আত্মহত্যা: ‘অপশন’ নয়, বিলাসিতা

‘আত্মহত্যা’ ব্যাপারটাকে একটা ‘অপশন’ হিসেবে নিচ্ছে কেউ কেউ। অথচ, কোনো ভাবেই এটা একটা ‘অপশন’ না। চেয়ে দেখুন, প্রতিটা সমস্যার আছে সমাধান, এই পৃথিবীতে। যে একটা সমস্যায় আছে, তার কাছে সেটাই সবচেয়ে বড়। সেটাই স্বাভাবিক, তাই না?

কিন্তু সে জানে না সমাধান আছে এটার। কোথাও আশেপাশে। সে তার সমস্যা বলছে পুরো পৃথিবীকে। কাছের মানুষকে ছাড়া। এটা তার সমস্যা নয়, বরং আমাদের। আমরা ‘কানেক্ট’ করছি না তাকে পরিবারে। আমরা সবাই নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি যে বুঝতেই পারিনা এই বিজি থাকাটা একটা নিজেকে বিছিন্ন করে ফেলছে সবার কাছ থেকে একটু একটু করে। কেউ কাউকে শুনতে চাইনা, শুধু বলতে চাই।

একটা সময় এভাবে আপনার আমার কথা শোনার কাউকে পাওয়া যায়না তখন আমরা বারান্দায় বা ছাদে গিয়ে ভাবতে শুরু করি যে আমরা খুব একা, আমাদের কেউ নাই। তখনি এসব উলটা পালটা চিন্তা আসা শুরু হয়। আমাদের সবার জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা আছে এবং থাকবে।

যে ছেলেটা/মেয়েটা শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে কান্না করছে (সেটা যেকোন কারণেই হোক) সে জানেও না যে প্রায় বিশ্বে ৩৫% মানুষ গোসল তো দুরের কথা খাবার পানি পায়না ঠিকমত। যে ছেলেটা/মেয়েটা জিপির ৫ বা সিজিপিএ ৩.৫-এর নিচে চলে গেছে বলে মরে যাওয়ার চিন্তা করে সে যদি জানত পৃথিবীতে ২৬৪ মিলিয়ন ছেলেমেয়ে এই জিপিএ বা সিজিপিএ নিয়ে চিন্তা দুরের কথা তারা স্কুলেই যেতে পারেনা বা সেই সুযোগ নেই আর ‘আত্মহত্যা’র চিন্তা তাঁদের জন্য বিলাসিতা।

শেষ করি একটা বাস্তব ঘটনা দিয়ে।

ক্লাস এইটে পড়ুয়া একটা মেয়েকে আমি চিনতাম, আমার পাশের বাসার। নামকরা একটা স্কুলে সে পড়ত। তার বাবা মা চাকরি করত। ড্রাইভার আর বুয়া তাঁকে দেখাশোনা করত। রাতের বেলায় এসে কারো সাথে কারো দেখা হতনা, ছুটির দিন ছাড়া। আর প্রায় ঝগড়া হত তাঁদের মধ্যে।

মজার ব্যাপার হলো এই যে মেয়েকে সময় দিতে পারছেনা এটা সমাধান না করে তারা ব্লেইম গেম খেলা শুরু করেছে।  অথচ তারা চাইলেই কেউ একটু ছাড় দিলেই কিন্তু সবকিছু সুন্দরভাবে চলত, এটা নিয়ে আমি আমার আগের একটা লেখায় বলেছিলাম।

যাই হোক ফিরে আসি গল্পে।

মেয়েটা এর মাঝে এক ছেলের সাথে রিলেশনে জড়িয়ে যায়। তাঁর বাবা মা এটা জানতে পেরে ছেলেকে ধরে এনে বেদম মার দেয় অথচ উচিত ছিল বুঝিয়ে বলা। যাই হোক মেয়েটা রাগ করে কি জানি একটা ওষুধ খেয়ে ফেলে।

আমি আইসিইউতে দেখেছি মৃত্যু কি জিনিস! মেয়েটার বাবা মা তখন – মামনি প্লিজ তুমি ফিরে এসো, তুমি যেভাবে সব চাও সেভাবেই হবে, আমরা আর ঝগড়া করবোনা, তোমাকে সময় দিব যখনি তুমি চাও, প্লিজ আমাদেরকে মাফ করে দাও । সেই আংকেল আন্টির বুক ফাটা আকুতি, ফ্লোরের মাঝে গড়াগড়ি। মাঝে মেয়েটা একবার জ্ঞান ফিরে পায়, তখন একটা কথা বলে, ‘আব্বু আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, প্লিজ আমাকে বুকে জড়িয়ে নাও, আমি বাসায় যাবো।’

বুকে জড়িয়ে আর বাসায় যাওয়া হয়না, মধ্যে রাতের হসপিটালের ঠাণ্ডা দেয়ালে কান্নাগুলো ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে। আমি এখনো মাঝে মাঝে মধ্য রাতে সেই আন্টির কান্নার শব্দ শুনতে পারি বারান্দায় গেলে। সুতরাং একা কখনই ভালো থাকা যায়না, তাই বলি ভালো রাখুন, ভালো থাকুন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।