রহিম বাদশা ও রূপবান। মুক্তির তারিখ – ১৮ মার্চ। তাঁর নায়ক ছিলেন – মান্নান। ১৩ নং ফেকু ওস্তাগারলেন। মুক্তির তারিখ – ১ জুলাই। পরোয়ানা। মুক্তির তারিখ – ২৬ আগষ্ট। তাঁর নায়ক ছিলেন – হাসান ইমাম। ডাকবাবু। মুক্তির তারিখ – ৯ সেপ্টেম্বর। তাঁর নায়ক ছিলেন – আজিম। ইস ধরতি পর। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। জরিনা সুন্দরী। মুক্তির তারিখ – ১৮ নভেম্বর। তাঁর নায়ক ছিলেন – মান্নান।
  • ১৯৬৭ সালে – আগুন নিয়ে খেলা। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ২২ মার্চ। আয়না ও অবশিষ্ট। নায়ক ছিলেন – বশির। মুক্তির তারিখ – ৬ মে। কাঞ্চনমালা। নায়ক ছিলেন – মান্নান। মুক্তির তারিখ – ৮ আগষ্ট। সাইফুল মুলক বদিউজ্জামাল। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ১৫ সেপ্টেম্বর। আলীবাবা। নায়ক ছিলেন – মেহমুদ। ম্যায় ভি ইনসান হু। নায়ক ছিলেন – মেহমুদ। মুক্তির তারিখ – ২৭ অক্টোবর
  • ১৯৬৮ সালে – মধুমালা। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ১৬ ফেব্রুয়ারি। রাখাল বন্ধু। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ১০ মার্চ। চেনা অচেনা। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ৩১ মে। এতটুকু আশা। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ২৮ জুন। মোমের আলো। নায়ক ছিলেন – আনসার। কুলী। মুক্তির তারিখ – ২০ সেপ্টেম্বর। মুক্তির তারিখ – ২২ নভেম্বর।
  • ১৯৬৯ সালে – গাজী কালু চম্পাবতী। নায়ক ছিলেন – হাসান ইমাম। মুক্তির তারিখ – ১৭ ফেব্রুয়ারি। পাতাল পুরীর রাজকন্যা। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ১০ মার্চ। শহীদ তিতুমীর। বেদের মেয়ে। মুক্তির তারিখ – ১৩ জুলাই। অবাঞ্ছিত। মুক্তির তারিখ – ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই। মায়ার সংসার। নায়ক ছিলেন – সরকার কবীর উদ্দীন। মুক্তির তারিখ – ২২ আগষ্ট। স্বর্ণ কমল। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ২৯ আগষ্ট।
  • ১৯৭০ সালে – সূর্য উঠার আগে। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ৯ জানুয়ারি। তানসেন। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ৬ ফেব্রুয়ারি। আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী। নায়ক ছিলেন – আজিম। মুক্তির তারিখ – ২০ মার্চ।
  • ১৯৭২ সালে – অশ্রু দিয়ে লেখা। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ১২ মে। অবুঝ মন। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক ও শওকত আকবর। শাবানাও এ ছবিতে নায়িকা ছিলেন। মুক্তির তারিখ – ৮ নভেম্বর। লালন ফকির। ১ সেপ্টেম্বর।
  • ১৯৭৩ সালে – এখানে আকাশ নীল। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ১৮ মে। মন নিয়ে খেলা। নায়ক ছিলেন – কায়েস। মুক্তির তারিখ – ১৩ জুলাই।
  • ১৯৭৪ সালে – টাকার খেলা। নায়ক ছিলেন – আজিম। অলিভিয়াও নায়িকা ছিলেন। বেঈমান। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ২৮ জুন। ঈশা খাঁ। মুক্তির তারিখ – ১৯ এপ্রিল। আলোর মিছিল। মুক্তির তারিখ – ২৫ জানুয়ারি।
  • ১৯৭৫ সালে – কুমারী মন। নায়ক ছিলেন – কায়েস। মুক্তির তারিখ – ৩১ জানুয়ারি। আপনজন। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। এ ছবিতে সুচরিতাও নায়িকা ছিলেন।
  • ১৯৭৬ সালে – প্রতিনিধি। নায়ক ছিলেন – রাজ্জাক। মুক্তির তারিখ – ১৬ জানুয়ারি। জীবন মরণ। নায়ক ছিলেন – ওয়াসিম। মুক্তির তারিখ – ১৯ নভেম্বর।
  • ১৯৭৭ সালে – সাহেব বিবি গোলাম। এ ছবিতে নায়ক ছিলেন – জাভেদ। শাবানাও নায়িকা ছিলেন। মুক্তির তারিখ – ২২ এপ্রিল। রাতের কলি। এ ছবিতে নায়ক ছিলেন – বুলবুল আহমদ ও আলমগীর। মুক্তির তারিখ – ২২ নভেম্বর। অশান্ত ঢেউ। নায়ক ছিলেন – আনসার।

 

সুজাতা অভিনীত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হলো – শহীদ তিতুমীর, অবাঞ্ছিত, ঈশা খাঁ, লালন ফকির, বড় বউ, বারুদ, আলোর মিছিল, ছুটির ঘন্টা ইত্যাদি।

২০০৬ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে কয়েকটি ছবি হলো – অস্তিত্ব, হিটম্যান, স্বামী স্ত্রীর ওয়াদা, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই, সুভা – ইত্যাদি।

এত টুকু আশা

সুজাতা এ পর্যন্ত ছোট পর্দায় শতাধিক নাটকেও অভিনয় করেছেন। ঢাকা টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে তিনি নাটকে অভিনয় শুরু করেছিলেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।