‘নটী নটীর মতোই থাকো’

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

১৯৪০ সালে ‘রূপমঞ্চ’ ছিল কলকাতার এক নামী জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পত্রিকা। এর সম্পাদক ছিলেন কালীশ মুখোপাধ্যায়। ‘রূপমঞ্চ’ অফিসে কালীশবাবুর ফটো তোলার স্টুডিও ছিল। জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পাশাপাশি নবাগতদেরও তিনি আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর স্টুডিও-তে ফটো তোলার জন্য। ততদিনে মুক্তি পেয়েছে সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি – সাত নম্বর কয়েদী। এটাই সুচিত্রার মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমা। কারণ, তাঁর প্রথম অভিনীত ছবি ‘শেষ কোথায়’।

কালীশবাবু ছবি তোলার জন্য সুচিত্রাকেও আমন্ত্রণ জানালেন। কালীশবাবুর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করলেন সুচিত্রা সেন। তিনি বললেন, ‘মাফ করবেন কালীশবাবু, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ছবি তোলা।’

এহেন আচরণে হতবাক কালীশবাবু। সাধারণত অভিনেত্রী মাত্রই প্রচারের বাসনায় ব্যাপ্ত। আজকালকার অভিনেত্রীরাও যা ক্লাসের। সেখানে এক নবাগতা ‘না’ বলবেন তা আশা করেননি কালীশবাবু। আর একবার যাচাই করবার জন্য কালীশবাবু সবিনয়ে বললেন, ‘আমার ওখানে গিয়ে ছবি তুলতে তোমার আপত্তির কারণ কী? ওখানে আমার স্ত্রী আছেন, সম্পাদকীয় বিভাগের অন্য কর্মীরাও আছেন। তাছাড়া ইচ্ছে করলে তুমি তোমার স্বামীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতে পারো।’

শ্রীমতী সেন বললেন, ‘এসব নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটাই জানিয়ে দিলাম।’

এই কথা শুনে কালীশবাবু প্রায় রেগে আগুন। রূপমঞ্চের পরবর্তী সংখ্যায় সুচিত্রা সেন সম্পর্কিত যাবতীয় মনের বিষোদগার করলেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন, ‘নটী নটীর মতোই থাকবে। তাকে আমরা এর চেয়ে বেশি মর্যাদা দিতে চাই না।’

এই মন্তব্যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না সুচিত্রা। তিনি বুঝেছিলেন কথায় কথা বাড়ে তার চেয়ে নিশ্চুপই শ্রেয়।

এরপর প্রায় দশ বছর পরে- কালীশ মুখোপাধ্যায় সুচিত্রার ওই গুণের প্রশংসা না করে পারেননি।

তিনি বলেছিলে, ‘সুচিত্রা আমার সঙ্গে সেদিন যে ব্যবহারই করে থাকুক, ওর স্পিরিট দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, ভেতরে একটু যদি কিছু থাকে তাহলে মেয়েটা অনেক দূর এগোবে। ওকে কেউ আটকাতে পারবে না।’

পরবর্তীকালে রমা সেন সুচিত্রা সেন হলেন ‘রূপমঞ্চ’র কভার গার্ল। অনেকগুলো সংখ্যাতেই তাঁকে করতে বাধ্য হন সম্পাদক।

রুপমঞ্চের কভারে সুচিত্রা

‘বেবি ডল’ গোছের ভাবমূর্তি আদৌ ছিল না তার, আর সেটাই ছিল তার অপ্রতিরোধ্য আবেদনের মূলে। তার মধ্যে কোথাও একটা ছিল পুরুষের সমকক্ষ, মাথা উঁচু করা এক সত্তা, যার জন্য পুরুষ মরিয়া হতে পারে।নারীসম্মান টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত করার পথিকৃত সুচিত্রা সেন। যিনি বুঝিয়ে দেন নটীরাও মানুষ তাঁদেরও আত্মসম্মান আছে। যিনি বলতে পারেন আমি সুচিত্রা, আমি ইন্ডাস্ট্রি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।